শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে ঢাকাসহ ৬ জেলায় এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের বিক্ষোভ
বৈরী আবহাওয়ার মধ্যেও এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়ার সরকারি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে আজ (১৪ জুলাই) ঢাকাসহ পাঁচ জেলায় বিক্ষোভ করেছেন এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার্থীরা।
বিক্ষোভকারীরা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে শিক্ষামন্ত্রী এ. এন. এম. এহছানুল হক মিলনের পদত্যাগসহ তিন দফা দাবি জানান। সরকারের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ঢাকা, বগুড়া, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও ফরিদপুরে এসব কর্মসূচি পালিত হয়।
পরীক্ষার্থীদের অন্য দুই দাবি হলো— বৈরী আবহাওয়ার পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা স্থগিত রাখা এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে সোমবার (১৩ জুলাই) অনুষ্ঠিত পরীক্ষায় অংশ নিতে না পারা শিক্ষার্থীদের জন্য পুনঃপরীক্ষার ব্যবস্থা করা।
আজ সকাল সাড়ে ১১টার দিকে রাজধানীর সায়েন্সল্যাব মোড় ও উত্তরার বিএনএস সেন্টারের সামনে সড়ক অবরোধ করেন শিক্ষার্থীরা। এতে ওই দুই এলাকায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
সায়েন্সল্যাব মোড়ে ঢাকা কলেজ, সিটি কলেজ, সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, আব্দুর রউফ কলেজ, নূর মোহাম্মদ পাবলিক কলেজ, ঢাকা ইম্পেরিয়াল কলেজ, ক্যামব্রিয়ান কলেজ, ঢাকা আইডিয়াল কলেজ, ঢাকা কমার্স কলেজ ও বিএফ শাহীন কলেজসহ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভে অংশ নেন।
বিক্ষোভ চলাকালে শিক্ষার্থীরা 'দফা এক, দাবি এক, মিলনের পদত্যাগ', 'আমাদের ন্যায্য দাবি মানতে হবে', 'অ্যাকশন, অ্যাকশন, ডাইরেক্ট অ্যাকশন'সহ বিভিন্ন স্লোগান দেন।
পরে দুপুর ১টার দিকে সায়েন্সল্যাব মোড় থেকে শিক্ষার্থীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি চত্বরের দিকে যান। সেখানে অবস্থান নেওয়ার পর শাহবাগের দিকে যেতে চাইলে পুলিশ তাদের বাধা দেয়। পরে নীলক্ষেত থেকে স্যার এ এফ রহমান হলের সামনের সড়কে প্রায় এক ঘণ্টা অবস্থান করেন তারা। এরপর বেলা পৌনে ২টার দিকে শিক্ষার্থীরা নীলক্ষেতের দিকে সরে যান।
ঢাকা কমার্স কলেজের বাণিজ্য বিভাগের এইচএসসি পরীক্ষার্থী আলিফ দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "প্রধানমন্ত্রীর নজরে আসার জন্য আমরা এখানে অবস্থান নিয়েছি। জলাবদ্ধতার মধ্যে গতকাল এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়ার প্রতিবাদে আমরা শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ চাই।"
তিনি আরও বলেন, "পদার্থবিজ্ঞান পরীক্ষায় ভুল প্রশ্ন এসেছে। হিসাববিজ্ঞান পরীক্ষার প্রশ্নও কঠিন হয়েছে। আমরা চাই মানসম্মত প্রশ্নে পরীক্ষা নেওয়া হোক।"
ক্যামব্রিয়ান কলেজের শিক্ষার্থী আইমান মাহমুদ বলেন, "শিক্ষামন্ত্রী দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই শিক্ষার্থীদের প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখছেন। বিভিন্ন কেন্দ্রে ২০২৫ সালের প্রশ্ন দেওয়া হয়েছে। বৈরী আবহাওয়া যতদিন থাকবে, ততদিন পরীক্ষা স্থগিত রাখতে হবে।"
তিনি বলেন, "১৩ জুলাই ফিজিক্স ও অ্যাকাউন্টিং পরীক্ষায় অনেক শিক্ষার্থী অংশ নিতে পারেনি। ওই দুটি পরীক্ষা পুনরায় নিতে হবে এবং শিক্ষামন্ত্রীকে শিক্ষার্থীদের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।"
সিটি কলেজের শিক্ষার্থী সিয়াম বলেন, "এত দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যেও পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে। এতে পরীক্ষাকেন্দ্রে যেতে শিক্ষার্থীদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে। এরপরও পরীক্ষা স্থগিত করা হয়নি।"
