বাধা পেরিয়ে গ্রামের মেয়ে আফসানা যেভাবে চিকিৎসক হলেন
একসময় গ্রামের ছোট মেয়েটিকে বলা হয়েছিল এত পড়াশোনার দরকার নেই, ভালো বিয়ে হলেই হলো। আজ সেই মেয়েটিই একজন চিকিৎসক। তিনি নারীদের স্বাস্থ্যসেবা দেন এবং নিজের ক্লিনিকে সন্তান প্রসব করান। এই গল্প শুধু একজনের ব্যক্তিগত সফলতার নয়, এটি দারিদ্র্য, সামাজিক বাধা আর গ্রামীণ কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের গল্প।
ছোটবেলায় ডা. আফসানা আখতার ব্র্যাকের একটি স্কুলে যেতে শুরু করেন। তখন তিনি এতটাই ছোট ছিলেন যে তাকে ভর্তি করা হয়নি। তবুও তিনি প্রতিদিন দুই কিলোমিটার হেঁটে তার বোনদের সঙ্গে স্কুলে যেতেন এবং ক্লাসের দরজার পাশে দাঁড়িয়ে পড়া শুনতেন। তিনি বলেন, 'আমি শুধু পড়তে চেয়েছিলাম। যখন আমাকে অবশেষে ক্লাসে ঢুকতে দেওয়া হলো, মনে হয়েছিল আমার সামনে পুরো দুনিয়া খুলে গেছে।'
'আমার মনে আছে, লোকজন আমার বাবাকে বলেছিল আমার শিক্ষার পেছনে টাকা খরচ না করতে,' লাজুক হাসিতে আফসানা বলেন। 'এখন ওই একই মানুষেরা আমার কাছে চিকিৎসা নিতে আসে এবং তাদের সন্তানদের ক্যারিয়ার নিয়ে পরামর্শ চায়।'
মাকে হারানোর ভয় থেকে আফসানার চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন শুরু। আফসানা যখন মাধ্যমিক স্কুলে পড়তেন, তখন তার মায়ের জরায়ুমুখ ক্যানসার শনাক্ত হয়। তিনি বলেন, মায়ের চিকিৎসার জন্য পর্যাপ্ত টাকা ছিল না। আমার দুলাভাই হাসপাতালে বিল দিতে সাহায্য করেছিলেন। আমার মাকে ব্যথায় কষ্ট পেতে দেখে বুঝতে পারলাম গ্রামীণ এলাকার নারীরা কতটা অসহায়।
নিজের স্বাস্থ্যের আগে অন্যদের স্বাস্থ্যের কথা ভাবতেন। তখনই আফসানা সিদ্ধান্ত নেন তার জীবনকে নারীদের স্বাস্থ্যসেবায় নিবেদিত করবেন, পথ যত বন্ধুরই হোক না কেন তিনি এই প্রতিশ্রুতি রাখবেন।
রঙিন শুরু
আফসানার প্রথম স্কুলের অভিজ্ঞতা ব্র্যাকের মাধ্যমে আসে; একটি উজ্জ্বল রঙে সাজানো ঘর যা তার কল্পনাশক্তিকে ছুঁয়ে দিয়েছিল। 'এটা সুন্দর ছিল, প্রতিটি রঙে সাজানো,' তিনি স্মরণ করেন। 'আমার বোনেরা ভর্তি হয়েছিল, কিন্তু আমি তখন খুব ছোট ছিলাম।'
তিন বছর ধরে ক্লাসের সামনে দাঁড়িয়ে পড়া শিখতেন। যখন তার সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়, তখন বলা হয় তার বয়স কম, দাঁত পুরো ওঠেনি। তিনি তখন বলেছিলেন, 'আমি যদি দাঁত ভেঙে ফেলি, তাহলে কি ভর্তি হতে পারব?' তাঁর এই আগ্রহ দেখে শিক্ষকেরা তাকে ভর্তি করেন।
তার প্রথম শিক্ষক ফরিদা ইয়াসমিন শেখাকে অনেকটা জাদুর মতো করে তুলেছিলেন। 'আমরা নাচ, গান, অভিনয়ের মাধ্যমে শিখতাম এবং আমি স্কুল মিস করিনি কখনোই,' তিনি বলেন। মাধ্যমিক স্কুলে শিক্ষকদের তেমন মনোযোগ পাননি, তাই নিজেই অনেক পরিশ্রম করেছেন।
অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় তিনি ব্র্যাকের কিশোরী নেত্রী কর্মসূচিতে যুক্ত হন, যা তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। গ্রামের কিশোরীদের নেতৃত্ব দেওয়া নিয়ে উৎসাহী ছিলেন। এ সময় তিনি অন্য অভিভাবকদের মেয়েদের স্কুলে পাঠাতে উদ্বুদ্ধ করতেন। উচ্চমাধ্যমিকে তিনি বিজ্ঞান বিভাগে পড়েন, যা তার পরিবারের জন্য বেশ ব্যয়বহুল সিদ্ধান্ত ছিল। তিনি বলেন, 'ততদিনে আমার ছোট ভাইয়ের জন্ম হয়েছে, আমাদের একখণ্ড জমি ছিল সেটাও বোনের বিয়ে ও দুলাভাইকে বিদেশ পাঠাতে বিক্রি করা হয়েছিল।'
এরপরও এসএসসি ও এইচএসসি দুই পরীক্ষাতেই আফসানা জিপিএ-৫ পান। তার এই সাফল্য নিয়েও লোকজন সমালোচনা করে। প্রতিবেশীরা তার বাবাকে বলেছিল মেয়ের পড়ালেখায় বেশি টাকাপয়সা খরচ না করতে, বরং ছেলের জন্য রেখে দিতে। তারা বলত, আফসানার অনেক পড়া হয়েছে, এরপর বিয়ের জন্য ছেলে খুঁজে পেতে কষ্ট হবে।
নিরুৎসাহিত না হয়ে তিনি নিজেই মেডিকেল কলেজে ভর্তির জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন। তিনি রাতদিন পড়াশোনা করতেন এবং ধীরে ধীরে নিজেকে মেডিকেলের জন্য প্রস্তুত করেন। কিন্তু মেডিকেলে ভর্তির সুযোগ মেলে না।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় যখন একটি বৃত্তি ঘোষণা করে, তখন আফসানার মনে আবার আশা জেগে ওঠে। তিনি জীবনে প্রথমবার একা ঢাকায় আসেন এবং ভর্তি হন, যদিও সেটা চিকিৎসাশাস্ত্রে নয়। তিনি কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে সুযোগ পান।
প্রতিদিন বাসে গাজীপুর থেকে ঢাকায় যাতায়াত করতে ছয় ঘণ্টা সময় লাগত, তবুও আফসানা তার প্রথম সেমিস্টারে ভালো ফলাফল করতে সক্ষম হন। তিনি আরেকটি বৃত্তির কথা জানতে পারেন, যার মাধ্যমে তিনি চিকিৎসাবিদ্যা নিয়ে পড়তে চীনে যেতে পারতেন। শর্ত: তাকে চীনা ভাষা শিখতে হবে।
আফসানা বলেন, আমি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ল্যাঙ্গুয়েজে ভর্তি হই। কোর্সটি শেষ করার পর তাকে বৃত্তি দেওয়া হয়। 'আমার পরিবারের কেউ চীন সম্পর্কে কিছুই জানত না,' তিনি হেসে বলেন। তিনি বলেন, ব্র্যাকের সবাই আমাকে সাহায্য করেছিল। এমনকি পরিচালক লেডি সারওয়াত আবেদও আমাকে বিমানবন্দরে নামিয়ে দিতে এসেছিলেন।
চীন ছিল প্রাণবন্ত। আফসানা বলেন, মুঠোফোন পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়িতে ফোন করি। আমার পরিবারের কণ্ঠস্বর ছিল ভীত। আমার বাবা কাঁদতে শুরু করলেন।
আফসানা টংজি (Tongji) বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমে চীনা ভাষা অধ্যয়ন করেন। দক্ষতা পরীক্ষায় পাঁচ নম্বর পেয়ে উত্তীর্ণ হন, যা পিএইচডি করার জন্য যথেষ্ট ছিল। পরে তিনি চিকিৎসাবিদ্যা অধ্যয়নের জন্য গুয়াংজুর সাউদার্ন মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থানান্তরিত হন।
টিউশন ফি ছাড়া বৃত্তির আওতায় আর কোনো খরচ দেওয়া হতো না। তাই ছুটির দিনে আফসানা একটি পোশাকের দোকানে খণ্ডকালীন কাজ করতেন। তিনি বলেন, 'আমার বন্ধুরা বাড়ি চলে যেত। কিন্তু আমি টাকা আয়ের জন্য সেখানে থেকে যেতাম। একটা ল্যাপটপ কিনেছিলাম। আমার ভাইয়ের পড়াশোনার জন্য বাড়িতে টাকা পাঠাতাম।'
