এইচএসসি: পাবলিক পরীক্ষা বাতিল বা স্থগিত করার দায়িত্ব কার
এইচএসসি পরীক্ষা নিয়ে জটিলতা, বৈরী আবহাওয়ায় পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত, ভুল প্রশ্ন ও শিক্ষার্থীদের 'ফার্মের মুরগি' বলার জেরে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিটি ঠিক কতটা যৌক্তিক, এর উত্তর চট করে দেওয়া সম্ভব নয়। তবে বলা যায় চরম ভোগান্তি, বিতর্কিত মন্তব্য এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ঘাটতি নিয়ে ক্ষোভ থেকে শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই পদত্যাগের দাবি উঠেছে।
টানা বৃষ্টি এবং জলাবদ্ধতার মধ্যে পরীক্ষা নেওয়ায় প্রত্যেকেই দারুণভাবে ক্ষুব্ধ হয়েছেন। পরপর ঘটে যাওয়া কয়েকটি ইস্যুকে কেন্দ্র করে শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলন, শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের মধ্যে একটা বিপরীতমুখী অবস্থান তৈরি হয়েছে। অনেকেই মন্ত্রীকে প্রতিপক্ষ ভাবছেন।
শিক্ষামন্ত্রী ইতোমধ্যেই জানিয়েছেন বর্ষা মৌসুমে পরীক্ষা নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন ছিলেন। এক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠেছে, পাবলিক পরীক্ষা বাতিল বা স্থগিত করার দায়িত্ব কার? বোর্ডের নাকি মন্ত্রণালয়ের?
একটি রিপোর্টে দেখলাম পরীক্ষা সংক্রান্ত সব দায়িত্ব, যেমন—পরীক্ষা নেওয়া, বাতিল বা স্থগিত করা বা বিশেষ পরিস্থিতিতে পরীক্ষা ছাড়াই মূল্যায়ন করার দায়িত্ব বোর্ডের। কিন্তু বাস্তবে বোর্ডের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কার্যত নির্ভর করে মন্ত্রণালয়ের ওপর।
এদিকে শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, কোনো কেন্দ্রে পানি উঠলে তাৎক্ষণিকভাবে কেন্দ্র সরিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব স্থানীয় প্রশাসনকে দেওয়া হয়েছে। এ ধরনের দুর্যোগে পরীক্ষা অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত ডিসি ও ইউএনওদের হাতে থাকে। তারা তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নেবেন পরীক্ষা নেওয়া যাবে, কী যাবে না। যদি তারা মনে করেন দুর্যোগ, তাহলে পরীক্ষা বন্ধও করতে পারেন। তাহলে প্রশ্ন, স্থানীয় প্রশাসন কেন পরীক্ষা বন্ধের সিদ্ধান্ত নিল না? কেন সমস্যাটা এতটা বাড়িয়ে তুললেন যে, শিক্ষার্থীরা শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করে রাজপথে আন্দোলন শুরু করেছে?
ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের পুনরায় পরীক্ষা নেওয়ার ঘোষণা, ভুল প্রশ্নের জন্য পূর্ণ নম্বর দেওয়ার আশ্বাস এবং ভুল প্রশ্ন প্রণয়নে জড়িত শিক্ষকদের সাময়িক বরখাস্ত করার ঘোষণাটি শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ প্রশমনে ভূমিকা রাখবে বলে আশা করছি। সমস্যা সৃষ্টি হওয়া যতটা ঝামেলাপূর্ণ, তার চাইতেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ সময়মতো ভুল স্বীকার করে, সমস্যা দ্রুত মিটিয়ে ফেলা।
অন্যদিকে পরিস্থিতির কারণে শিক্ষার্থীদের অসুবিধা হওয়ার জন্য এবং নিজ মন্তব্যের জন্য শিক্ষামন্ত্রী জাতীয় সংসদে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। আন্তঃশিক্ষা বোর্ড পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক কমিটি বলেছে, প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট প্রশ্নের জন্য পরীক্ষার্থীদের পূর্ণ নম্বর দেওয়া হবে। সরকারের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে নেওয়ার আশ্বাস ও বিকল্প পরীক্ষার সুযোগ দেওয়াটা সবার জন্যই আপাতত ভালো হয়েছে।
এরপরেও কয়েকটি ইস্যু নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চিন্তা করা উচিৎ, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো সমস্যা তৈরি না হয়। যেমন প্রথমত, এরকম একটা বৈরী আবহাওয়ায় পরীক্ষা না নিলে শিক্ষা বোর্ডের কী অসুবিধা হতো, তা বোধগম্য হয়নি। বহু শিক্ষার্থী কেন্দ্রে পৌঁছাতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছে, অনেকের প্রবেশপত্র ভিজে নষ্ট হয়ে গেছে, কেউ সড়ক দুর্ঘটনায়ও পড়েছে এবং অনেকে পরীক্ষার হলে উপস্থিত হতে পারেনি।
