লক্ষ্মীপুরে এক বাসায় ৪ খুন, পরিবারে একমাত্র বেঁচে রইল সিফাত
জুনায়েদ ইসলাম সিফাত একাদশ শ্রেণিতে পড়ার পাশাপাশি পরিবারের ভরণপোষণের জন্য একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। পৃথিবীতে নির্মমতার শিকার মানুষের সারিতে নাম উঠেছে এ তরুণের। ১৮ বছর বয়সি সিফাত এখন চোখে-মুখে অন্ধকার দেখছেন। ১২ বছর বয়সে বাবাকে হারিয়ে মা আর তিন বোনের আদর-স্নেহে বেড়ে উঠছিলেন। এখন পরিবারে একমাত্র বেঁচে আছেন সিফাত।
বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) সকালে এক অজানা নির্মমতার শিকার হয়ে সিফাতের মা এবং তিন বোন খুন হন। তারা পরিবার নিয়ে লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলা শহরের ব্যস্ততম দেনায়েতপুর এলাকার ডাকাতিয়া নদীর তীরে একটি ভবনে বাসা ভাড়ায় থাকতেন। তবে স্থায়ী নিবাস ছিল কুমিল্লা জেলার হোমনা উপজেলার লটিয়া গ্রামে।
সেদিন দুপুরে পুলিশ তাদের ভাড়া বাসা থেকে তিনজনের লাশ উদ্ধার করে। গুরুতর আহত এক বোন ইকরাকে চিকিৎসার জন্য ঢাকা নেয়ার পথে তারও মৃত্যু হয়।
ঘটনার পরপরই স্থানীয় এলাকাবাসী টের পেয়ে সিফাতদের বাসা ঘেরাও করে ঘাতক অন্তর মজুমদারকে (২৮) আটক করে। পরে গণপিটুনিতে ঘাতকের মৃত্যু হয়। অন্তর মজুমদার নোয়াখালী জেলার সুবর্ণচর উপজেলার স্থায়ী বাসিন্দা। সে ফেরি করে রায়পুর শহরে ফল বিক্রি করত। তবে শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত অন্তর মজুমদারের লাশ গ্রহণ করতে কেউ আসেনি।
আজ (২৬ জুন) দুপুরে লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে সিফাতের চাচা মো. জামাল উদ্দিনের নিকট ৪টি মৃতদেহ হস্তান্তর করেন চিকিৎসকরা। এলাকাবাসীর উদ্যোগে রায়পুর পৌরসভা শহরে প্রথম জানাজা শেষে লাশ কুমিল্লায় নেয়া হবে বলে জানিয়েছেন জামাল।
সিফাতের চাচা জামাল উদ্দিন জানান, তারা চার ভাই। পরিবারের অনটনের কারণে প্রায় ২০ বছর আগে তার ভাই কামাল উদ্দিন কুমিল্লার হোমনা ছেড়ে পরিবার নিয়ে লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে এসে বসবাস শুরু করেন। সে ক্রোকারিজ মালামাল বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করত। তবে ২০১৯ সালে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান ভাই কামাল। কিন্তু এর পরেও ভাইয়ের পরিবারের সাথে তাদের সুসম্পর্ক রয়েছে।
সিফাত জানায়, প্রতিদিনের মতো সকাল সাতটায় ঘুম থেকে ওঠে সে। ঘুম থেকে ওঠার পর সে তার কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে চলে যায়। বেলা ১১টার দিকে এক প্রতিবেশীর ফোন পেয়ে সে বাসায় এসে রান্নাঘরে মায়ের রক্তাক্ত মৃতদেহ দেখে। এবং ঘরের অন্যান্য জায়গায় বোনদের রক্তাক্ত দেহ পড়ে থাকতে দেখে। এমন দৃশ্য দেখে সে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে বলে জানায় সিফাত।
স্থানীয় বাসিন্দা মুরাদ বলেন, ২০১৯ সালে বৃষ্টিভেজা একদিন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান সিফাতের বাবা কামাল হোসেন। হাঁড়ি-পাতিল ও সিলভার সামগ্রী ফেরি করে চলত তাদের সংসার। বাবার মৃত্যুর পর পরিবারটি যেন দিশেহারা হয়ে পড়েছিল। কিন্তু ভেঙে পড়েননি মা শাহিনুর বেগম। সীমাহীন কষ্ট আর অভাবের মধ্যেও তিনি তিন মেয়ে ও একমাত্র ছেলেকে মানুষ করার স্বপ্ন আঁকড়ে ধরে লড়াই চালিয়ে গেছেন।
বাবাহীন মেধাবী তিন মেয়ে ও ছেলে সিফাত সবাই কলেজ ও স্কুল পর্যায়ে পড়াশোনার পাশাপাশি সংসারের কাজে মাকে সাহায্য করত। বড় মেয়ে সায়মা আক্তার ঢাকার আদমজী কলেজ থেকে একাদশ পাস করে মেডিকেল ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিয়েছিল। মেজো মেয়ে ইকরা আক্তার লক্ষ্মীপুর সরকারি কলেজে একাদশ শ্রেণিতে অধ্যয়নরত, ছোট মেয়ে শিফা আক্তার রায়পুর শহরের একটি বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে এবং ছেলে সিফাত রায়পুর সরকারি কলেজে একাদশ শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে।
