চট্টগ্রামে ৩ দিনে ২০০-৫০০ মিলিমিটার বৃষ্টির পূর্বাভাস, মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি
চট্টগ্রামসহ দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের পাঁচ জেলায় আগামী তিন দিনে ২০০ থেকে ৫০০ মিলিমিটার পর্যন্ত ভারী বৃষ্টির আশঙ্কা করা হচ্ছে। এতে পাহাড় ধস ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি আরও বেড়ে যাওয়ায় সরকার ও মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলো তাদের প্রস্তুতি জোরদার করেছে। গত পাঁচ দিনে এই পাঁচ জেলায় পৃথক পাহাড় ধসের ঘটনায় অন্তত ৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে।
রিজিওনাল ইন্টিগ্রেটেড মাল্টি-হ্যাজার্ড আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম এবং বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের যৌথ বিশেষ বুলেটিনে জানানো হয়েছে, বঙ্গোপসাগরে সক্রিয় মৌসুমি বায়ু এবং ভারতের উত্তর-পশ্চিম মধ্যপ্রদেশ ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় সুস্পষ্ট লঘুচাপের প্রভাবে ১০ থেকে ১২ জুলাই পর্যন্ত চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে ভারী থেকে অতিভারী বর্ষণ হতে পারে।
বুলেটিনে পাঁচটি জেলাকেই পাহাড় ধসের জন্য 'উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ' অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গত ৯ জুলাই সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে সর্বোচ্চ ২২৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এছাড়া টেকনাফে ১৬৯, রাঙামাটিতে ১০৬ এবং কক্সবাজারে ৮৯ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে।
পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাস কর্মকর্তা ইসমাইল হোসেন দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে জানান, ১০ জুলাই সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ১১৮.৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। ১২ জুলাই পর্যন্ত ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। ১৩ জুলাই থেকে বৃষ্টির তীব্রতা কমার সম্ভাবনা রয়েছে।
এদিকে, বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু জানান, চট্টগ্রাম বিভাগের পাঁচ জেলায় ভারী বৃষ্টি ও পাহাড় ধসে এ পর্যন্ত ৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে। কার্যপ্রণালি বিধির ৩০০ বিধিতে দেওয়া বিবৃতিতে তিনি বলেন, মৃতদের মধ্যে কক্সবাজারে ১৯ জন, চট্টগ্রামে ৫ জন, বান্দরবানে ৫ জন এবং রাঙামাটিতে ১ জন রয়েছেন।
মন্ত্রী জানান, সরকার ক্ষতিগ্রস্তদের সুরক্ষা ও মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এ পর্যন্ত পাঁচ জেলায় ১ হাজার ৫৭টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এর মধ্যে কক্সবাজারে ৬৪০টি, বান্দরবানে ২২০টি, খাগড়াছড়িতে ১৩৫টি, চট্টগ্রামে ৪১টি এবং রাঙামাটিতে ২১টি আশ্রয়কেন্দ্র রয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে চট্টগ্রামে ৮ হাজার ৩৪০ জন, বান্দরবানে ২ হাজার ১৭৩ জন, খাগড়াছড়িতে ১ হাজার ৭৫৫ জন এবং রাঙামাটিতে ১২৬ জন আশ্রয় নিয়েছেন।
ইউরোপীয় সিভিল প্রোটেকশন অ্যান্ড হিউম্যানিটারিয়ান এইড অপারেশনস -এর অর্থায়নে 'সুরক্ষা' প্রকল্পের আওতায় সেভ দ্য চিলড্রেন ও তাদের সহযোগী সংস্থাগুলো সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম জোরদার করেছে।
সেভ দ্য চিলড্রেনের রেজিলিয়েন্স অ্যান্ড অ্যান্টিসিপেটরি অ্যাকশন ম্যানেজার ফাতেমা মেহেরুন্নেসা জানান, ১০ জুলাই পর্যন্ত চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের পাঁচ জেলায় ৫ লাখ ৮০ হাজার ৪৮৯টি ভয়েস-বেজড আগাম সতর্কবার্তা পাঠানো হয়েছে। এছাড়া দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি, মেট ক্লাব, স্কুল, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং ফায়ার সার্ভিসের মাধ্যমে আরও ৯০ হাজার মানুষের কাছে জীবন রক্ষাকারী তথ্য পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।
ভয়াবহ বৃষ্টির আগেই প্রস্তুতি হিসেবে নাইক্ষ্যংছড়ি, লামা, রাঙামাটি, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন ও বাঁশখালীর ৩০০টি পরিবারকে ৬ হাজার টাকা করে শর্তহীন নগদ অর্থ সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে এ পর্যন্ত ৭৪৬টি পরিবারকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। স্থানীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটিগুলো রাস্তাঘাট মেরামত, ড্রেনেজ পরিষ্কার এবং খাদ্য ও ওষুধ সংরক্ষণের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
ভারী বৃষ্টির কারণে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম ব্যাপক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। বন্যায় রাস্তাঘাট প্লাবিত হওয়া, পাহাড় ধস এবং ব্রিজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের বেশ কিছু এলাকা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ফলে ক্ষয়ক্ষতির সঠিক মূল্যায়ন ও সহায়তা পৌঁছাতে দেরি হচ্ছে।
অনেক উপজেলায় বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক না থাকায় যোগাযোগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি এবং সড়ক ও নৌপথের অচলাবস্থার কারণে দুর্গম এলাকাগুলো থেকে মানুষকে সরিয়ে আনা কঠিন হয়ে পড়েছে।
