দেড় বছরে বন্ধ ৫০০ খামার, কোরবানির আগে চট্টগ্রামে ৩৫ হাজার পশুর ঘাটতি
ক্ষমতার পালাবদল, ব্যাংকঋণ না পাওয়া, পশুখাদ্যের দাম বৃদ্ধি ও গরু চুরির ঘটনায় গত দেড় বছরে চট্টগ্রামে পাঁচ শতাধিক গরুর খামার বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে জেলায় কমেছে কোরবানির পশু উৎপাদন, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে আসন্ন ঈদুল আজহার পশুর বাজারে।
চট্টগ্রাম জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এবার জেলায় কোরবানির পশুর চাহিদা ধরা হয়েছে ৮ লাখ ১৮ হাজার ৬৮১টি। এর বিপরীতে স্থানীয় খামারিদের কাছে মজুত রয়েছে মাত্র ৭ লাখ ৮৩ হাজার ১৫১টি পশু। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় প্রায় ৩৫ হাজার পশুর ঘাটতি রয়েছে, যা গত কয়েক বছরের তুলনায় বড় ব্যবধান।
প্রাণিসম্পদ বিভাগের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৪ সালে উৎপাদন ছিল ৮ লাখ ৫২ হাজার ৩৫৯টি এবং ২০২৩ সালে ছিল ৮ লাখ ৪২ হাজার ১৬৫টি। সেই ধারাবাহিকতা ভেঙে চলতি বছর উৎপাদন ৭ লাখ ৮৩ হাজারে নেমে আসাকে ডেইরি খাতের জন্য বড় সংকেত হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
খামার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উৎপাদন আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় আসন্ন কোরবানির ঈদে পশুর দাম সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে।
ডেইরি শিল্পের এই সংকটের চিত্র ফুটে উঠেছে সীতাকুণ্ডের এনডিআর এগ্রো ফার্মের স্বত্বাধিকারী মো. দেলোয়ার হোসেনের অভিজ্ঞতায়। একসময় তার খামারে প্রায় ১০০টি গরু থাকলেও লোকসানের ভার সইতে না পেরে সেই সংখ্যা এখন নেমে এসেছে ১৬টিতে।
দেলোয়ার হোসেন টিবিএসকে বলেন, "একদিকে বিশ্ব অর্থনীতির অস্থিরতা, অন্যদিকে গো-খাদ্যের দাম অস্বাভাবিক বেড়েছে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে বিদ্যুৎ বিল ও শ্রমিকের মজুরি। ফলে খামারের দৈনন্দিন পরিচালনা ব্যয় এখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।"
তিনি বলেন, "ক্রমাগত লোকসান গুনতে গুনতে পুঁজির বড় একটি অংশ শেষ হয়ে গেছে। বাজারের বর্তমান অস্থিরতা ও উচ্চ উৎপাদন ব্যয়ের কারণে বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ে এখন প্রায় দিশেহারা অবস্থায় আছি।"
তার মতে, সঠিক বাজার ব্যবস্থাপনা ও নীতিগত সরকারি সহায়তা ছাড়া এই খাতকে পুনরুজ্জীবিত করা বড় চ্যালেঞ্জ।
একই ধরনের সংকটের কথা জানিয়েছেন পটিয়া হাজী এগ্রো ফার্মের স্বত্বাধিকারী এস এম জোকা উল। দীর্ঘদিন ধরে পারিবারিকভাবে গবাদিপশু লালন-পালন করলেও ২০২০ সালে তিনি বাণিজ্যিকভাবে ডেইরি খামার শুরু করেন। ২০২১ সালে তার খামারে ১০০টি গরু থাকলেও বর্তমানে সেই সংখ্যা নেমে এসেছে ৪ থেকে ৬টিতে। আগে তার খামারে ১০ জন কর্মী কাজ করলেও এখন আছেন মাত্র একজন।
জোকা উল টিবিএসকে বলেন, "এখন আমরা বাণিজ্যিকভাবে গরু পালনের চিন্তা বাদ দিয়েছি। শুধু পারিবারিক প্রয়োজনেই ছোট পরিসরে এটি ধরে রেখেছি। এতে শুধু আমার লোকসান হয়নি, দেশের কর্মসংস্থানও সংকুচিত হয়েছে।"
