আমদানি ২৫% বৃদ্ধির পরও কোরবানির আগে চট্টগ্রামে আদার দাম কেজিতে বাড়ল ৮০ টাকা
ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে দেশের সবচেয়ে বড় ভোগ্যপণ্যের পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে মসলার বাজার বেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। কোরবানির ঈদে মাংস রান্নার অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ আদার দাম মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিতে ৭০ থেকে ৮০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে লোকসান হওয়ায় আমদানিকারকেরা নতুন করে এলসি খোলেননি। তাই বাজারে আদার সরবরাহ বিঘ্নিত হয়েছে।
তবে চট্টগ্রাম কাস্টমসের তথ্য বলছে ভিন্ন কথা। তাদের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের তুলনায় এ বছর প্রায় ২৫ শতাংশ বেশি আদা আমদানি হয়েছে।
ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অতি মুনাফা লুটতেই সিন্ডিকেট করে দাম বাড়ানো হয়েছে।
চট্টগ্রাম কাস্টমসের তথ্যমতে, চলতি অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ২৭ এপ্রিল পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ১ লাখ ৫৩ হাজার ৫৬০ মেট্রিক টনের বেশি (১২ ধরনের) মসলা আমদানি হয়েছে।
এর মধ্যে শুধু আদা আমদানি হয়েছে ৬২ হাজার ৩৯৪ মেট্রিক টন। অন্যদিকে গত অর্থবছরের একই সময়ে আদা আমদানি হয়েছিল ৩৮ হাজার ৫৪৭ মেট্রিক টন। অর্থাৎ গত বছরের তুলনায় এবার প্রায় ২৩ হাজার ৮৪৭ মেট্রিক টন (প্রায় ২৫ দশমিক ৮ শতাংশ) বেশি আদা আমদানি হয়েছে।
আমদানি এত বেশি হওয়ার পরও বাজারে এমন অস্থিরতা সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
বাজার ঘুরে দেখা গেছে, মাত্র এক সপ্তাহ আগেও খাতুনগঞ্জের পাইকারি বাজারে চায়না আদা প্রতি কেজি ১০০ থেকে ১১০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল। সেই আদার দাম বেড়ে এখন ১৮০ থেকে ১৯০ টাকায় দাঁড়িয়েছে।
খুচরা বাজারে আদার দাম আরও চড়া। সেখানে মানভেদে প্রতি কেজি আদা ২০০ থেকে ২২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, ভারতীয় কেরালার আদার সরবরাহ বন্ধ থাকায় এবং দেশীয় আদার মজুত ফুরিয়ে আসায় পুরো বাজার এখন চায়না আদার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
অন্যদিকে পাইকারি বাজারে চায়না রসুনের দাম ১১০ থেকে ১১২ টাকা, দেশি রসুন ৪০ থেকে ৬০ টাকা এবং পেঁয়াজ ২৫ থেকে ৩৫ টাকার মধ্যে থাকলেও, আদার এই আকাশচুম্বী দামের কারণে বাজার করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন ক্রেতারা।
নগরীর খুচরা ব্যবসায়ী শাহাদাত হোসেন আদার এই আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধিতে হতাশা প্রকাশ করে টিবিএসকে বলেন, '১০-১৫ দিন আগেও ৯৫ টাকা করে কয়েক বস্তা আদা এনেছিলাম। চাহিদা থাকায় শনিবার আবার আনতে চেয়েছিলাম, কিন্তু দাম বেশি দেখে ফিরে আসছি। যা আছে এগুলো দিয়েই চলবে।'
মুরাদপুরের বাসিন্দা জাহিদুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, 'রমজান ও কোরবানির সময় কোনো না কোনো অজুহাতে বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়। সরকারের উচিত এখানে নজর দেওয়া। এর কারণে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষই সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী।'
খাতুনগঞ্জের হামিদুল্লাহ মিয়া বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. ইদ্রিস টিবিএসকে বলেন, 'গত কয়েক মাস ধরে আদার বাজার টানা নিম্নমুখী থাকায় আমদানিকারকেরা লোকসান গুনেছেন। এপ্রিল পর্যন্ত আমদানি খরচের চেয়েও কম দামে আদা বিক্রি করতে হয়েছে। এই দীর্ঘমেয়াদি লোকসানের কারণে অনেক আমদানিকারক পুঁজি হারিয়ে নতুন করে এলসি খোলেননি। সরবরাহ লাইনের এই ঘাটতিই ঈদের মুখে বাজারকে অস্থিতিশীল করেছে।'
তবে বিপুল আমদানির পরও ব্যবসায়ীদের এই যুক্তিকে 'অজুহাত' বলে মনে করছে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)।
সংগঠনটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন টিবিএসকে বলেন, 'দাম বাড়ানোর জন্য ব্যবসায়ীদের সব সময় একটা অজুহাত দরকার হয়। এলসি ও সরবরাহ সংকটও তাদের একটি উছিলা মাত্র। কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে বাজারে আদার চাহিদা বাড়তেই তারা সিন্ডিকেট করে দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। ব্যবসায়ীরা সারা বছর স্বাভাবিক নিয়মে ব্যবসা না করে উৎসবের সময়ে এককালীন অতি মুনাফা লুটতে চান।'
বাজারের এই অস্থিতিশীলতার পেছনে প্রশাসনের নজরদারির অভাব নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে নাজের হোসাইন বলেন, 'সরকার বা প্রশাসন সাধারণ মানুষের বদলে মুষ্টিমেয় কিছু ব্যবসায়ীর স্বার্থই বেশি দেখছে। বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়ানো হলেও প্রশাসন কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয় না। আর মাঝেমধ্যে যে পদক্ষেপ নেওয়া হয়, তা লোকদেখানো বা "আই ওয়াশ" ছাড়া আর কিছুই নয়।'
ঈদের আর মাত্র কয়েক দিন বাকি থাকায় আদার বাজারে দ্রুত স্বস্তি ফেরার সম্ভাবনা বেশ ক্ষীণ বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে তারা বলছেন, দেশের বড় আমদানিকারক ও পাইকারদের গুদামে সঠিক নজরদারি চালালেই আসল সত্য বেরিয়ে আসবে। অতি মুনাফালোভী চক্রের দৌরাত্ম্য থামাতে এবং সাধারণ ভোক্তাদের স্বস্তি দিতে অবিলম্বে খাতুনগঞ্জসহ প্রধান পাইকারি বাজারগুলোতে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ক্রেতা ও ক্যাব নেতারা।
