ব্র্যাকের রিটার্নশিপ প্রোগ্রাম দিয়ে ফারাহ মাহবুবের ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প
পারিবারিক দায়িত্ব পালনের প্রয়োজনে একসময় পেশাজীবন থেকে বিরতি নিয়েছিলেন ফারাহ মাহবুব। এভাবে তিনি যুক্ত হয়েছিলেন সেই অসংখ্য নারীর কাতারে, যাদের পেশাগত যাত্রায় এমন সব দায়িত্বের কারণে ছেদ পড়ে, যা সচরাচর জীবনবৃত্তান্তে স্থান পায় না। তবে এক বছরের কিছু বেশি সময় পর ফারাহ আবারও কর্মজীবনে ফিরে আসেন।
এবার তিনি যুক্ত হন ব্র্যাকের 'ব্রিজ রিটার্নশিপ প্রোগ্রাম'-এ। কর্মজীবনে বিরতির পর তাঁর মতো পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাওয়া নারীদের কর্মক্ষেত্রে ফিরে আসার সুযোগ তৈরি করতেই এই কর্মসূচি বিশেষভাবে সাজানো হয়েছে। ফারাহর অভিজ্ঞতা একটি বৃহত্তর বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি।
শ্রমবাজারে বিদ্যমান দীর্ঘস্থায়ী পক্ষপাতমূলক দৃষ্টিভঙ্গির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, 'নারীদের কর্মজীবনের বিরতিকে প্রায়ই ভিন্নভাবে দেখা হয়।' কর্মজীবনের সেই বিরতি বা 'গ্যাপ'-এর কারণে তাদের প্রকৃত সক্ষমতা অনেক সময় আড়ালে পড়ে যায়। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও বিরতির পর কর্মক্ষেত্রে ফিরলে নারীরা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হন।
ফারাহর জন্য 'রিটার্নশিপ প্রোগ্রাম'টি কেবল কর্মক্ষেত্রে ফেরার একটি সুযোগ নয়, বরং পেশাগত জীবনকে নতুন করে গড়ে তোলার একটি প্ল্যাটফর্মও। এখানে তিনি নিজের দক্ষতা তুলে ধরার পাশাপাশি নতুন করে পেশাগত পরিচয় গড়ে তোলার সুযোগ পেয়েছেন। বর্তমানে তিনি ব্র্যাকের 'সোশ্যাল ইনোভেশন ল্যাব'-এ 'ডেপুটি ম্যানেজার (ইনোভেশন ইকোসিস্টেম অ্যান্ড পার্টনারশিপ)' হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
ফারাহর মতো অনেক নারীকে ব্যক্তিগত ও কাঠামোগত নানা কারণে পেশাজীবন থেকে সরে আসতে হয়। অথচ কর্মক্ষেত্রে ফিরে আসার পথ খুব একটা সহজ নয়। ব্র্যাকের মতে, নারীরা পেশাজীবন পুনরায় শুরু করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হলেও দীর্ঘ বিরতির পর কর্মক্ষেত্রে ফিরে আসা তাঁদের জন্য অত্যন্ত কঠিন হতে পারে।
এবারের রিটার্নশিপ কর্মসূচির জন্য ১,২০০-এর বেশি নারী আবেদন করেছিলেন। তাঁদের প্রত্যেকেরই রয়েছে জীবনের নানা বাঁক, বিরতি এবং নতুন করে এগিয়ে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় ঘেরা নিজস্ব গল্প। কয়েক ধাপের বাছাই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে শেষ পর্যন্ত মাত্র ২৪ জন নারীকে নির্বাচিত করা হয়েছে।
ছয় মাসব্যাপী এই কর্মসূচিতে তাঁরা ব্র্যাকের বিভিন্ন কার্যক্রমে যুক্ত থাকেন। এ সময় অভিজ্ঞ পেশাজীবীদের তত্ত্বাবধানে তাঁরা হাতে কলমে কাজের অভিজ্ঞতা অর্জনের পাশাপাশি নির্ধারিত বেতন পান। কর্মসূচির আওতায় রয়েছে মেন্টরশিপ, ক্যারিয়ারবিষয়ক পরামর্শ, নেতৃত্ব বিকাশের সুযোগ এবং এনজিও, বেসরকারি সংস্থা ও শীর্ষস্থানীয় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের পেশাজীবীদের সঙ্গে নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার সুযোগ।
আবেদনকারীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৩৮.৮ শতাংশ নারী পারিবারিক দায়িত্ব এবং ৩৬ শতাংশ নারী মাতৃত্বকে কর্মজীবন থেকে বিরতি নেওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন। এই পরিসংখ্যান থেকে নারীদের কর্মজীবন থেকে সরে দাঁড়ানো এবং পুনরায় কাজে ফেরার ইচ্ছার একটি চিত্র সামনে আসে। অন্যান্য কারণের মধ্যে ছিল ব্যক্তিগত বিষয় ১৮.৮ শতাংশ, উচ্চশিক্ষা গ্রহণ ১৪.৪ শতাংশ, কর্মক্ষেত্রে প্রতিকূল পরিবেশ ৮.৫ শতাংশ এবং সামাজিক চাপ ৪.৭ শতাংশ।
তবে কাজে ফেরার পেছনের কারণগুলোও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আবেদনকারী, ৭৬.৫ শতাংশ, পেশাগত অগ্রগতিকে প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ৬২.২ শতাংশ নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তোলার কথা বলেছেন। ৫৬.৫ শতাংশ আর্থিক স্বাধীনতার কথা উল্লেখ করেছেন এবং ৫৭.৭ শতাংশ চেয়েছেন নিজেদের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে। ৪২.৭ শতাংশের কাছে কাজে ফেরার বিষয়টি পরিবারের প্রতি অবদান রাখার সঙ্গেও যুক্ত ছিল।
