দুই সংস্থাকে ‘বিশেষ সুবিধা’ দেওয়ার অভিযোগ: চট্টগ্রাম বন্দরে খালি কনটেইনার স্থানান্তরের দরপত্র বাতিল
চট্টগ্রাম বন্দরের জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি) এলাকায় খালি কনটেইনার স্থানান্তরের জন্য আহ্বান করা পাঁচ বছর মেয়াদী এক বিতর্কিত দরপত্র বাতিল করেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (সিপিএ)। নির্দিষ্ট দুটি প্রতিষ্ঠানকে অনৈতিক সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্যে শর্তজুড়ে দেওয়ার অভিযোগ ওঠার পর বন্দর কর্তৃপক্ষ এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়।
বন্দরের পরিচালক (ট্রাফিক) গোলাম মো. সারওয়ারুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে গত ১৪ জুন আহ্বান করা এই দরপত্রটি আজ রোববার (৯ আগস্ট) আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল করা হয়েছে।
বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, বিজ্ঞপ্তিতে "অনিবার্য কারণ" দেখিয়ে উচ্চতর কর্তৃপক্ষের নির্দেশে এই দরপত্রটি বাতিল করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই দরপত্রের যোগ্যতা নির্ধারণে বেশ কয়েকটি জটিল ও কঠোর শর্তজুড়ে দেওয়া হয়েছিল, যা নিয়ে বন্দরের অন্যান্য অপারেটর ও ব্যবসায়ীদের মাঝে তীব্র অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। তাদের অভিযোগ ছিল, শর্তগুলো এমনভাবে সাজানো হয়েছিল যাতে কেবল সাইফ পাওয়ারটেক এবং বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিমের মালিকানাধীন এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেস-ই চূড়ান্তভাবে যোগ্য বিবেচিত হতে পারে।
বিতর্কের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল দরপত্রে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব 'এম্পটি কনটেইনার হ্যান্ডলার' এবং 'ট্রাক্টর-ট্রেইলার' ব্যবহার করে কনটেইনার পরিচালনার পূর্ব অভিজ্ঞতা থাকার বাধ্যবাধকতা।
অন্যান্য অপারেটরদের অভিযোগ, বিগত ১৭ বছর ধরে বন্দরের ভেতরে অন্য কোনো বেসরকারি কোম্পানিকে নিজস্ব 'এম্পটি কনটেইনার হ্যান্ডলার' চালানোর অনুমতি দেওয়া হয়নি। ফলে স্বাভাবিকভাবেই অন্য কারো এই ধরনের বিশেষায়িত যন্ত্রপাতি পরিচালনার অভিজ্ঞতা থাকার সুযোগ ছিল না। তাই এই বিতর্কিত শর্তটি বহাল রাখার অর্থই হলো– বাকি সম্ভাব্য সকল দরদাতাকে প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে ফেলে নির্দিষ্ট দুটি প্রতিষ্ঠানকে একচ্ছত্র সুবিধা করে দেওয়া।
এসব আপত্তির মুখে গত ১৬ জুলাই চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (অর্থ) মো. মাহবুব আলম তালুকদারের সভাপতিত্বে এক প্রাক-দরপত্র (প্রি-বিড) সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভার পর কর্তৃপক্ষ দরপত্রের কয়েকটি শর্ত কিছুটা শিথিল করার পদক্ষেপ নেয়।
ওই সভায় আগের দরপত্রের কয়েকটি শর্ত শিথিল করা হয়। ১০ বছরের মধ্যে ৫০ কোটি টাকার কাজের অভিজ্ঞতার শর্ত কমিয়ে বিগত ২৫ বছরের মধ্যে যেকোনো পাঁচ বছরে অন্তত ৪০ কোটি টাকার কাজের অভিজ্ঞতা নির্ধারণ করা হয়। সরঞ্জামের ম্যানুফ্যাকচারিং ডেট এক বছর থেকে বাড়িয়ে দুই বছর করা হয়। জামানত এক কোটি টাকা থেকে কমিয়ে ৫০ লাখ টাকা করা হয়।
