নতুন জুডিশিয়াল পে-কমিশন পর্যালোচনা কমিটি গঠন; ‘সময়ক্ষেপণের কৌশল’ বলছেন কর্মকর্তারা
'বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস পে-কমিশন, ২০২৫'-এর প্রতিবেদন পর্যালোচনা ও প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রণয়নের জন্য অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রীকে সভাপতি করে আট সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে সরকার।
তবে সরকারি চাকরিজীবীদের বহুল প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় পে-স্কেল ঘোষণার শেষ মুহূর্তে এসে এ উদ্যোগকে 'সময়ক্ষেপণের কৌশল' হিসেবে দেখছেন বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রীকে সভাপতি করে গঠিত এ কমিটিতে স্বরাষ্ট্র, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ, মহিলা ও শিশুবিষয়ক ও সমাজকল্যাণ এবং আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী; অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা এবং জনপ্রশাসন ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীকে সদস্য করা হয়েছে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ৬ আগস্ট জারি করা প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, কমিটি 'বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস পে-কমিশন, ২০২৫'-এর প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রণয়ন করবে। প্রয়োজনে কমিটিতে সদস্য কো-অপ্ট করা যাবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সভা অনুষ্ঠিত হবে। অর্থ বিভাগ কমিটিকে সাচিবিক সহায়তা দেবে। কমিটি অবিলম্বে কার্যকর হবে বলেও প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিচারকদের বেতন কাঠামো নিয়ে এ কমিটি গঠনের বিষয়টি সরকারি চাকরিজীবীদের বহুল প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গেও গুরুত্বপূর্ণভাবে যুক্ত। জাতীয় বেতন কমিশন, বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস পে-কমিশন এবং সশস্ত্র বাহিনী বেতন কমিটির প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে নতুন বেতন কাঠামোর রূপরেখা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছিল সরকার।
এ তিন প্রতিবেদন পর্যালোচনার জন্য মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটিও গঠন করা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বাধীন কমিটি ইতোমধ্যে তাদের সুপারিশ চূড়ান্ত করেছে।
তবে জুডিশিয়াল সার্ভিস পে-কমিশনের প্রতিবেদন পর্যালোচনা ও নতুন করে সুপারিশ প্রণয়নের উদ্যোগকে জাতীয় পে-স্কেল ঘোষণায় সময়ক্ষেপণের কৌশল হিসেবে দেখছেন বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন যুগ্মসচিব বলেন, 'মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বাধীন কমিটি জাতীয়, বিচার বিভাগ ও সশস্ত্র বাহিনীর বেতন প্রতিবেদনের সমন্বিত পর্যালোচনা করেছে। এরপর চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে এ ধরনের একটি কমিটি গঠন করা সময়ক্ষেপণের কৌশল ছাড়া আর কিছু নয়।'
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সরকার চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকে নতুন বেতন কাঠামো ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের ঘোষণা দিলেও এখনো তা চূড়ান্ত হয়নি। অর্থনৈতিক চাপ ও রাজস্ব আহরণের পরিস্থিতি বিবেচনায় বিষয়টি নিয়ে সরকার সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।
বিশেষ করে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন অন্তত দুই বছর পিছিয়ে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। অক্টোবরে আইএমএফের সঙ্গে নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা শেষে পে-স্কেল বাস্তবায়নের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
চলতি অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন স্কেল বাস্তবায়নের ঘোষণা দেন। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে নতুন বেতন কাঠামো আংশিক বাস্তবায়নের জন্য প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। তবে বেতন কমিশনের সুপারিশ পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়নে যে বড় অঙ্কের অতিরিক্ত ব্যয় হবে, সেটিই এখন সরকারের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ।
জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫ গত ২২ জানুয়ারি তাদের প্রতিবেদন তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে জমা দেয়। প্রতিবেদনে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়।
এতে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, এসব সুপারিশ বাস্তবায়নে বছরে অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে।