তৃতীয় বর্ষে পড়ার সময় আফসানা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ক্লাবে যোগ দেন, যারা গ্রামাঞ্চলে শিশুদের পড়াতে যেত। তিনি বলেন, 'আমি ইংরেজি পড়াতাম। আমিই একমাত্র বিদেশি যে সাবলীলভাবে ইংরেজি বলতে পারতাম। এই অভিজ্ঞতা গ্রামে নিজের শৈশবের স্মৃতি ফিরিয়ে এনেছিল। তাদের কৌতূহল আমাকে আমার কথা মনে করিয়ে দিয়েছিল।'
দেশ থেকে গুয়াংজুতে ফেরার আগে তিনি ইংরেজি ভাষার চিকিৎসা বিষয়ক বই কিনে ফেরেন। তিনি বলেন, 'আমি জানতাম বাংলাদেশে কাজ করার জন্য আমাকে ইংরেজিতে সব কিছু পুনরায় শিখতে হবে।'
আফসানার জন্য চতুর্থ বছরটি ছিল সবচেয়ে কঠিন। তিনি বলেন, ক্লাস ও হাসপাতালে দিন কাটানো, ইংরেজিতে পড়া, শত শত রাত নির্ঘুম কাটানো—কিন্তু শেষ পর্যন্ত এটি কাজে দিয়েছে। ক্লাসে শীর্ষস্থান অর্জন করেছিলাম।
বাংলাদেশে ফিরে আসার পরেও পথচলা সহজ ছিল না। ইন্টার্নশিপ পেতে আফসানার এক বছরেরও বেশি সময় লাগে। অবশেষে একটি ক্লিনিকে যোগ দেন, যেখানে তার জনপ্রিয়তার কারণে নেতিবাচক আলোচনা শুরু হয়। তিনি বলেন, সেখানে খুব কমসংখ্যক স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ছিলেন, তাই আমি অনেক রোগী পাচ্ছিলাম। বিষয়টি নিয়ে ক্লিনিকের অনেকেই খুশি ছিলেন না।
আফসানা ও তার স্বামী নিজেদের সঞ্চয় একত্রিত করে নিজস্ব ক্লিনিক শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি বলেন, 'আমার চেম্বারটি এখন সেখানেই। আমি প্রতিদিন কমপক্ষে ২৫ জন রোগীর চিকিৎসা করি, নতুন মায়েদের সাহায্য করছি, সন্তান প্রসবের সময় নারীদের নির্দেশনা দিচ্ছি এবং নতুন জীবনের বিষয়ে প্রস্তুতি নিতে সহায়তা করছি।'
আফসানা এখন দুই সন্তানের মা। তার স্বামী এবং শাশুড়ির সহায়তায় তিনি কাজ চালিয়ে যেতে পারেন। তিনি বলেন, 'আমার শাশুড়ি সন্তানদের এবং ঘরের কাজের দেখাশোনা করেন। আমি এবং আমার স্বামী বাকিটা সামলাই। আমার পরিবার আমাকে সবসময় উৎসাহিত করে।'
তাঁর ছোট সন্তান একটু বড় হলে তিনি আবারও উচ্চশিক্ষার বিষয়ে আশাবাদী। তিনি বলেন, 'আমার এখনও অনেক কিছু শেখার আছে। শিক্ষা ব্যক্তিকে অনেক দূরে নিয়ে যায়। আমি এগিয়ে যেতে চাই।'
আফসানার মতে, তার গল্প ব্যতিক্রমী নয়; বিশ্বাস এবং সমর্থন থাকলে কী করা সম্ভব সেটার প্রমাণ এটি। তিনি বলেন, 'যখন আপনি সঠিক মানুষের সমর্থন পাবেন, তখন যেকোনো কিছু করা সম্ভব। আমি সত্যিই আশা করি আমার যাত্রা বাংলাদেশের অন্যান্য নারীদের অনুপ্রাণিত করবে।'
স্কুলে যাওয়ার জন্য একসময় 'দাঁত ভাঙতে' চাওয়া ছোট মেয়েটাই এখন ডাক্তার, যিনি স্বাস্থ্যখাতে গ্রামীণ নারীদের বাধা পেরোতে সহায়তা করছেন। ডা. আফসানার এই যাত্রা শিক্ষার শক্তি, সহনশীলতা ও অদম্য ইচ্ছাশক্তির প্রমাণ।
