সীতাকুণ্ডে গ্যাস লিকেজ: ছুটির দিনে কারখানায় গিয়েছিলেন কাজে, লাশ হয়ে ফিরলেন দুই ভাই
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ফেরদৌস স্টিল শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে বিষাক্ত গ্যাস লিকেজের ঘটনায় আজ শুক্রবার যে ৯ জন শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের মধ্যে রয়েছেন ভাটিয়ারী মৌলভীপাড়ার দুই ভাই মনসুর ও নাসির। ৫৫ বছর বয়সী মনসুর ছিলেন ওই কারখানার ফোরম্যান এবং ৫০ বছর বয়সী নাসির ছিলেন কাটারম্যান। দুজনেই প্রায় ১৭ বছর এই ইয়ার্ডে কাজ করেছেন।
নাসিরের একমাত্র মেয়ে ইভা, যে এবার দশম শ্রেণিতে পড়ে বাবার নিথর দেহের সামনে দাঁড়িয়ে বারবার বলছিল, 'আজ শুক্রবার হওয়ায় বাবা বাড়িতে ঘুমাচ্ছিলেন এবং তিনি বিশ্রাম নিতে চেয়েছিলেন। তিনি কাজে যেতে চাননি। কিন্তু কারখানা থেকে ফোন করে তাকে ডাকা হলো। শেষ পর্যন্ত বাবা ফিরলেন লাশ হয়ে।'
একই করুণ দশা মনসুরের পরিবারেরও। দুই মেয়ের জনক মনসুর ছিলেন পুরো পরিবারের একমাত্র চালিকাশক্তি। তার এক মেয়ে এখনো পড়াশোনা করছেন। বাবার অকাল মৃত্যুতে সেই মেয়ের ভবিষ্যৎ এখন এক বিশাল অনিশ্চয়তার মুখে।
স্বজনরা জানান, দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার সাথে সাথেই তারা ইয়ার্ডে ছুটে যান। কিন্তু কারখানা কর্তৃপক্ষ তাদের ভেতরে ঢুকতে দিচ্ছিল না বলে অভিযোগ করেন তারা। একপর্যায়ে স্থানীয় সাধারণ মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে কারখানার মূল গেট ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন। গ্রামবাসী ও শ্রমিকরা মিলে নিজেরাই উদ্ধার কাজ শুরু করেন এবং একের পর এক নিথর দেহ বের করে আনতে থাকেন।
ফেরদৌস স্টিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফেরদৌস ওয়াহিদ জানিয়েছেন, একটি জাহাজের ইঞ্জিন রুমের ট্যাংক থেকে গ্যাস লিকেজ হচ্ছে বলে সেফটি টিমের সদস্যরা শনাক্ত করেন। সেটি পরীক্ষা করতে গিয়ে শ্রমিকরা অচেতন হয়ে পড়েন। তাদের উদ্ধার করতে গিয়ে পরবর্তীকালে আরও কয়েকজন সংজ্ঞা হারান।
ফায়ার সার্ভিসের ধারণা, কার্বন মনোক্সাইড বা অন্য কোনো প্রাণঘাতী গ্যাস এই মৃত্যুর মিছিলের কারণ।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বারান্দায় এখন কেবলই হাহাকার। স্বজনদের অভিযোগ, দুর্ঘটনার পর থেকে ফেরদৌস স্টিলের কোনো মালিক বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে হাসপাতালে দেখা যায়নি। হাসপাতালে কোনো প্রতিনিধি না থাকায় মরদেহ গ্রহণ করার জন্য প্রয়োজনীয় দাপ্তরিক প্রক্রিয়াগুলো সম্পন্ন করতেও বেগ পেতে হচ্ছে তাদের।
মৌলভীপাড়ার প্রতিবেশী ইমন বলেন, 'তারা অত্যন্ত পরিশ্রমী ছিলেন এবং বছরের পর বছর এখানে কাজ করে পরিবার চালাতেন। এখন দুই ভাইকেই হারিয়ে তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।'
স্থানীয় বাসিন্দারা এই ঘটনার জন্য সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। কেন সাপ্তাহিক ছুটির দিনে শ্রমিকদের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়াই কাজে ডাকা হলো, তা খতিয়ে দেখে দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি তুলেছেন তারা। একই সঙ্গে নিহতদের পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদানের দাবি জানানো হয়েছে।
