চট্টগ্রামে সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ, ‘হানি ট্র্যাপে’ ফেলে বাবাকে হত্যা করে দুই ছেলে: পিবিআই
চট্টগ্রামে সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের জেরে এক বৃদ্ধ বাবাকে 'হানি ট্র্যাপে' ফেলে তারই দুই ছেলে অপহরণ ও হত্যা করে বলে জানিয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
সোমবার (১৫ জুন) এক সংবাদ সম্মেলনে পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রোর পুলিশ সুপার এস এম রফিকুল ইসলাম বলেন, চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার চাম্বল এলাকার বাসিন্দা ও পেশায় বাবুর্চি মুজিবুর রহমানকে হত্যার ঘটনাটি ছিল পূর্বপরিকল্পিত। তার বিশ্বাস অর্জনের জন্য এক নারীকে ব্যবহার করা হয়।
পিবিআই জানায়, মুজিবুর রহমান তিনবার বিয়ে করেছিলেন। প্রথম স্ত্রীর ঘরে তার দুই ছেলে এবং দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্ত্রীর ঘরে একটি করে মেয়ে রয়েছে।
তদন্তে জানা যায়, জীবনের শেষ সময়ে মুজিবুর রহমান দুই মেয়ের সঙ্গে বসবাস করতেন এবং তাদের আর্থিক সহায়তার জন্য নিজের কিছু সম্পত্তি বিক্রি করেছিলেন। বিষয়টি প্রথম স্ত্রীর ঘরের দুই ছেলে বেলাল হোসেন ও আবদুল জলিলের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি করে। একপর্যায়ে তারা বাবাকে হত্যার পরিকল্পনা করে।
পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বেলাল তার পরিচিত এক নারীকে মুজিবুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। ওই নারী নিয়মিত ফোনে তার সঙ্গে কথা বলতে থাকেন এবং ধীরে ধীরে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। একপর্যায়ে তিনি মুজিবুর রহমানকে আবার বিয়ের ব্যবস্থা করে দেওয়ার আশ্বাস দেন।
পুলিশ সুপার রফিকুল ইসলাম বলেন, '২০২৪ সালের ৭ জুন মুজিবুর রহমান ওই নারীর বাসায় যান। এটি ছিল পূর্বপরিকল্পিত একটি ফাঁদ।'
তিনি বলেন, 'আপ্যায়নের সময় তাকে দেওয়া কোমল পানীয় বা শরবতের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে দেওয়া হয়। ওষুধের প্রভাবে তিনি শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়লে বেলাল ও তার বড় ভাই আবদুল জলিল সেখানে উপস্থিত হন।'
তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানান, এরপর দুই ভাই মুজিবুর রহমানকে অসুস্থ রোগী পরিচয়ে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে সিআরবি এলাকায় নিয়ে যান। সেখান থেকে তাকে একটি ভাড়া করা মাইক্রোবাসে তোলা হয়। পরে হত্যার জন্য নির্জন স্থান খুঁজতে তারা শহরের বিভিন্ন এলাকায় ঘোরাফেরা করেন।একপর্যায়ে তারা হালিশহরের আউটার লিংক রোড এলাকায় পৌঁছান।
এক পিবিআই কর্মকর্তা বলেন, 'সন্ধ্যার দিকে মাইক্রোবাসের ভেতরে বেলাল ও জলিল একটি তোয়ালে মুজিবুর রহমানের গলায় পেঁচিয়ে দুই দিক থেকে টান দেন। এতে তার মৃত্যু হয়।'
হত্যার পর তারা মরদেহ সড়কের পাশের ঝোপে ফেলে রেখে পালিয়ে যান। ঘটনার পর মুজিবুর রহমান নিখোঁজ হওয়ায় তার মেয়ে কোতোয়ালি থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। পরে বেলালের শ্বশুরবাড়ি থেকে মুজিবুর রহমানের মোবাইল ফোন উদ্ধার হলে মামলার তদন্তে নতুন মোড় আসে।
পুলিশ জানায়, মামলা হওয়ার পর বেলাল আত্মগোপনে চলে যান এবং দীর্ঘ সময় কক্সবাজার এলাকায় অবস্থান করেন। সম্প্রতি নিজ এলাকায় ফিরে এলে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
জিজ্ঞাসাবাদে বেলাল ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দেন এবং হত্যাকাণ্ডের স্থান শনাক্ত করেন বলে দাবি পিবিআইয়ের। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আবদুল জলিলকেও গ্রেপ্তার করা হয়।
তদন্তে আরও জানা যায়, কথিত হত্যাকাণ্ডের দুই দিন পর একই হালিশহর এলাকা থেকে একটি অজ্ঞাতনামা মরদেহ উদ্ধার করেছিল পুলিশ।
পুলিশের ভাষ্য, মরদেহটির গলায় পাওয়া তোয়ালে এবং পরনের পোশাকের বর্ণনা অভিযুক্তদের দেওয়া তথ্যের সঙ্গে মিলে গেছে।
তদন্তকারীদের ধারণা, ওই মরদেহটি মুজিবুর রহমানের। পরিচয় নিশ্চিত করতে ডিএনএ পরীক্ষা করা হবে।
পিবিআই জানিয়েছে, পারিবারিক সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের জেরেই হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হয়েছে। এ ঘটনায় বেলাল আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছেন।
