সরকারি হাসপাতালের অব্যবহৃত চিকিৎসা যন্ত্রপাতির তালিকা করে অন্য হাসপাতালে স্থানান্তরের নির্দেশ
দেশের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে অব্যবহৃত অবস্থায় থাকা চিকিৎসা যন্ত্রপাতির তালিকা প্রস্তুত করে সেগুলো দ্রুত প্রয়োজনীয় অন্যান্য হাসপাতালে বরাদ্দ দিয়ে চালুর নির্দেশ দিয়েছে সরকার।
সম্প্রতি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা-১ শাখা থেকে জারি করা এক আদেশে এ নির্দেশ দেওয়া হয়।
এতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি প্রতি ১৫ দিন পরপর বাস্তবায়নের অগ্রগতি প্রতিবেদন স্বাস্থ্য সেবা বিভাগে পাঠাতে বলা হয়েছে।
আদেশে বলা হয়েছে, গত ৯ জুন জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় বিভিন্ন হাসপাতালে অব্যবহৃত চিকিৎসা যন্ত্রপাতি দ্রুত ব্যবহারের আওতায় আনার বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।
একনেকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বিভিন্ন হাসপাতালে যেসব যন্ত্রপাতি দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত রয়েছে, সেগুলোর পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করতে হবে। এরপর যেসব হাসপাতালে এসব যন্ত্রপাতির প্রয়োজন রয়েছে, সেখানে দ্রুত বরাদ্দ দিয়ে সেগুলো চালুর ব্যবস্থা নিতে হবে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন টিবিএসকে বলেন, পরিকল্পনার অভাবে অনেক দামি যন্ত্রপাতি বছরের পর বছর অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। পরিকল্পনার ছাড়া কেনাকাটা ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে জনগণের অর্থের অপচয় হয়েছে।
'যেমন আওয়ামী লীগ আমলে ১১ কোটি টাকার রেডিওথেরাপি মেশিন ১৮ কোটি টাকা করে দুটি কেনা হয়েছিল। অথচ যেখানে বসানো হয়েছে, সেখানে কোনো রেডি সেটআপ ছিল না। কেন কেনা হয়েছিল? কারণ প্রতি মেশিনে ৪ থেকে ৬ কোটি টাকা লাভ ছিল,' বলেন তিনি।
মন্ত্রী আরও বলেন, এই যন্ত্র দুটির একটি পড়ে আছে ফরিদপুরে, অন্যটি খুলনায়। 'একইভাবে দেশের বিভিন্ন স্থানে কারিগরি লোকবল ছাড়াই এক্স-রে ও অন্যান্য সরঞ্জাম কিনে ফেলে রাখা হয়েছে, যা পরবর্তীতে ভাঙারির কাছে বিক্রি করা ছাড়া উপায় নেই। সে কারণে আমরা অব্যবহৃত যন্ত্রপাতির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিয়েছি।'
রোগনির্ণয় যন্ত্রের ৫২ শতাংশই ব্যবহার হয়নি
সরকারি হসপাতালে এক্স-রে, আলট্রাসনোগ্রামের সতো রোগ নির্ণয়ের যন্ত্র থাকলেও নিয়মিত সেবা দিতে পারছে না বলে পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) এক গবেষণায় উঠে এসেছে।
'ব্রিজিং গ্যাপস ইন বাংলাদেশ'স পাবলিক হেলথ সিস্টেম: আ র্যাপিড ফ্যাসিলিটি-লেভেল অ্যাসেসমেন্ট অভ এক্সপেন্ডিচার এফিশিয়েন্সি টুয়ার্ডস এনশিওরিং ইউএইচসি-কমপ্লায়েন্ট হেলথ সার্ভিস ডেলিভারি' শীর্ষক এই গবেষণায় দেশের আট প্রশাসনিক বিভাগের মোট ২২টি জনস্বাস্থ্য কেন্দ্র মূল্যায়ন করা হয়েছে।
এতে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেট ও কেনাকাটার রেকর্ড পর্যালোচনা করা হয়। গবেষণায় স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর কার্যকারিতা এবং ৯৫ জন কর্মকর্তার জ্ঞান, দৃষ্টিভঙ্গি ও কাজের ধরন নিয়ে একটি জরিপ পরিচালনা করা হয়। এর পাশাপাশি হাসপাতাল ব্যবস্থাপক, জাতীয় পর্যায়ের নীতিনির্ধারক, সরঞ্জাম সরবরাহকারী, শিক্ষাবিদ ও রোগীদের নিয়ে মোট ৩২টি সাক্ষাৎকারও গ্রহণ করা হয়েছে।
গবেষণাকালে দেখা গেছে, সব পর্যায়ের হাসপাতালে রোগনির্ণয় যন্ত্রের সেবা পাওয়ার হার ৬৫ শতাংশ। তবে বাস্তবে গত এক বছরে নিয়মিত এমন সেবা পাওয়া গেছে ২৫ শতাংশ। এতে আরও দেখা গেছে, রোগনির্ণয় যন্ত্রের ৫২ শতাংশই গত এক বছরে ব্যবহার হয়নি।
জেলা হাসপাতালগুলোতে কাগজে-কলমে রোগনির্ণয় যন্ত্রের প্রাপ্যতা সবচেয়ে বেশি, ৮৫ শতাংশ। কিন্তু গত এক বছরে মানুষ নিয়মিত সেবা পেয়েছে ৩৩ শতাংশ।
গবেষণার সময় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রোগনির্ণয় যন্ত্রের সেবার প্রাপ্যতা ৪৬ শতাংশ হলেও এক বছরে মানুষ নিয়মিত সেবা পেয়েছে ১৭ শতাংশ। একই সময়ের হিসাবে মেডিকেল কলেজ ও বিশেষায়িত হাসপাতালে এমন সেবার প্রাপ্যতা ছিল ৫৪ শতাংশ। এক বছরের হিসাবে ছিল ২৫ শতাংশ।
সেবা না পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রধান কারণ হিসেবে গবেষণায় উঠে এসেছে যন্ত্রপাতি অকেজো থাকা। এসব হাসপাতালের ৭৯ শতাংশ ক্ষেত্রে যন্ত্রপাতি অকেজো ছিল। এছাড়া অন্যান্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের ঘাটতির কারণে ১৪ শতাংশ এবং প্রশিক্ষিত টেকনোলজিস্টের অনুপস্থিতির কারণে ৭ শতাংশ সেবা ব্যাহত হচ্ছে।
পিপিআরসি বলেছে, স্বাস্থ্য খাতের অনিয়ম ও দুর্নীতির একটি বড় জায়গা চিকিৎসা যন্ত্রপাতি কেনা ও ব্যবহার।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, অনেক সময় প্রয়োজন না থাকলেও যন্ত্র কেনা হয়। আবার যন্ত্র নষ্ট হলে নানা অজুহাতে ঠিক সময়ে সেগুলো মেরামত করা হয় না।
