সিলেট-সুনামগঞ্জে পানি সামান্য কমলেও বাড়ছে শঙ্কা, হবিগঞ্জ-মৌলভীবাজারে পানিবন্দি অর্ধলক্ষাধিক
টানা দুদিন বাড়ার পর সিলেট ও সুনামগঞ্জের প্রধান দুই নদী সুরমা ও কুশিয়ারার পানি শনিবার সকালে কিছুটা কমেছে। তবে একই সময়ে বেড়েছে সিলেটের সীমান্তবর্তী সারি-গোয়াইন নদীর পানি। এদিকে হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারে আকস্মিক বন্যায় পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে; সেখানে এখন পর্যন্ত অন্তত অর্ধলক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে আছেন।
সিলেট ও সুনামগঞ্জের পরিস্থিতি
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানিয়েছে, শনিবার দুপুর পর্যন্ত সিলেটে উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাত না হওয়ায় পানি কমতে শুরু করেছে। তবে উজানে বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢল নামলে পানি ফের বাড়তে পারে বলে শঙ্কা কাটেনি।
পাউবো সিলেট কার্যালয়ের তথ্যমতে, সিলেটের সব নদ-নদীর পানি বর্তমানে বিপদসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সুরমা নদীর কানাইঘাট পয়েন্টে সকাল ৬টায় পানির উচ্চতা ছিল ১২.৩৯ সেন্টিমিটার, যা বেলা ১২টায় কমে ১২.৩৮ সেন্টিমিটার হয়েছে। সিলেট পয়েন্টে পানি ৯.৭৯ সেন্টিমিটার থেকে কমে হয়েছে ৯.৭৮ সেন্টিমিটার। কুশিয়ারা নদীর পানি অধিকাংশ পয়েন্টে কমলেও ফেঞ্চুগঞ্জে সামান্য বেড়েছে। এখানে পানি ৯.৬৬ সেন্টিমিটার থেকে বেড়ে ৯.৬৭ সেন্টিমিটার হয়েছে। অন্যদিকে, সারি-গোয়াইন নদীর পানি সারিঘাট পয়েন্টে ১০.৬০ সেন্টিমিটার থেকে বেড়ে ১০.৬৬ এবং গোয়াইনঘাট পয়েন্টে ৯.৭৭ থেকে বেড়ে ৯.৮২ সেন্টিমিটার হয়েছে।
পাউবো সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী দীপক রঞ্জন দাশ বলেন, 'সকাল থেকে বৃষ্টি ও ঢল কম থাকায় পানি কিছুটা কমেছে। তবে আবহাওয়া পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে পানি আবারও বাড়তে পারে।'
সুনামগঞ্জেও সুরমা নদীর পানি গত ২৪ ঘণ্টায় ২ সেন্টিমিটার কমেছে। পাউবো সুনামগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী-২ এমদাদুল হক জানান, বৃষ্টি ও ঢল কমায় নদীর পানি কমলেও বন্যার শঙ্কা এখনো বিদ্যমান। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সুনামগঞ্জ পৌরসভার সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীর ছুটি বাতিল করা হয়েছে। স্থানীয় সরকার শাখার ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক মো. মতিউর রহমান খান জানান, দুর্যোগ মোকাবিলায় একটি কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। যেকোনো প্রয়োজনে ০১৭১৬৩৮৮৩৮২ নম্বরে যোগাযোগের অনুরোধ জানানো হয়েছে।
হবিগঞ্জে ভোগান্তি তুঙ্গে
হবিগঞ্জের খোয়াই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে সদর, বানিয়াচং ও বাহুবল উপজেলার অন্তত ৩০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাত থেকে কালিগঞ্জ-চরহামুয়া এলাকায় বাঁধ ভেঙে এবং রাধাপুর এলাকায় নদীর পানি উপচে লোকালয়ে ঢুকছে।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, তিনটি উপজেলার ৫টি ইউনিয়নের ৬ হাজারের বেশি পরিবার পানিবন্দি। কেবল হবিগঞ্জ সদর উপজেলাতেই প্রায় ৩০ হাজার মানুষ দুর্ভোগে পড়েছেন। ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে প্রায় এক হাজার মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে উঠেছেন। হবিগঞ্জ-মিরপুর সড়কের বিভিন্ন অংশ তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন জানান, পরিস্থিতি মোকাবিলায় ৫ লাখ টাকা, ১০০ টন চাল ও ১,৮২০ প্যাকেট শুকনো খাবার মজুত রয়েছে এবং বিতরণ শুরু হয়েছে।
মৌলভীবাজারে একজনের মৃত্যু, নতুন এলাকা প্লাবিত
মৌলভীবাজারে মনু ও ধলাই নদীর ভাঙনে জেলা সদর, কমলগঞ্জ, রাজনগর ও কুলাউড়া উপজেলার ১৭টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। পাউবো জানিয়েছে, মনু নদীর পানি বিপদসীমার ৮০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
এদিকে মৌলভীবাজারের রাজনগরে বানের পানিতে আটকা পড়ে মো. আশরফ মিয়া (৭০) নামে এক বৃদ্ধের মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার বিকেলে টেংরা ইউনিয়নের আকুয়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। পরিবারের সদস্যরা নিরাপদ আশ্রয়ে গেলেও তিনি নিজ ঘরেই থেকে গিয়েছিলেন।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ ছাদু মিয়া জানান, বর্তমানে জেলার ৪,১৭৫টি পরিবার পানিবন্দি অবস্থায় আছে। পানি না কমলে ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। অনেক এলাকায় খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধ মেরামতে কাজ করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।
