উত্তরায় শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ও বিমানবন্দর সড়কে অচলাবস্থা, দুর্ভোগে যাত্রীরা
প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়ার সরকারি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে আজ মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে রাজধানীর সায়েন্সল্যাব মোড় ও উত্তরার বিএনএস টাওয়ারের সামনে সড়ক অবরোধ করেন এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা। এতে গুরুত্বপূর্ণ এই দুই সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। সৃষ্টি হয় তীব্র যানজটের।
বিক্ষোভকারীরা আগামীকাল 'মার্চ টু শিক্ষা মন্ত্রণালয়' কর্মসূচিও ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে তারা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের পদত্যাগের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন।
শিক্ষার্থীরা জানান, বন্যা ও বৈরী আবহাওয়ার মধ্যেও এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়ার প্রতিবাদে তারা আন্দোলন করছেন।
তাদের দাবি, পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত পরীক্ষা স্থগিত করতে হবে। পাশাপাশি, প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে গত ১৩ জুলাইয়ের পরীক্ষায় অংশ নিতে না পারা পরীক্ষার্থীদের জন্য নতুন করে পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।
এর আগে দিনের শুরুতে ঢাকা কলেজ, ঢাকা সিটি কলেজ, সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আবদুর রউফ পাবলিক কলেজ, নূর মোহাম্মদ পাবলিক কলেজ, ঢাকা ইম্পেরিয়াল কলেজ, ক্যামব্রিয়ান কলেজ, ঢাকা কমার্স কলেজ, ঢাকা আইডিয়াল কলেজ, বিএএফ শাহীন কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা সায়েন্স ল্যাব মোড় অবরোধ করেন। এতে মিরপুর সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
অবরোধের কারণে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কসহ বিভিন্ন সড়কে সারাদিনই ছিল তীব্র যানজট। আর এতে ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে বিদেশগামী যাত্রীসহ কর্মজীবীদের।
প্রায় এক ঘণ্টা সায়েন্সল্যাব মোড় অবরোধের পর সড়ক ছেড়ে দেন শিক্ষার্থীরা। এরপর তারা মিছিল নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি চত্বরের দিকে যান।
সেখানে অবস্থান নেওয়ার পর শাহবাগের দিকে যেতে চাইলে পুলিশ তাদের বাধা দেয়। পরে নীলক্ষেত থেকে স্যার এ এফ রহমান হলের সামনের সড়কে প্রায় এক ঘণ্টা অবস্থান করেন তারা। এরপর বেলা পৌনে ২টার দিকে শিক্ষার্থীরা নীলক্ষেত হয়ে বকশিবাজার মোড়ে ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের সামনে যান।
সেখান থেকে ফিরে বিকেল পৌনে চারটার দিকে আবার সায়েন্স ল্যাব মোড় অবরোধ করেন তারা। সেখানে প্রায় এক ঘণ্টা অবস্থানের পর বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে আন্দোলনকারীরা জাতীয় সংসদ ভবনের অভিমুখে যাত্রা করেন।
সংসদে অধিবেশন চলার মধ্যেই সন্ধ্যা ছয়টার দিকে শিক্ষার্থীরা সংসদ ভবনের প্রধান ফটকের সামনে অবস্থান নিয়ে নানা স্লোগান দিতে থাকেন। ব্যারিকেড দিয়ে বন্ধ করে দেন মানিক মিয়া এভিনিউর একাংশের রাস্তা।
পরে সন্ধ্যা পৌনে ৭টার দিকে শিক্ষার্থীরা জাতীয় সংসদ ভবনের ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করলে পুলিশ তাদের লাঠিচার্জ করে সরিয়ে দেয়। এ সময় বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে দাবি করেছেন আন্দোলনকারীরা। তবে তাৎক্ষণিকভাবে তাদের নাম পরিচয় জানা যায়নি।
এদিকে, বিকাল ৪টার দিকে মিরপুরের ইসিবি চত্ত্বর অবরোধ করেন একদল পরীক্ষার্থী। এতে ইসিবি থেকে কালশী ও ইসিবি থেকে হোটেল রেডিসন ব্লু'র দিকে যান চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। পরে সন্ধ্যা পৌনে ৬টায় তারা সড়ক ছেড়ে দেন।
