ভবন প্রায় প্রস্তুত, যন্ত্রপাতি নেই: ২০২৮ সাল পর্যন্ত পিছিয়েছে ক্যানসার-হৃদরোগের বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রকল্প
চিকিৎসাসেবা বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্যে দেশের আট বিভাগীয় শহরে বিশেষায়িত ক্যানসার, কিডনি ও কার্ডিয়াক হাসপাতাল স্থাপনের জন্য নেওয়া ৩ হাজার ৪৩৩ কোটি টাকার প্রকল্প আরও দুই বছর পিছিয়েছে। ভবনের নির্মাণকাজ এখনও শেষ না হওয়ায় এবং চিকিৎসাসামগ্রী কেনার প্রক্রিয়া শুরু করতে না পারায় কর্তৃপক্ষ প্রকল্পের মেয়াদ দ্বিতীয় দফায় বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত করেছে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদন, চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি হয়েছে ৮১.৪৩ শতাংশ। তবে আর্থিক অগ্রগতি মাত্র ৩০.৮১ শতাংশ।
২০১৯ সালে প্রথমে ২ হাজার ৩৮৮.৩৯ কোটি টাকা ব্যয়ে অনুমোদিত প্রকল্পটির ব্যয় পরে বাড়িয়ে ৩ হাজার ৪৩৩ কোটি টাকা করা হয়। এখন পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ৫৭.৯০ কোটি টাকা।
আটটি হাসপাতালের মধ্যে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নির্মাণ অগ্রগতি সর্বোচ্চ ৯৭ শতাংশ। অন্যদিকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অগ্রগতি সবচেয়ে কম, ৫৩ শতাংশ।
প্রকল্পটি প্রথমে ২০২২ সালের জুনের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল। এরপর চার বছর সময় বাড়িয়ে এর মেয়াদ ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়। এখন তা আরও দুই বছর বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে।
এখনো শুরু হয়নি যন্ত্রপাতি কেনা
আইএমইডি বলছে, প্রকল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ—চিকিৎসা যন্ত্রপাতি, আসবাবপত্র, কম্পিউটার ও যানবাহন ক্রয়ের কাজ এখনো শুরু হয়নি।
চিকিৎসা সরঞ্জাম আমদানিতে বিলম্ব হলে প্রকল্প শেষ হওয়ার পরও হাসপাতালগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা কঠিন হতে পারে বলে প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে।
সরেজমিন পরিদর্শনে আইএমইডি পরিদর্শকরা নির্মাণের সামগ্রিক মান সন্তোষজনক পেলেও কিছু ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের সুযোগ দেখেছে।
প্রতিবেদনে ব্যয়বহুল গ্রানাইট পাথর, অলংকারধর্মী ফলস ওয়াল ও বাইরের দেয়ালে ফলস ব্রিক টাইলস ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। পাশাপাশি নির্মাণসামগ্রীর মান, কিউরিং, গ্রেডেশন ও বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) অনুসরণে কিছু কারিগরি দুর্বলতার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
আইএমইডি চিকিৎসা সরঞ্জামের তালিকা ও ব্যয়ের প্রাক্কলন চূড়ান্ত করে অগ্রিম কেনাকাটার মাধ্যমে দরপত্র প্রক্রিয়া শুরু করার সুপারিশ করেছে। এতে সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) অনুমোদিত হওয়ার পরপরই কার্যাদেশ দেওয়া সম্ভব হবে।
আইএমইডির প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুধু বৈশ্বিক পরিস্থিতি নয়, প্রকল্প বাস্তবায়নে অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতাও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গণপূর্ত অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি, বারবার প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তন, সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব, নকশাগত জটিলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে মূলত কাজ পিছিয়েছে
আইএমইডি বলেছে, হাসপাতালগুলো চালু হলে বিভাগীয় পর্যায়ে ক্যানসার, কিডনি ও হৃদরোগের উন্নত চিকিৎসাসেবা সহজলভ্য হবে। এতে ঢাকার হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ কমবে, বিদেশে চিকিৎসার প্রবণতা ও বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয় হ্রাস পাবে।
এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বছরে ৩ লাখ ৩৬ হাজার রোগীকে ডায়ালাইসিস সেবা দেওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিভাগীয় শহরেই এ সেবা নিতে পারবে রোগীরা, সবাইকে ঢাকায় আসতে হবে না।
জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক মোস্তফা আজিজ সুমন টিবিএসকে বলেন, এখন দেশের ক্যানসার রোগীদের একটি বড় অংশের চাপ সামলাতে হয় ক্যানসার ইনস্টিটিউটকে।
তিনি বলেন, 'বেড সংকট, যন্ত্রপাতির সংকটের কারণে রোগীদের চিকিৎসা পেতে দেরি হয়। আট বিভাগে হাসপাতালগুলোর নির্মাণ দ্রুত শেষ করে প্রয়োজনীয় জনবল ও আধুনিক যন্ত্রপাতিসহ চালু করা গেলে রাজধানীর ক্যানসার হাসপাতালের ওপর রোগীর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।
'পাশাপাশি রোগীরা বিভাগীয় শহরে চিকিৎসা নিতে পারলে তাদের ভোগান্তি ও খরচও কমে যাবে।'
এসব সুফল পেতে হাসপাতাল চালুর আগেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য জনবলের পদ সৃষ্টি, সাংগঠনিক কাঠামো অনুমোদন, চিকিৎসা যন্ত্রপাতি ক্রয় ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদারের সুপারিশ করেছে আইএমইডি।
