সরকারি তহবিল থেকে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের চিকিৎসা ব্যয় নিয়ে বিতর্ক
অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ১৮ মাসের শাসনামলে বেশ কয়েকজন উপদেষ্টার রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে নেওয়া চিকিৎসা ব্যয় নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
সাবেক ধর্ম উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হোসেন নিজের চিকিৎসার জন্য সরকার থেকে ৮১.৯১ লাখ টাকা নিয়েছেন। একই সময়ে সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ তার স্ত্রীর চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে সরকারি কোষাগার থেকে ৭৯.৩৮ লাখ টাকা পেয়েছেন।
বর্তমান বিধি অনুযায়ী, মন্ত্রী ও তাদের স্বামী বা স্ত্রী সরকারি খরচে চিকিৎসা সুবিধা পাওয়ার অধিকারী। তবে উপদেষ্টাদের তুলনামূলক ১৮ মাসের দায়িত্বকালেই চিকিৎসা বাবদ এত বিপুল পরিমাণ অর্থ নেওয়া নৈতিকভাবে যৌক্তিক ছিল কি না, তা নিয়ে কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন।
স্ত্রীর চিকিৎসা ব্যয়ের পক্ষে সালেহউদ্দিনের ব্যাখ্যা
ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের স্ত্রী পারভীন আহমেদ তিনি দায়িত্ব গ্রহণের আগেই ক্যান্সারে আক্রান্ত ছিলেন। পরে তিনি অর্থ উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তার স্ত্রী সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা নেন।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে সালেহউদ্দিন বলেন, তার স্ত্রীর অসুস্থতার শেষ এক বছরে শারীরিক অবস্থার উল্লেখযোগ্য অবনতি হয়েছিল।
তিনি বলেন, 'আমি নিজের খরচে এর আগে স্ত্রীকে চিকিৎসার জন্য জাপান নিয়ে গিয়েছিলাম। সরকারি সুবিধায় সিঙ্গাপুরে চিকিৎসার সময় আমি নিজে তিন-চারবার সেখানে গিয়েছি এবং নিজের বিমানভাড়া ও হোটেল খরচ নিজেই বহন করেছি। সেসব খরচও যদি আমি দাবি করতাম, তাহলে মোট ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ হতো।'
তিনি আরও বলেন, 'আমি সব সময় সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছি। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অধীনে প্রচলিত একটি আইনের আওতায় এই সুবিধা দেওয়া হয়। এটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে চালু করা হয়নি। সবকিছু নিয়ম অনুযায়ী হয়েছে। তাহলে এখানে নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে কেন?"
গত বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রকাশিত সম্পদ বিবরণী অনুযায়ী, ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের সম্পদের পরিমাণ ছিল ৭.১৬ কোটি টাকা। তার স্ত্রী পারভীন আহমেদের সম্পদের পরিমাণ ছিল ৫.৩৮ কোটি টাকা এবং দায় ছিল ৩.১২ কোটি টাকা।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পরামর্শ নেওয়ার কথা জানালেন খালিদ
গণসমালোচনার পররোববার (২৮ জুন) ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে বিষয়টি নিয়ে বক্তব্য দেন আ ফ ম খালিদ হোসেন।
তিনি বলেন, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের একটি মেডিকেল বোর্ড সিদ্ধান্ত দেয় যে তার 'ক্যাথেটার অ্যাবলেশন' নামে একটি জটিল অস্ত্রোপচার প্রয়োজন। কিন্তু প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতি না থাকায় বাংলাদেশে সেটি করা সম্ভব ছিল না।
খালিদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা তাকে আবুধাবিতে অবস্থিত একটি মার্কিন হাসপাতাল অথবা থাইল্যান্ডের বামরুনগ্রাদ ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দেন।
তিনি বলেন, প্রথমে ব্যাংককের ওই হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য প্রায় ১৭ লাখ টাকা ব্যয় করেন। পরে চলতি বছরের জানুয়ারিতে একই হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের জন্য ৬৫ লাখ টাকা ব্যয় হয়, যা সরকার পরিশোধ করে।
খালিদ আরও বলেন, চিকিৎসার মূল বিল আরও বেশি ছিল। তবে থাইল্যান্ডে বাংলাদেশ দূতাবাসের অনুরোধে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ছাড় দেওয়ায় বিলের পরিমাণ কমে যায়।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রকাশিত সম্পদ বিবরণী অনুযায়ী, আফম খালিদ হোসেনের সম্পদের পরিমাণ ছিল প্রায় ১.১৪ কোটি টাকা। তার স্ত্রীর সম্পদের পরিমাণ ছিল ১৪.১১ লাখ টাকা।
অন্য উপদেষ্টাদের চিকিৎসা ব্যয়
অন্য সাবেক উপদেষ্টাদের মধ্যে সাবেক বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান চিকিৎসা ব্যয় বাবদ ৫.৩৯ লাখ টাকা নিয়েছেন।
সাবেক ভূমি উপদেষ্টা হাসান আরিফ নিয়েছেন ২.৬৭ লাখ টাকা, সাবেক শিক্ষা উপদেষ্টা ড. এম আমিনুল ইসলাম নিয়েছেন ২.৩৫ লাখ টাকা এবং সাবেক খাদ্য উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার নিয়েছেন ১.৭০ লাখ টাকা।
এছাড়া সাবেক পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ চিকিৎসা ব্যয় বাবদ ৬৭ হাজার টাকা, সাবেক শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান ৩১ হাজার টাকা, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ড. আনিসুজ্জামান ২১ হাজার টাকা এবং প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদার উপদেষ্টা শেখ মইনউদ্দিন ৪ হাজার টাকা নিয়েছেন।