অন্যদিকে উত্তরা বিএনএস টাওয়ারের সামনে সকাল সাড়ে ১১টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা পর্যন্ত প্রায় ৮ ঘণ্টা ঢাকা-ময়মনসিংহ সড়ক অবরোধ করে আন্দোলন করেন পরীক্ষার্থীরা। এতে ঢাকা ময়মনসিংহ সড়কের উভয় পাশে যান চলাচল বন্ধ হয়ে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। যা ছড়িয়ে পড়ে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েসহ অন্যান্য রাস্তায়।
সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় পরীক্ষার্থীরা উত্তরার রাস্তা ছেড়ে দিলেও রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত উত্তরা থেকে বনানী পর্যন্ত সড়কে তীব্র যানজট দেখা যায়।
এফডিইই কোম্পানি লিমিটেডের অপারেশন অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স বিভাগের ব্যবস্থাপক ক্যাপ্টেন (অব.) হাসিব হাসান খান টিবিএসকে বলেন, 'উত্তরায় শিক্ষার্থীদের সড়ক অবরোধের কারণে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ডাউন সাইডে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়েছে। যানজট এয়ারপোর্ট থেকে আর্মি স্টেডিয়াম পর্যন্ত ছড়িয়ে গেছে।'
এদিকে দিনভর শিক্ষার্থীদের সড়ক অবরোধের কারণে তীব্র যানজটে ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে বিদেশগামী যাত্রীসহ বিভিন্ন কাজে বের হওয়া যাত্রীদের। যানজটের কারণে দীর্ঘ সময় সড়কে অবস্থানের পর উপায় না পেয়ে অনেককে হেঁটেই কর্মস্থলে যেতে দেখা গেছে।
একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সিনিয়র এক্সিকিউটিভ শাহরিয়ার খান টিবিএসকে বলেন, 'শিক্ষার্থীদের সড়ক অবরোধের কারণে আমি দুই ঘণ্টা ধরে এক্সপ্রেসওয়েতে আটকা পড়েছিলাম। কুড়িল এলাকা থেকেই আমি আটকে পড়ি এবং সেখান থেকে ফিরে আসার কোনো উপায় ছিল না। বিমানবন্দরগামী যাত্রীরা তাদের মালপত্র নিয়ে হেঁটে যেতে বাধ্য হন।'
আরেকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবী মল্লিকা রিক্তা টিবিএসকে বলেন, 'অফিসের কাজে গাজীপুর যাচ্ছিলাম। সকালে এক্সপ্রেসওয়ে থেকে নেমেই যানজটে পড়ি। প্রায় দুই ঘণ্টা বসে থেকে উপায় না পেয়ে পরে ৩০০ ফিট হয়ে গাজীপুর যাই। সন্ধ্যায়ও সড়ক অবরোধ থাকায় কাজ শেষে বনশ্রী হয়ে ঢাকায় ফিরি।'
এদিকে ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের এয়ারপোর্ট জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) এস এম হাসিবুর রহমান বাবু বলেন, 'সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে শিক্ষার্থীরা সড়ক ছেড়ে দিয়েছেন। তবে দিনভর অবরোধের কারণে ঢাকা-ময়মনসিংহ সড়কে তীব্র যানজট রয়েছে। যা ঠিক হতে কিছুটা সময় লাগবে।'
ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের গুলশান জোনের এসি আবু সায়েম নয়ন টিবিএসকে বলেন, 'সন্ধ্যা পৌনে ৬টায় শিক্ষার্থীরা ইসিবি চত্ত্বর ছেড়ে দেয়। এখন যান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে।'
প্রসঙ্গত, আজ ঢাকা, কুমিল্লা, বগুড়া, বরিশাল, চট্টগ্রাম, ফরিদপুর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একযোগে এই বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করা হয়।
এদিকে, শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন শিক্ষার্থীদের আন্দোলন বন্ধ করে পড়াশোনায় ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি আশ্বস্ত করে বলেন, বন্যা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা প্রশাসনিক ত্রুটির কারণে কোনো শিক্ষার্থী বঞ্চিত হবে না।
সংসদে দেওয়া বক্তব্যে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, সরকার পরীক্ষার পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। বন্যা বা প্রশাসনিক ব্যর্থতার কারণে যেসব শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেনি, প্রয়োজন হলে তাদের জন্য পুনঃপরীক্ষার ব্যবস্থা করা হবে।
তিনি বলেন, 'শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ফিরে যাওয়া উচিত। কীভাবে সুষ্ঠুভাবে পরীক্ষা নেওয়া যায় এবং এই দুর্যোগ পরিস্থিতি মোকাবিলা করা যায়, তা নিয়ে আমরা তাদের চেয়েও বেশি উদ্বিগ্ন।'