খামার বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে তিনিও গো-খাদ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিকে দায়ী করেন। তিনি জানান, গমের ভুসি, যা মূলত বর্জ্য থেকে তৈরি হয়, সেটির দামও এখন আকাশচুম্বী। একসময় যে ভুসি ২৫ থেকে ৩০ টাকায় পাওয়া যেত, তা এখন বিক্রি হচ্ছে ৭০ টাকায়। এছাড়া সয়াবিনের দাম বর্তমানে ৮০ থেকে ৮৫ টাকায় পৌঁছেছে।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, "এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট কাজ করছে। তাদের কারসাজিতে নিঃস্ব হচ্ছেন খামারিরা।"
খাদ্য সংকটের পাশাপাশি সরকারি সুযোগ-সুবিধার অভাব ও অব্যবস্থাপনাকেও বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন উদ্যোক্তারা। খামার মালিকরা বলছেন, গরু-ছাগলের বিভিন্ন প্রয়োজনীয় টিকার জন্য সরকারি কোনো সহায়তা পাওয়া যায় না। খামারিদের চড়া দামে নিজেদের অর্থ ব্যয় করে এসব সংগ্রহ করতে হয়। এ বিষয়ে উপজেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর থেকেও কার্যকর সহযোগিতা পাওয়া যায় না বলে অভিযোগ তাদের।
অন্যদিকে ঋণ সুবিধার ক্ষেত্রেও প্রকৃত খামারিরা চরম বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। তাদের অভিযোগ, ব্যাংকঋণ বা সরকারি প্রণোদনা প্রকৃত খামারিদের হাতে পৌঁছায় না। বরং প্রভাবশালী ব্যক্তিরা খামার না করেও ঋণের অর্থ তুলে অন্য খাতে ব্যবহার করেন। ফলে একদিকে মাঠপর্যায়ের খামারগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে দেশ মাংস ও দুধে যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছিল, তাও হুমকির মুখে পড়ছে।
জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেড় বছর আগেও চট্টগ্রামে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ১২ হাজার ৫০০টি খামার ছিল। তবে গত এক থেকে দেড় বছরে পাঁচ শতাধিক খামার বন্ধ হয়ে গেছে।
রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিনিয়োগ সংকট এবং পশুপালনের ব্যয় বেড়ে যাওয়াকে এর প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে গড়ে ওঠা অনেক খামারের মালিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এলাকা ছেড়ে যাওয়ায় সেসব খামারও বন্ধ হয়ে গেছে।
এছাড়া সীতাকুণ্ড, পটিয়া ও আনোয়ারাসহ বিভিন্ন উপজেলায় গরু চুরির ঘটনা অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ায় অনেক প্রান্তিক খামারি ভয়ে তাদের শেষ সম্বলটুকু বিক্রি করে খামার গুটিয়ে নিচ্ছেন।
চট্টগ্রাম জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ আলমগীর দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "চট্টগ্রামে যে সামান্য ঘাটতি রয়েছে, তা দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা পশু দিয়ে পূরণ হবে। বিশেষ করে বগুড়া, দিনাজপুর, কুষ্টিয়াসহ বিভিন্ন এলাকার বেপারীরা প্রতিবছরের মতো এবারও পশু নিয়ে আসবেন।"
তিনি জানান, পার্বত্য তিন জেলাতেও চাহিদার তুলনায় পশু উদ্বৃত্ত রয়েছে।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, "সহযোগিতার জন্য উপজেলা অফিসে যেতে হবে। না গেলে কীভাবে সহযোগিতা করবে? আর বড় খামারিরা অনেক সময় সহযোগিতাই চান না। লোনের বিষয়টি ব্যাংকের ওপর নির্ভর করে।"
তিনি আরও বলেন, "আমাদের কাছে রেফারেন্সের জন্য এলে আমরা সর্বোচ্চ সহযোগিতা করি। ওষুধের বিষয়ে আমাদের তেমন বাজেট থাকে না। যতটুকু থাকে, তা গরিব ও অসহায়দের দেওয়া হয়। কোনো উপজেলা অফিসে গিয়ে সহযোগিতা না পেলে লিখিত অভিযোগ দিলে আমরা ব্যবস্থা নেব।"
