শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত ধ্বংসে পূর্ববর্তী সরকারকে দায়ী করলেন প্রধানমন্ত্রী
ফ্যাসিবাদী ও স্বৈরাচারী সরকার একটি বিশেষ দেশ ও স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীকে সুবিধা দিতে দেশের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করেছে বলে অভিযোগ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
তিনি বলেছেন, সেই অবস্থা থেকে বেরিয়ে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে আগামী পাঁচ বছরে পর্যায়ক্রমে উভয় খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার।
বুধবার (১৫ জুলাই) জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশন এবং বর্তমান সরকারের প্রথম বাজেট অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত পুনর্গঠনের পরিকল্পনা
প্রধানমন্ত্রী বলেন, কোনো জাতিকে ধ্বংস করতে হলে তার শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস করাই যথেষ্ট। পূর্ববর্তী সরকার অন্যের স্বার্থ রক্ষায় সেই নীতিই অনুসরণ করেছে।
শিক্ষাব্যবস্থা পুনর্গঠনের বিষয়ে তিনি বলেন, বিতর্কিত সিলেবাস ধীরে ধীরে বাদ দিয়ে আধুনিক, মানবিক ও যুগোপযোগী শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। পাশাপাশি শিক্ষকদের মানসম্মত প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষা উপকরণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ লক্ষ্যেই চলতি বাজেটে শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ রাখা হয়েছে এবং আগামী পাঁচ বছরে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য খাত প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পূর্ববর্তী সরকার দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থাকে অকার্যকর করে একটি বিশেষ দেশের চিকিৎসা বাণিজ্যের সুবিধা নিশ্চিত করেছিল। প্রধানমন্ত্রীর ভাষায়, চিকিৎসা ব্যবস্থা '১০১ শতাংশ অসুস্থ' অবস্থায় রয়েছে। এ অবস্থার পরিবর্তনে আগামী ৫ বছরে স্বাস্থ্য খাতেও জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি জানান, রোগ প্রতিরোধভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা জোরদার করতে সারা দেশে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে। এছাড়া আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে ৫টি বিভাগে ২০০ শয্যাবিশিষ্ট ৫টি আধুনিক শিশু হাসপাতাল চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
ইউনিভার্সাল কার্ডে সব সামাজিক সুবিধা
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি আরও কার্যকর করতে 'ইউনিভার্সাল কার্ড' চালুর ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্পোর্টস কার্ড, প্রবাসী কার্ড, ইমাম-মুয়াজ্জিন ও অন্যান্য ধর্মীয় গুরুদের জন্য চালু বিশেষ কার্ডসহ সব সরকারি সুবিধা একক পরিচয়পত্রের আওতায় আনা হবে।
তিনি বলেন, এসব সুবিধা জনগণের প্রতি রাষ্ট্রের দয়া নয়, বরং রাষ্ট্রের দায়িত্ব। ভবিষ্যতে নাগরিকরা একটি কার্ডের মাধ্যমেই সব ধরনের সরকারি সেবা ও সুবিধা পাবেন।
প্রধানমন্ত্রী আরও জানান, নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সরকার গঠনের পর প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকেই ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত বকেয়া কৃষি ঋণ সুদসহ মওকুফের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর আওতায় প্রায় ১৩ লাখ প্রান্তিক কৃষক ইতোমধ্যে উপকৃত হয়েছেন।
উগ্রবাদ দমন ও আইনশৃঙ্খলা
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার কোনো ধরনের উগ্রবাদ বা চরমপন্থাকে প্রশ্রয় দেবে না। এ বিষয়ে বিরোধী দলের সহযোগিতাও কামনা করেন তিনি।
দুর্নীতি দমন ও অর্থনৈতিক লক্ষ্য
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তুলতে কাজ করছে। পূর্ববর্তী সরকারের সময়ে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার দেশ থেকে পাচার হয়েছে, যা দেশের অবকাঠামো ও অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
তিনি বলেন, ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি, ব্লু ইকোনমি, ইকোট্যুরিজমসহ বিভিন্ন খাতে পর্যায়ক্রমে ৯ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে ভাষা ও দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ এবং আধুনিক ক্যারিয়ার সেন্টার স্থাপনের কাজও এগিয়ে চলছে।
জলবায়ু ও সবুজ কর্মসংস্থান
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছের চারা রোপণের ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, প্রতি বছর গড়ে ৫ কোটি করে চারা রোপণ করা হবে। এ কর্মসূচির আওতায় ১০ হাজার নতুন নার্সারি উদ্যোক্তা তৈরি করা হবে, যার মাধ্যমে প্রায় আড়াই লাখ তরুণ-তরুণীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
তিনি জানান, বুধবার প্রায় ২ লাখ গাছের চারা রোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন করা হয়েছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও অবকাঠামো
প্রধানমন্ত্রী অভিযোগ করেন, পূর্ববর্তী সরকারের সময়ে কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের মাধ্যমে ব্যাপক দুর্নীতি হয়েছে। তার দাবি, শুধু বিদ্যুৎ খাত থেকেই অন্তত ৩ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে এবং ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবে ১ লাখ ৩০ হাজার কোটির বেশি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশে ৩০ দিনেরও কম জ্বালানি তেলের মজুদ ছিল। গত তিন মাসে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সেই মজুদ ৪৫ দিনের বেশি করা হয়েছে এবং তা ৯০ দিনে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সিলেটসহ বিভিন্ন অঞ্চলের সড়ক অবকাঠামোর দুরবস্থার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণের দুর্ভোগ কমাতে সরকার সড়ক ও মহাসড়ক উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়েছে।
জুলাই সনদ ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের অঙ্গীকার
প্রধানমন্ত্রী জানান, জুলাই সনদের প্রতিটি অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও পেশাদার করা এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা জোরদারে ১০ হাজার নতুন পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগসহ বিভিন্ন সিদ্ধান্ত পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণের মতামতের ভিত্তিতে প্রণীত ৩১ দফা এখন দেশের মানুষের মুক্তির সনদে পরিণত হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের স্বাক্ষরে গৃহীত 'জুলাই সনদ'-এর প্রতিটি দফা বাস্তবায়নে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
তিনি বলেন, সংসদের সব সদস্য এবং দেশের জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বৈষম্যহীন, উগ্রবাদমুক্ত, দুর্নীতিমুক্ত ও প্রকৃত গণতান্ত্রিক কল্যাণরাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে প্রতিষ্ঠা করা হবে।