বৃষ্টিতে এবং সড়কে জমে থাকা পানিতে ভেজার পর, পরীক্ষার হলে বসে পরীক্ষা দেওয়ার মতো বাজে অভিজ্ঞতার কথা ভাবাই যায় না। তাও এইচএসসি'র মতো জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। নোংরা পানির মধ্যে দিয়ে হেঁটে, ভিজা শরীরে ছাত্রছাত্রীদের পরীক্ষা দিতে হয়েছে, তাদের সেই অসহায়ত্বের কথা কল্পনাও করা যায় না।
আবহাওয়ার পূর্বাভাস তো আগেই ছিল, তাহলে সেই পূর্বাভাস অনুযায়ী পরীক্ষা পেছাতে কোনো সমস্যা থাকার কথা নয়। এই দুর্যোগের মধ্যে পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়ার প্রবণতা প্রমাণ করে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে শিক্ষার্থীদের সুবিধা-অসুবিধার বদলে আমলাতান্ত্রিক মানসিকতাই প্রধান, মানবিকতা নয়।
শুধু পরীক্ষা নেওয়াই নয়, ঝুঁকি নিয়ে বস্তাবন্দী করে, পানির ওপর দিয়ে ভ্যানগাড়ি ও রিকশায় করে এইচএসসির খাতা পরিবহন করেছেন শিক্ষকরা। খাতা পরিবহনের ছবি দেখে বিস্মিত হয়েছি। এই খাতা একজন পরীক্ষার্থীর জন্য কতটা মূল্যবান, সেটা কি কর্তৃপক্ষ ভেবে দেখেছেন? একটা বক্স যদি পানিতে পড়ে যায়, বা অন্য কোনোভাবে হাতছাড়া হয়, তখন এর ফল কারা ভোগ করবে? শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থীদেরই এই দায় নিতে হতো।
বিরূপ আবহাওয়া ও বন্যা পরিস্থিতির মধ্যেও চলমান পাবলিক পরীক্ষা স্থগিত না করার সিদ্ধান্তের হাস্যকর ব্যাখ্যা দিয়েছে বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি। তারা বলেছে, শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের প্রস্তুতি, শিক্ষাজীবন এবং ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করেই পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে যে উদ্বেগ, তা তারা আন্তরিকভাবে উপলব্ধি করার পরেও ১২.৭০ লাখ পরীক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ এই পরীক্ষার সঙ্গে জড়িত থাকায় বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছে।
এই যদি তাদের গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হয়, তাহলে মন্তব্য করার আর কিছু থাকে না। এখানে সাড়ে ১২ লাখ পরীক্ষার্থীর কথা আসছে কেন? তাদের তো সব বোর্ডের পরীক্ষা পেছানোর কথা বলা হয়নি, বলা হয়েছে দুর্যোগ উপদ্রুত এলাকার পরীক্ষা পেছানোর কথা।
তারা শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনে অনিশ্চয়তা তৈরির কথা ভাবলেন, কিন্তু এভাবে দুর্যোগের মধ্যে পরীক্ষা দিলে যে ফলাফল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে, সে কথা ভাবলেন না। ভবিষ্যতে এরকম পরিস্থিতি পুনরায় সৃষ্টি হতে পারে। দুর্যোগ-দুর্বিপাক বা এ জাতীয় বড় সমস্যা হলে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি কী করবে, ভেবেচিন্তে আগেই সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে রাখা দরকার। শিক্ষার্থীদের জীবন নিয়ে ফাইজলামি চলে না।
দ্বিতীয়ত, যখন শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ জানাতে রাজপথে নেমে এলো, শিক্ষামন্ত্রী আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের 'ফার্মের মুরগি' বলে আখ্যায়িত করলেন। এটি শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে এবং এতে তার পদত্যাগের দাবি জোরালো হয়েছে।
একজন মন্ত্রী ও সিনিয়র রাজনৈতিক নেতা যখন কোনো ইস্যুতে মন্তব্য করবেন, তখন অবশ্যই তা সচেতনতার সাথে করতে হবে। আমরা অতীতে দেখেছি এরকম হঠাৎ মন্তব্যকে কেন্দ্র করে পুরো সরকারকে বিদায় নিতে হয়েছে। যা ভুল হয়েছে, বা যতটা ভুল হয়েছে, তা নিয়ে জেদাজেদি না করে এর জন্য শুরুতেই ক্ষমা প্রার্থনা করাই উত্তম।
তৃতীয়ত, শুধু দুর্যোগের মধ্যে পরীক্ষা নেওয়াই নয়, শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেছে, এবার প্রশ্ন অনেক কঠিন হয়েছে এবং প্রশ্নে কিছু ভুলও ছিল। এইচএসসি পরীক্ষায় পদার্থবিদ্যার মতো একটা বিষয়ের প্রশ্নপত্রে ভুল থাকে কীভাবে?
