চট্টগ্রামে বন্যা: তলিয়ে গেছে ১৫,৯১১ হেক্টর ফসলি জমি, ভেসে গেছে ৯১ কোটি টাকার মাছ
চট্টগ্রামে টানা এক সপ্তাহের ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় প্রাথমিক হিসাবে জেলায় ১৫ হাজার ৯১১ দশমিক ১৬ হেক্টর ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাশাপাশি ১৫৩টি ইউনিয়নে ৯ হাজার ৯৩৩টি পুকুর, দিঘি ও মৎস্য খামারের মাছ ভেসে গিয়ে মৎস্য খাতে ৯১ কোটি ৪১ লাখ ৫৩ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও জেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয়ের প্রাথমিক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
শনিবার (১১ জুলাই) প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে মাঠপর্যায়ে ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সংগ্রহ চলছে। অনেক এলাকায় এখনও পানি জমে থাকায় প্রকৃত ক্ষতির চিত্র পুরোপুরি স্পষ্ট হয়নি। পানি নেমে যাওয়ার পর জরিপ করে চূড়ান্ত ক্ষয়ক্ষতির হিসাব প্রকাশ করা হবে।
মৎস্য খাতে সবচেয়ে বড় ধাক্কা বাঁশখালীতে
জেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মৎস্য খাতে সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে বাঁশখালী উপজেলায়। প্রাথমিক হিসাবে, সেখানে ২ হাজার ৫০০টি পুকুর, ৩১০টি চিংড়ি ঘের এবং প্রায় ১ হাজার ৯৭০ হেক্টর জলাশয়ের মাছ ভেসে গিয়ে প্রায় ৪১ কোটি ৫০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
ক্ষয়ক্ষতির দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে সাতকানিয়া। উপজেলাটিতে ৪৬৬ হেক্টর জলাশয়ের মাছ চাষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে প্রায় ১০ কোটি ৭৬ লাখ টাকার লোকসানের প্রাথমিক হিসাব পাওয়া গেছে।
এ ছাড়া লোহাগাড়ায় ১ হাজার ৬২০টি পুকুরে প্রায় ৮ কোটি ৪৮ লাখ টাকা, কর্ণফুলীতে ৫৫৭টি পুকুরে ৬ কোটি ৮ লাখ টাকা, চন্দনাইশে ৩৮৩টি পুকুরে ৫ কোটি ৯৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা, বোয়ালখালীতে ৭৫৬টি পুকুরে ৪ কোটি ৫১ লাখ ৩৫ হাজার টাকা এবং পটিয়ায় ১ হাজার ৪৩৫টি পুকুরে ৩ কোটি ৬৮ লাখ ৪৫ হাজার টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
এদিকে ফটিকছড়িতে ৫৩৩টি পুকুরে ২ কোটি ৭০ লাখ টাকা, হাটহাজারীতে ১৭০টি পুকুরে ১ কোটি ৯৮ লাখ ২৭ হাজার টাকা, আনোয়ারায় ১ হাজার ১০০টি পুকুর ও ১০টি চিংড়ি ঘেরে ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা, সন্দ্বীপে ৪১২টি পুকুরে ১ কোটি ২৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা, মিরসরাইয়ে ৯৭টি পুকুরে ৯৮ লাখ টাকা, রাঙ্গুনিয়ায় ২৭০টি পুকুরে ৯৮ লাখ ৭ হাজার টাকা, রাউজানে ৯০টি পুকুরে ৯৩ লাখ টাকা এবং সীতাকুণ্ডে ১০টি পুকুরে ১৫ লাখ ১৪ হাজার টাকার ক্ষতির তথ্য পাওয়া গেছে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সালমা বেগম দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, 'এবারের দুর্যোগে চট্টগ্রামের মৎস্য খাত ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। দক্ষিণ চট্টগ্রামের উপজেলাগুলোতে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা সবচেয়ে বেশি। অনেক এলাকায় এখনও পানি পুরোপুরি না নামায় ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যায়নি। ফলে চূড়ান্ত হিসাবে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।'
তলিয়ে গেছে ফসলি জমি ও বীজতলা
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে চট্টগ্রাম জেলায় ৩০ হাজার ২২ দশমিক ৫ হেক্টর জমিতে আউশ ধানের আবাদ হয়েছিল। এর মধ্যে ৯ হাজার ৪৩ দশমিক ৫ হেক্টর জমি অতিবৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া ২ হাজার ৭২১ দশমিক ৬৭ হেক্টর আমন বীজতলার মধ্যে ৯৬০ দশমিক ৬৬ হেক্টর এবং ১৭ হাজার ৮২৮ দশমিক ৬৫ হেক্টর গ্রীষ্মকালীন সবজির মধ্যে ৫ হাজার ৯০৭ হেক্টর জমি ক্ষতির মুখে পড়েছে। সব মিলিয়ে আউশ, আমন বীজতলা ও গ্রীষ্মকালীন সবজির মোট ১৫ হাজার ৯১১ দশমিক ১৬ হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
উপজেলাভিত্তিক হিসাবে আউশ ধান, আমন বীজতলা এবং সবজি মিলিয়ে বাঁশখালী উপজেলায় ফসলের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। এখানে মোট ৩ হাজার ৬০৫ হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
অন্যান্য উপজেলার মধ্যে চন্দনাইশ উপজেলায় মোট ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ২ হাজার ৯৭৩ হেক্টর, ফটিকছড়ি উপজেলায় ১ হাজার ৮৪৪ হেক্টর, সাতকানিয়ায় ১ হাজার ৭৪১ হেক্টর, সন্দ্বীপে ১ হাজার ৬৫০ হেক্টর, সীতাকুণ্ড উপজেলায় ৭১১ হেক্টর, পটিয়ায় ৫১২ হেক্টর, লোহাগাড়ায় ৫১০ হেক্টর, আনোয়ারায় ৫০৪ হেক্টর, মিরসরাইয়ে ৪৮৮ হেক্টর, রাউজানে ৩৫০ হেক্টর, রাঙ্গুনিয়ায় ৩৪০ হেক্টর, কর্ণফুলীতে ২৫১ হেক্টর, বোয়ালখালীতে ১৭৩ দশমিক ৫ হেক্টর এবং হাটহাজারী উপজেলায় ১৪০ হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম মহানগরের পাঁচলাইশ এলাকায় ৮০ হেক্টর জমি, পতেঙ্গা এলাকায় ৩২ দশমিক ৬৬ হেক্টর এবং ডবলমুরিং এলাকায় ৬ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম অঞ্চলের উপপরিচালক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ টিবিএসকে বলেন, 'অতিবৃষ্টিতে ফসলের ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সংগ্রহের কাজ এখনো চলমান। অনেক এলাকায় এখনও জলাবদ্ধতা ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে বর্তমানে যে হিসাব প্রকাশ করা হয়েছে, তা প্রাথমিক। সব তথ্য সংগ্রহ শেষে ক্ষয়ক্ষতির একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হবে।'
প্রাথমিক এই হিসাবই ইঙ্গিত দিচ্ছে, চলমান বন্যা চট্টগ্রামের কৃষি ও মৎস্য খাতে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ধাক্কা দিয়েছে। কৃষকের ফসল এবং মাছচাষিদের উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় গ্রামীণ অর্থনীতির ওপরও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