এই কর্মসূচির কাঠামোতে অংশগ্রহণকারীদের বহুমুখী অনুপ্রেরণার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হয়েছে। অংশগ্রহণকারীরা বিভিন্ন বিভাগে প্রকল্প তদারকি, গবেষণা ও পরিচালনামূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকেন, যাতে তাঁদের দায়িত্ব অর্থবহ হয়ে ওঠে। কাজের বাস্তব অভিজ্ঞতার পাশাপাশি মেন্টরশিপ ও নেতৃত্ব বিকাশের ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। এর লক্ষ্য শুধু পেশাগত দক্ষতা বাড়ানো নয়, আত্মবিশ্বাসও পুনর্গঠন করা।
গত ৫ মার্চ মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টারে আয়োজিত এই কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ব্র্যাকের চিফ পিপল অ্যান্ড কালচার অফিসার মৌটুসী কবির উদ্যোগটিকে একটি বৃহত্তর দর্শনের আলোকে তুলে ধরেন। ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা ফজলে হাসান আবেদের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, 'আবেদ ভাই বলতেন, জীবনে তিনি কখনো কোনো পরাজিত নারীর দেখা পাননি। এই উক্তিটি 'রিটার্নশিপ' কর্মসূচির মূল চেতনার সঙ্গে গভীরভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।'
মৌটুসী কবির আরও বলেন, কর্মজীবন থেকে সাময়িক বিরতি নেওয়াকে দুর্বলতার লক্ষণ হিসেবে দেখা উচিত নয়। তাঁর ভাষায়, 'প্রতিষ্ঠিত পেশাজীবন থেকে সরে আসার সিদ্ধান্তটি একটি সাহসী পদক্ষেপ এবং ব্যক্তিগত ঝুঁকির। প্রথাগত চাকরি থেকে দূরে থাকার এই সময়টুকু কারও দক্ষতা, অভিজ্ঞতা বা নেতৃত্বের সম্ভাবনাকে ক্ষুণ্ণ করে না।'
এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে 'ব্রিজ রিটার্নশিপ প্রোগ্রাম' দক্ষ ও অভিজ্ঞ নারীদের কর্মক্ষেত্রে পুনরায় প্রবেশের জন্য একটি সুবিন্যস্ত ও সহায়তামূলক পথ তৈরি করছে। এর মাধ্যমে তাঁরা অর্থবহ দায়িত্ব গ্রহণের পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে আবারও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার সুযোগ পাচ্ছেন।
ব্রিজ রিটার্নশিপ উদ্যোগটি মনে করিয়ে দেয়, লিঙ্গসমতা অর্জনের জন্য শুধু কথার ফুলঝুরি যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন বাস্তবসম্মত সহায়তা, যার মধ্যে রয়েছে জ্ঞান, অবকাঠামো, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, মেন্টরশিপ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে সময়। এ ধরনের সহায়তা নারীদের শুধু পেশাজীবন নতুন করে গড়ে তুলতে সাহায্য করে না, বরং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমতাভিত্তিক সমাজ গঠনেও ভূমিকা রাখে।
এই কর্মসূচির প্রভাব ইতোমধ্যেই দৃশ্যমান। গত বছর এর প্রথম ব্যাচে প্রায় ১,১০০ জন আবেদনকারীর মধ্য থেকে ১৫ জন অংশগ্রহণকারীকে নির্বাচিত করা হয়েছিল। তাঁদেরই একজন ছিলেন ফারাহ, যিনি পরবর্তীতে ব্র্যাকের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন শুরু করেন।
এ বছরের কর্মসূচির উদ্বোধন উপলক্ষে আয়োজিত একটি প্যানেল আলোচনায় ফারাহ তাঁর অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন আরেকজন অংশগ্রহণকারী এলিজাবেথ মারান্ডি, যিনি বর্তমানে ব্র্যাকের মাইক্রোফাইন্যান্স কর্মসূচিতে সিনিয়র অফিসার হিসেবে কর্মরত আছেন।
ফারাহর জন্য কর্মক্ষেত্রে এই প্রত্যাবর্তন ছিল পেশাগত ও ব্যক্তিগত, উভয় দিক থেকেই তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর গল্প প্রমাণ করে, সুপরিকল্পিত সহায়তা কীভাবে একটি থমকে যাওয়া পেশাজীবনকে নতুন উদ্যমে এগিয়ে চলার পথে ফিরিয়ে আনতে পারে। একই সঙ্গে, এটি কর্মজীবনের বিরতি বা 'ক্যারিয়ার ব্রেক' নিয়ে প্রচলিত ধারণাকেও চ্যালেঞ্জ জানায়।
নিয়োগকর্তাদের জন্যও এখানে রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। একজন কর্মীর কর্মজীবনে কতদিন বিরতি ছিল, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো তাঁর দক্ষতা, অভিজ্ঞতা এবং সম্ভাবনা। উপযুক্ত সুযোগ ও সহায়তা পেলে কর্মজীবন থেকে সাময়িকভাবে দূরে থাকা নারীরাও নতুন উদ্যমে ফিরে এসে কর্মক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারেন।