শিক্ষামন্ত্রী পদার্থ বিজ্ঞান পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে ভুলের জন্য বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের মডারেটরের ওপর দায় চাপিয়েছেন। তিনি বলেছেন, "ফিজিক্সের ছয় ও সাত নাম্বার প্রশ্ন দুটি ভুল হয়েছে। আমরা দায়িত্ব পেয়েছি মাত্র চার মাস। আগের কোয়েশ্চেন মডারেটর কোয়েশ্চেন করেছিল। আপনারা জানেন যে, কোয়েশ্চেন মডারেট করতে হলে এই প্রক্রিয়াটি দুই বছর আগে শুরু করতে হয়। আমরা এসে কোনো কোয়েশ্চেন তৈরি করতে পারিনি। বিগত গভর্নমেন্টের যে মডারেটর ছিল তারাই কোয়েশ্চেন করেছে।"
উনি যতই অন্য সরকারের ঘাড়ে দোষ চাপানোর চেষ্টা করেন না কেন, এই দায় বর্তমান সরকারের সময়কার কমিটিকেই নিতে হবে। কারণ পরীক্ষাটা তাদের তত্ত্বাবধানেই হচ্ছে। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা বর্তমান সরকারকেই সামনে দেখছেন।
তবে তাৎক্ষণিকভাবে ওই দুটি প্রশ্নে পুরো নম্বর দেওয়া ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এইভাবে গণহারে নাম্বার দেওয়ায় ভালো ছাত্রছাত্রীরা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, অপেক্ষাকৃত মন্দ ছাত্রছাত্রীরা খুশি হয়। অটোপাস, গণ নাম্বার প্রদান আপৎকালীন সময়ে দেওয়া হয় ঠিকই, কিন্তু এটাই যেন নিয়মিত চর্চা না হয়ে দাঁড়ায়।
যাহোক স্কুল-কলেজগুলোতে শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে, যেকোনো মূল্যে। চলতি বছর এইচএসসি পরীক্ষা হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু ভবিষ্যতে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা নিয়ে যেন আর কোনো বিপর্যয় না হয়, সেদিকে দৃষ্টি দিতে হবে। শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবার আগে অবশ্যই মন্ত্রণালয়, স্কুল-কলেজ কর্তৃপক্ষ, স্থানীয় প্রশাসন, বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারদের মধ্যে আলোচনা, বিতর্ক হতে হবে। অভিভাবক ও শিক্ষাবিদদের পরামর্শ নিতে হবে।
শিক্ষামন্ত্রীকে নিয়ে কিছু ছাত্র-ছাত্রীর বিদ্রুপাত্মক আচরণ নিয়েও দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইছি। উনি যেহেতু বিভিন্ন স্থানে যাচ্ছেন, বিভিন্নজনের সঙ্গে কাছ থেকে কথা বলছেন, সেটাকে হালকা করে দেখার একটা প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সেদিন দেখলাম স্কুলের ছাত্রীরা মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীকে 'মিলন, মিলন' বলে সম্বোধন করে কথা বলছে, হাসছে। এই আচরণেকে খুবই অভব্য আচরণ বলে মনে হয়েছে, যা কোনো শিক্ষার্থীর কাছে কখনো কাম্য নয়।
শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ করতে পারে, মতামত দিতে পারে, মন্ত্রী মহোদয়ের বক্তব্যের সমালোচনাও করতে পারে, এমনকি তার পদত্যাগের দাবিও জানাতে পারে। কিন্তু তারা এমন কিছু করতে পারে না, যা অশোভন ও শ্রুতিকটূ।
অন্যদিকে মন্ত্রী মহোদয়ের কাছে আশা, উনি যেন পলিসি লেভেলে শক্ত হাতে কাজ করেন। শিক্ষার মঙ্গলের স্বার্থে এমন এমনকিছু ডায়ানেমিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করুন যেন শুধু নকল ঠেকানো নয়, পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাতেই একটা ইতিবাচক পরিবর্তন আসে।
লেখক: যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও কলাম লেখক
- বিশেষ দ্রষ্টব্য: নিবন্ধের বিশ্লেষণটি লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও পর্যবেক্ষণের প্রতিফলন। অবধারিতভাবে তা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর অবস্থান বা সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়।