তিনি আরও বলেন, "সম্পূর্ণ সিলেবাস শেষ না করেই পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে। ফলে অনেক শিক্ষার্থী প্রত্যাশিতভাবে পরীক্ষা দিতে পারেনি এবং মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।"
এদিকে, একই সময়ে উত্তরার বিএনএস সেন্টারের সামনেও শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ করেন। এতে ঢাকা-ময়মনসিংহ সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
উত্তরা ট্রাফিক বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) মো. রুবেল হক বলেন, সকাল সাড়ে ১১টার দিকে শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ করেন। এতে ওই সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
সায়েন্সল্যাব মোড়ের অবরোধের বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগের নিউমার্কেট জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) তোয়াহা ইয়াসীন হোসেন বলেন, শিক্ষার্থীদের অবরোধের কারণে শাহবাগ থেকে সায়েন্সল্যাবমুখী সড়কে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে।
এদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে 'জাতীয় স্টার্টআপ ও উদ্যোক্তা প্ল্যাটফর্ম' উদ্বোধন কর্মসূচিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উপস্থিত থাকায় মুহসীন হল গেট ও মলচত্বরের প্রবেশমুখে পুলিশ ও বিজিবি সদস্যদের সতর্ক অবস্থানে থাকতে দেখা যায়।
এর আগে শিক্ষার্থীরা তিন দফা দাবি জানিয়ে কর্মসূচির ঘোষণা দেন। তাদের দাবিগুলো হলো— বৈরী আবহাওয়া পুরোপুরি কেটে না যাওয়া পর্যন্ত এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত রাখা, ১৩ জুলাই প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে যারা পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেনি তাদের জন্য পুনঃপরীক্ষার ব্যবস্থা করা এবং আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ।
চট্টগ্রাম: শিক্ষা বোর্ডে ৭ দফা দাবি জমা দিল প্রতিনিধি দল
৭ দফা দাবি বাস্তবায়নে আজ (১৪ জুলাই) বিকেল ৪টা পর্যন্ত আল্টিমেটাম দিয়ে চট্টগ্রাম নগরের গুরুত্বপূর্ণ ২ নম্বর গেট মোড় অবরোধ করেছেন এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা। এর ফলে সড়কে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয় এবং ভোগান্তিতে পড়েন কর্মজীবী ও সাধারণ মানুষ।
এদিন দাবি আদায়ে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে পরীক্ষার্থীদের ১৩ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল বোর্ডের সচিব অধ্যাপক মোহাম্মদ জহিরুল হক স্বপনের সঙ্গে বৈঠক করে।
দুপুর দেড়টার দিকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা শিক্ষা বোর্ডের সামনে থেকে মিছিল নিয়ে ২ নম্বর গেট মোড়ে গিয়ে সড়ক অবরোধ করেন। এতে নগরের অন্যতম ব্যস্ত এই সড়কে যান চলাচল স্থবির হয়ে পড়ে এবং দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ঘটনাস্থলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা অবস্থান নেন।
আন্দোলনকারীদের প্রতিনিধিদলের সদস্য ও চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক কলেজের শিক্ষার্থী মো. রিফাতুর রহমান টিবিএস-কে বলেন, 'আমাদের ১৩ সদস্যের প্রতিনিধি দল শিক্ষা বোর্ডের সচিবের সঙ্গে বৈঠক করেছে। বিকেল ৪টার মধ্যে আমাদের দাবিগুলোর বিষয়ে সন্তোষজনক সিদ্ধান্ত না এলে পরবর্তী কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।'