নিজে কষ্ট করেও সন্তানদের পড়াশোনা বন্ধ হতে দেননি মা শাহিনুর বেগম। বড় তিন সন্তানও ছোটখাটো কাজ করে মায়ের পাশে দাঁড়িয়েছিল। অনেক প্রতিকূলতার মাঝেও পরিবারটি বিশ্বাস করত, একদিন হয়তো তাদের জীবন বদলাবে। কিন্তু সেই স্বপ্ন নির্মমভাবে থেমে যায় বৃহস্পতিবার সকালে।
রায়পুর সরকারি ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থী সিফাত এখন একেবারেই একা। একান্ত আপনজন বলতে পৃথিবীতে তার আর কেউ নেই।
সিফাতের বন্ধু রনি বলেন, 'ওদের পরিবারটা ছিল খুবই সংগ্রামী। সবাই লেখাপড়ায় ভালো ছিল। বাবা মারা যাওয়ার পরও তারা হাল ছাড়েনি। সিফাত কাজ করত, পড়াশোনাও চালিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু একদিনেই সব শেষ হয়ে গেল।'
রায়পুর বাজার বণিক সমিতির সভাপতি সাইফুল ইসলাম মুরাদ জানান, প্রায় সাত-আট মাস আগে সিফাত তার প্রতিষ্ঠানে মাসিক আট হাজার টাকা বেতনে চাকরি নেয়। পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়েও সে লেখাপড়া চালিয়ে যাচ্ছিল। সমাজের মানুষের সহযোগিতায় তাদের সংসার কোনোভাবে এগিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু এমন মর্মান্তিক ঘটনা কেউ কল্পনাও করেনি।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শাহিনুর বেগম কয়েক বছর ধরে সন্তানদের নিয়ে রায়পুরের দেনায়েতপুর এলাকায় ডাকাতিয়া নদীর পাড়ে একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করছিলেন। ২০১৯ সালে স্বামীর মৃত্যুর পর চার সন্তানকে নিয়েই তার জীবনসংগ্রাম চলছিল।
ঘটনার পর লক্ষ্মীপুর জেলা পুলিশ সুপার মো. আবু তারেক ঘটনাস্থল ও হাসপাতাল পরিদর্শন করেন। তিনি জানান, অভিযুক্ত অন্তর মজুমদার প্রায় দেড় বছর আগে একই বাসায় ভাড়াটে ছিলেন এবং সাত-আট মাস আগে বাসা ছেড়ে চলে যান। পূর্ব পরিচয়ের সূত্র ধরেই তিনি ওই সকালে বাসায় প্রবেশ করেন বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
ঘটনার পর প্রথম প্রত্যক্ষদর্শী প্রতিবেশী নারী আফরোজা আক্তার রানী বলেন, আমির হোসেন মাস্টারের ৫ তলা ভবনের নিচতলার একটি ইউনিটে বাসা ভাড়া থাকত ভুক্তভোগী শাহিনুর বেগম ও তার পরিবার। ভবনের মালিক এলাকায় বসবাস করতেন না। সে সুবাদে ভবনের অন্যান্য ইউনিটের ভাড়া শাহিনুর বেগমের নিকট রেখে যেত ভাড়াটিয়ারা। পরে মালিক এসে শাহিনুর বেগম থেকে ভাড়া বুঝে নিতেন। একই ভবনের একটি ইউনিটে ঘাতক অন্তর মজুমদার প্রায় দেড় বছর যাবত ভাড়া থাকত। গত সাত-আট মাস আগে সে এখান থেকে অন্যত্র চলে যায়। স্থানীয়রা ধারণা করছেন, শাহিনুর বেগমের নিকট টাকা-পয়সা ও অলঙ্কার আছে এটা ভেবেই ডাকাতি বা অন্য কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে অন্তর মজুমদার এ ঘরে প্রবেশ করে।
রানী আরও জানান, অন্তরকে বাসায় দেখে সন্দেহ প্রকাশ করি। অন্তর নিজেকে পানির পাইপ মেরামত করতে এসেছে বলে জানালেও তিনি বিষয়টি বিশ্বাস করেননি। তিনি দ্রুত কলাপসিবল গেট আটকে স্থানীয়দের খবর দেন।
পুলিশ কর্মকর্তাদের মতে, প্রতিবেশী রানীর এই তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ না থাকলে হয়তো ঘটনার প্রকৃত চিত্র উদ্ঘাটন আরও কঠিন হয়ে যেত। কিন্তু ঘটনার পরপরই উত্তেজিত জনতা গণপিটুনি দিয়ে ঘাতককে মেরে ফেলায় এখন হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
এদিকে কী কারণে এমন ঘটনা ঘটেছে তা পুলিশের পক্ষ থেকে এখনো নিশ্চিত করে কিছু জানানো হয়নি। লক্ষ্মীপুর জেলা পুলিশ সুপার মো. আবু তারেক বলেছেন, আমরা সবাই সত্য উদ্ঘাটনে কাজ করছি।
শুক্রবার দুপুরে লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. অরূপ পাল বলেন, নিহত ৪ নারীর ময়নাতদন্ত শেষ হয়েছে। প্রত্যেকের মাথায় ও শরীরে ধারাল অস্ত্রের আঘাত রয়েছে। তাদের মধ্যে কেউ ধর্ষণের শিকার হয়েছিল কি না তা রাসায়নিক পরীক্ষার প্রতিবেদন আসার পর জানা যাবে।