তবে আর্থিক ও অভিজ্ঞতার শর্ত কিছুটা সহজ করলেও, দরদাতাদের নিজস্ব এম্পটি কনটেইনার হ্যান্ডলার ও ট্রাক্টর-ট্রেইলার থাকার প্রধান বিতর্কিত শর্তটিতে কোনো পরিবর্তন আনেনি বন্দর কর্তৃপক্ষ।
সভাটির কার্যবিবরণীতে দেখা যায়, দরপত্রে অংশ নেওয়া এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেস লিমিটেডের প্রতিনিধি নিজস্ব সরঞ্জাম ব্যবহারের বিধান বহাল রাখার জোর দাবি জানান। এ ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের পূর্ববর্তী নির্দেশনার দোহাই দেওয়া হয়।
অন্যান্য বার্থ অপারেটররা অভিযোগ করেন, নিজস্ব যন্ত্রপাতির মূল শর্তটি অপরিবর্তিত রাখায়—আর্থিক ও অন্যান্য শর্ত শিথিল করার এই উদ্যোগটি ছিল মূলত একটি লোকদেখানো পদক্ষেপ, এতে তাদের মূল উদ্বেগের কোনো সুরাহা করা হয়নি।
প্রি-বিড সভার পর দরপত্র জমা দেওয়ার সময়সীমা ১০ আগস্ট পর্যন্ত বাড়ানো হলেও – বিতর্ক ও আপত্তি থামেনি। বিতর্কিত শর্তগুলো পুরোপুরি বাতিলের দাবিতে পোর্ট অপারেটর ও ব্যবসায়ীদের ক্ষোভ ও প্রতিবাদ অব্যাহত থাকে।
অবশেষে উদ্ভূত পরিস্থিতির মুখে এবং নিরপেক্ষ প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে দরপত্র প্রক্রিয়া এগিয়ে না নিয়ে পুরো দরপত্রটিই বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেয় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ।
দরপত্র বাতিলের এই নোটিশটির অনুলিপি সাইফ পাওয়ারটেক ও এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেস ছাড়াও আরও ৯টি প্রতিষ্ঠানে পাঠানো হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—এমএইচ চৌধুরী লিমিটেড, ফজলিসন্স লিমিটেড, বশীর আহমেদ অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেড, এফকিউ খান অ্যান্ড ব্রাদার্স লিমিটেড, কিউসি শিপিং লিমিটেড, ট্রান্সমেরিন লজিস্টিকস লিমিটেড, পোর্টলিংক লজিস্টিকস সেন্টার লিমিটেড, এ অ্যান্ড জে ট্রেডার্স এবং এআর রায়হান টার্মিনাল অপারেটর।
এই বিষয়ে বাংলাদেশ বার্থ অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ফজলে ইকরাম চৌধুরী বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের উচিত এখন সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, সহজ এবং যৌক্তিক যোগ্যতার শর্ত যুক্ত করে একটি নতুন দরপত্র আহ্বান করা।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, "কাজের যোগ্যতা রয়েছে এমন প্রতিটি নিয়ম মেনে চলা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানেরই এই দরপত্রে অবাধে অংশ নেওয়ার অধিকার ও সুযোগ থাকা উচিত।"
সতর্ক করে তিনি আরও বলেন যে, কৃত্রিম বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত শর্ত আরোপ করা হলে তা শেষ পর্যন্ত আইনি বিরোধ তৈরি করতে পারে অথবা সরাসরি ক্রয় পদ্ধতির (ডাইরেক্ট প্রকিউরমেন্ট) দিকে ঠেলে দিতে পারে—যার ফলে প্রতিযোগিতা ছাড়াই দীর্ঘ মেয়াদে কাজ কুক্ষিগত করে রাখার অপচেষ্টা তৈরি হবে।
তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, "যদি একটি মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নিশ্চিত করা না যায়, তবে দিনশেষে চট্টগ্রাম বন্দর নিজেই বিশাল বড় আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হবে।"
