কোরবানির ঈদের আগে জমে উঠেছে মসলার বাজার, বিবিরহাটে ক্রেতাদের ভিড়
কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে পশুর হাটের পাশাপাশি এখন উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে রান্নাঘরের প্রস্তুতিতেও। সাধারণত কোরবানির পশু কেনা নিয়ে যতটা মাতামাতি হয়, রান্নার অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ মসলা নিয়ে আলোচনা যেন অনেকটাই আড়ালে থেকে যায়।
তবে চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী বিবিরহাট বাজারে গেলে সেই ভুল ভাঙতে বাধ্য, কারণ সেখানে এখন ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড়। চার দশকেরও বেশি পুরনো এই বাজারের মসলার দোকানগুলোতে বিক্রেতাদের দম ফেলার ফুসরত নেই। সারা বছর এখানে কম-বেশি বেচাকেনা হলেও ঈদের আগে এই ব্যস্ততা ও ক্রেতার আনাগোনা বেড়ে যায় বহুগুণ, যা পুরো বাজার এলাকায় এক উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি করেছে।
চট্টগ্রামের মানুষের কাছে কোরবানির ঈদ মানেই ঐতিহ্যবাহী মেজবানি স্বাদের মাংস রান্না। আর এই বিশেষ রান্নার জন্য চট্টগ্রামবাসীর দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত ঠিকানা হলো বিবিরহাটের মসলার বাজার। এখানকার ২২ পদের উপাদান দিয়ে তৈরি বিশেষ মেজবানি মসলার সুখ্যাতি রয়েছে পুরো অঞ্চল জুড়ে।
ক্রেতারা জানান, এই বাজার থেকে সংগৃহীত বিশেষ মসলা মাংসে ব্যবহার করলে অন্য কোনো মসলার আর প্রয়োজনই পড়ে না, যা মাংসের স্বাদকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। যুগ যুগ ধরে টিকে থাকা এই আস্থা ও বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করেই মূলত প্রতি বছর ঈদের আগে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এখানে ছুটে আসেন নিজেদের রসুইঘরের প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে।
বাজারের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে ব্যবসায়ীরা জানান, এবার ঈদের আগে মসলার চাহিদা ব্যাপক বাড়লেও দাম ক্রেতাদের নাগালের মধ্যেই রয়েছে, এমনকি কিছু পণ্যের দাম গত বছরের তুলনায় কিছুটা কমেছে।
বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতি কেজি হাটহাজারীর বিখ্যাত মিষ্টি মরিচ বিক্রি হচ্ছে ৫৪০ টাকায় এবং রায়পুরের ঝাল ও মিষ্টি মরিচ মিলছে ৪৬০ টাকায়। এছাড়া সাধারণ ঝাল মরিচের কেজি ৪৬০ টাকা এবং খাগড়াছড়ির হলুদের গুঁড়া পাওয়া যাচ্ছে ৩৩০ থেকে ৩৬০ টাকার মধ্যে।
রান্নার অন্যতম প্রধান উপাদান ধনিয়া গুঁড়া প্রতি কেজি ২৮০ টাকা, মিক্স মসলা গুঁড়া ৬০০ টাকা, চিকন জিরার গুঁড়া ৯৬০ টাকা, মিষ্টি জিরার গুঁড়া ৩৬০ টাকা এবং রাঁধুনী গুঁড়া বিক্রি হচ্ছে ৭০০ টাকা কেজিতে।
বিবিরহাটের মূল আকর্ষণ মেজবানির গরম মসলা এবার মানভেদে প্রতি কেজি ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩৬০ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে।
অন্যদিকে, ঝাঁঝালো স্বাদের সাদা গোল মরিচের গুঁড়া প্রতি কেজি ১ হাজার ৮০০ টাকা এবং কালো গোল মরিচের গুঁড়া বিক্রি হচ্ছে ১৬০০ টাকায়। প্রতি ১০০ গ্রাম এলাচ গুড়া বিক্রি হচ্ছে ৫০০ টাকায়, দারুচিনি ৬০ টাকায় এবং লবঙ্গ বিক্রি হচ্ছে ১৬০ টাকা দরে। দামের এই স্থিতিশীলতা ক্রেতাদের বেশ স্বস্তি দিয়েছে, যার ফলে সবাই যার যার প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যাপ্ত পরিমাণে মসলা সংগ্রহ করছেন।
উট মার্কা মসলার স্বত্বাধিকারী মোক্তার হোসেন টিবিএসকে বলেন, 'কোরবানির ঈদে বাজারে মেজবানি মসলার চাহিদাই সবচেয়ে বেশি থাকে। এর পাশাপাশি হাটহাজারীর মরিচসহ স্থানীয় কিছু বিশেষ পণ্যের প্রতি ক্রেতাদের আকর্ষণ থাকে। এবার মসলার দাম তেমন একটা বাড়েনি, বরং ক্রেতাদের জন্য সুখবর হলো জিরার দাম গতবারের চেয়ে কিছুটা কমেছে। তবে লাল মরিচের দাম বাজারে এখন সামান্য চড়া যাচ্ছে।'
হরিণ মার্কা মসলার ব্যবস্থাপক নুরুল আজিম দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে (টিবিএস) বলেন, 'কোরবানির উৎসব তো একদিনেরই, তাই এই সময়ে সবারই কম-বেশি মসলা লাগবে। যারা কোরবানি দিচ্ছেন তাদের যেমন লাগবে, তেমনি যারা দিচ্ছেন না তাদের ঘরেও ঈদের ভালো রান্নার আয়োজন হয়। সবাই একসঙ্গে বাজারে আসার কারণে এখন ভিড়টা একটু বেশি মনে হচ্ছে, তবে পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকায় আমরা ক্রেতাদের চাহিদা মেটাতে পারছি।'
বাজারে মসলা কিনতে আসা ক্রেতা রিফাত হোসেন জানান, বিবিরহাটের মসলার সাথে অন্য কোনো জায়গার মসলার তুলনা চলে না। দীর্ঘদিনের আস্থা ও ভালো মানের কারণে তারা সারা বছরই এখান থেকে মসলা কেনেন, আর কোরবানির ঈদে তো কোনো বিকল্পই ভাবা যায় না।'
তিনি আরও বলেন, 'ঈদের রান্না মানে শুধু নিজেদের খাওয়া নয়, বরং মেহমানদের মন ভরানোর একটি বড় বিষয় থাকে। আর সেই আতিথেয়তার প্রস্তুতিতে কোনো কমতি না রাখতেই চট্টগ্রামবাসী প্রতি বছরের মতো এবারও ভরসা রাখছেন ঐতিহ্যবাহী বিবিরহাটের এই সুবাসিত মসলার বাজারে।'
