বাংলাদেশের অফশোর তেল-গ্যাস অনুসন্ধান দরপত্রে আগ্রহ ব্রিটিশ পেট্রোলিয়ামের
যুক্তরাজ্যের বহুজাতিক জ্বালানি কোম্পানি ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম (বিপি) বাংলাদেশের ২০২৬ সালের অফশোর তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য দরপত্রে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। সরকার বিনিয়োগবান্ধব 'প্রোডাকশন শেয়ারিং কনট্রাক্ট' (পিএসসি) নীতির আওতায় অফশোর দরপত্র পুনরায় চালুর পর বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি প্রতিষ্ঠানেটি এই প্রথম আগ্রহ দেখালো।
জ্বালানি বিভাগ ও পেট্রোবাংলার কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, ১৭ জুলাই বিপি পেট্রোবাংলাকে চিঠি দিয়ে বিদেশ থেকে দরপত্রের নথি কেনার অর্থ পাঠাতে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানটির ব্যাংক হিসাবের তথ্য চায়।
এর জবাবে ১৯ জুলাই প্রয়োজনীয় ব্যাংক-সংক্রান্ত তথ্য পাঠায় পেট্রোবাংলা।
এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে ২০২৪ সালের অফশোর দরপত্রে দরপত্রের নথি সংগ্রহ করেনি বিপি। এবার তাদের আগ্রহকে ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশে বিপির কোনো কার্যালয় না থাকায় কোম্পানিটি জানতে চেয়েছে, বিদেশ থেকেই অর্থ পাঠিয়ে দরপত্রের নথি কেনা যাবে কি না।
পেট্রোবাংলার প্রোডাকশন শেয়ারিং কনট্রাক্ট (পিএসসি) বিভাগের পরিচালক প্রকৌশলী মো. শোয়েব মঙ্গলবার বলেন, 'বিপি ই-মেইলে জানতে চেয়েছে, বিদেশ থেকে অর্থ পাঠিয়ে তারা দরপত্রের নথি কিনতে পারবে কি না। অর্থ পরিশোধের জন্য তারা আমাদের ব্যাংক হিসাবের তথ্যও চেয়েছে। আমরা তাদের চাওয়া সব তথ্য পাঠিয়ে দিয়েছি।'
তিনি বলেন, 'বাংলাদেশের অফশোর তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে বিপির আগ্রহ আমাদের জন্য উৎসাহব্যঞ্জক।'
প্রোডাকশন শেয়ারিং কনট্রাক্ট (পিএসসি) হলো এমন একটি চুক্তি, যেখানে তেল কোম্পানি অনুসন্ধান ও ক্ষেত্র উন্নয়নের পুরো ব্যয় ও ঝুঁকি বহন করে। বাণিজ্যিকভাবে তেল বা গ্যাসের সন্ধান মিললে উৎপাদিত সম্পদ সরকার ও কোম্পানির মধ্যে নির্ধারিত অনুপাতে ভাগ হয়। এর মাধ্যমে কোম্পানি তাদের বিনিয়োগের অর্থ পুনরুদ্ধার এবং মুনাফা অর্জনের সুযোগ পায়।
অফশোর দরপত্রের তথ্যপ্যাকেজ কিনেছে ছয় প্রতিষ্ঠান
বিপির আগ্রহের পাশাপাশি বাংলাদেশের অফশোর অয়েল অ্যান্ড গ্যাস লাইসেন্সিং রাউন্ড–২০২৬-এর তথ্যপ্যাকেজ এখন পর্যন্ত ছয়টি প্রতিষ্ঠান কিনেছে।
প্রতিষ্ঠানগুলো হলো— বেরিঙ্গিয়া পাওয়ার বাংলাদেশ লিমিটেড, ক্রিসএনার্জি, পিইএএল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন লিমিটেড, ওনোডা ইনকরপোরেটেড, রিস্টাড এনার্জি এবং ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড।
পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা আশা করছেন, আগামী কয়েক মাসে আরও আন্তর্জাতিক জ্বালানি কোম্পানি এ প্রক্রিয়ায় যুক্ত হবে। তাদের মতে, আগের দরপত্রে অংশ নেওয়া বেশ কয়েকটি বৈশ্বিক কোম্পানির কাছে বাংলাদেশের অফশোর এলাকার ভূতাত্ত্বিক তথ্য ইতোমধ্যেই রয়েছে।
প্রকৌশলী মো. শোয়েব বলেন, '২০২৪ সালের দরপত্রে ক্রিসএনার্জি, শেভরন, সিএনওওসি ও এক্সনমোবিল তথ্যপ্যাকেজ কিনেছিল। তাদের কাছে আমাদের অফশোর এলাকার প্রয়োজনীয় সব তথ্য রয়েছে।'
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রোডাকশন শেয়ারিং কনট্রাক্ট (পিএসসি) ও প্রোডাকশন শেয়ারিং অ্যাগ্রিমেন্ট (পিএসএ)-এর আওতায় কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে বিপির। প্রতিষ্ঠানটি ইন্দোনেশিয়ায় ১১টি অফশোর ব্লক পরিচালনা করছে। এছাড়া আজারবাইজানের কাস্পিয়ান সাগরের অফশোর ডি-২৩০ ব্লকে ২৫ বছরের পিএসএ, অ্যাঙ্গোলার গভীর সমুদ্রের প্রকল্প, উজবেকিস্তান, ত্রিনিদাদ ও টোবাগোসহ বিশ্বের আরও কয়েকটি দেশে তাদের কার্যক্রম রয়েছে।
বিনিয়োগ টানতে সংশোধিত পিএসসি
আন্তর্জাতিক জ্বালানি কোম্পানিগুলোকে আকৃষ্ট করতে সংশোধিত পিএসসি কাঠামোর আওতায় সরকার গত ২৪ মে বঙ্গোপসাগরের ২৬টি অফশোর ব্লক নিয়ে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করে।
এর মধ্যে ১১টি অগভীর (শ্যালো ওয়াটার) এবং ১৫টি গভীর সমুদ্রের (ডিপ ওয়াটার) ব্লক রয়েছে।
আগ্রহী কোম্পানিগুলো ১ জুন থেকে দরপত্রের নথি সংগ্রহ করতে পারছে। প্রস্তাব জমা দেওয়ার শেষ সময় ৩০ নভেম্বর। ফলে সম্ভাব্য দরদাতারা ভূতাত্ত্বিক তথ্য বিশ্লেষণ ও প্রস্তাব প্রস্তুতের জন্য ছয় মাস সময় পাচ্ছেন।
কর্মকর্তাদের মতে, সংশোধিত পিএসসিতে উন্নত আর্থিক প্রণোদনা, গ্যাসের হালনাগাদ মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা, অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে আরও নমনীয় শর্ত এবং নির্দিষ্ট শর্তে গ্যাস রপ্তানির সুযোগ রাখা হয়েছে।
এছাড়া গ্যাসক্ষেত্রের জন্য ২৫ বছর এবং তেলক্ষেত্রের জন্য ২০ বছরের উৎপাদনকাল নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রয়োজনে সর্বোচ্চ আরও ১০ বছর মেয়াদ বাড়ানোর সুযোগ থাকবে।
২০২৪ সালের দরপত্রে কোনো বিড জমা পড়েনি
২০২৪ সালের অফশোর দরপত্রে সাতটি আন্তর্জাতিক কোম্পানি তথ্যপ্যাকেজ ও দরপত্রের নথি কিনলেও শেষ পর্যন্ত কোনো প্রতিষ্ঠানই বিড জমা দেয়নি।
সেই কোম্পানিগুলো ছিল— ক্রিসএনার্জি (সিঙ্গাপুর), শেভরন বাংলাদেশ (যুক্তরাষ্ট্র), সিএনওওসি (চীন), এক্সনমোবিল (যুক্তরাষ্ট্র), ইনপেক্স করপোরেশন (জাপান), ওএনজিসি (ভারত) এবং পিটিটিইপি (থাইল্যান্ড)।
জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোকে অংশগ্রহণে উৎসাহিত করতে পিএসসির আওতায় কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে—এমন বড় তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলোর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের উদ্যোগ চালু রয়েছে।