শিক্ষার্থীরা শিক্ষা বোর্ড চেয়ারম্যানের কাছে দেওয়া স্মারকলিপিতে ৭ দফা দাবি উত্থাপন করেন। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে— দেশের সার্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা স্থগিত রাখা; প্রশ্নপত্রে ত্রুটির জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং উত্তরপত্রের যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত করা; প্রশ্ন প্রণয়নে মান ও পাঠ্যক্রমের (সিলেবাস) সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখা; শিক্ষার্থীদের সম্পর্কে অবমাননাকর মন্তব্য থেকে বিরত থাকা এবং শিক্ষামন্ত্রীর সাম্প্রতিক বক্তব্যের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া; সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ; বৈরী আবহাওয়ার কারণে ১৩ জুলাই পরীক্ষায় অংশ নিতে না পারা শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা ও নষ্ট হওয়া প্রবেশপত্র ও নিবন্ধনপত্র (রেজিস্ট্রেশন কার্ড) পুনরায় ইস্যু করা; এবং অবশিষ্ট পরীক্ষার জন্য বাস্তবসম্মত নতুন সময়সূচি প্রণয়ন ও কঠিন বিষয়গুলোর আগে পর্যাপ্ত প্রস্তুতির সময় নিশ্চিত করা।
স্মারকলিপিতে শিক্ষার্থীরা উল্লেখ করেন, গত ১৩ জুলাই বৈরী আবহাওয়ার কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের আওতাধীন অনেক পরীক্ষার্থী যথাসময়ে কেন্দ্রে পৌঁছাতে পারেননি। একই সঙ্গে প্রশ্নপত্রে বিভিন্ন ত্রুটির অভিযোগ পরীক্ষার্থীদের মধ্যে চরম উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
এসব বিষয় দ্রুত সমাধানের দাবি জানিয়ে শিক্ষার্থীরা বলেন, অন্যথায় পরীক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
এর আগে সকাল ১১টার দিকে বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরা নগরের ষোলশহর এলাকায় জড়ো হয়ে শিক্ষা বোর্ডের সামনে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন। পরবর্তীতে তারা সড়ক অবরোধে যান। প্রথমে তিন দফা দাবিতে আন্দোলন শুরু হলেও পরে শিক্ষা বোর্ডে জমা দেওয়া স্মারকলিপিতে ৭ দফা দাবি উত্থাপন করা হয়।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি
শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া। আজ বিকেলে জেলা শহরের প্রেস ক্লাবের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা।
প্রত্যক্ষদর্শী ও আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার বিকেল পৌনে ৬টা থেকে সাড়ে ৬টা পর্যন্ত ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রেস ক্লাবের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন শিক্ষার্থীরা। এতে জেলা শহরের বিভিন্ন কলেজের বিপুল সংখ্যক এইচএসসি পরীক্ষার্থী অংশ নেন।
বিক্ষোভ চলাকালে শিক্ষার্থীরা শিক্ষামন্ত্রীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। এ সময় তারা 'তুমি কে আমি কে, ফার্মের মুরগি ফার্মের মুরগি; কে বলেছে কে বলেছে, শিক্ষামন্ত্রী শিক্ষামন্ত্রী' বলে স্লোগান দিয়ে চারপাশ মুখরিত করে তোলেন।
বিক্ষোভ সমাবেশে বক্তব্য রাখেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজ এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌর কলেজের শিক্ষার্থীসহ আরও অনেকে।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে সারাদেশে এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের যে আন্দোলন চলছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শিক্ষার্থীরা তার সঙ্গে পূর্ণ একাত্মতা পোষণ করছে। তারা অভিযোগ করেন, শিক্ষামন্ত্রী শিক্ষার্থীদের নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করেছেন যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
বক্তারা অবিলম্বে একদফা দাবি মেনে নিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেন। অন্যথায় আগামীতে আরও কঠোর ও রাজপথ অবরোধের মতো কর্মসূচি গড়ে তোলার হুঁশিয়ারি দেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা।
