সাভারে সংবাদ সংগ্রহকালে সাংবাদিকদের ওপর মাদক কারবারিদের হামলা
ঢাকার সাভারের রাজাশন এলাকায় সংবাদ সংগ্রহকালে বেসরকারি স্যাটেলাইট চ্যানেল দেশ টিভির সিনিয়র রিপোর্টার তায়েফুর রহমান তুহিন ও এসএ টিভির সাভার প্রতিনিধি সাদ্দাম হোসেনসহ পুরো টিমের ওপর হামলা চালিয়েছে শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী শামীম ও তার সহযোগীরা।
আজ শুক্রবার (২২ মে) বিকেল সাড়ে ৩টা নাগাদ পশ্চিম রাজাশন এলাকায় এই ঘটনা ঘটে।
এ সময় হামলাকারীরা দুই সাংবাদিককে ছুরিকাঘাত করাসহ টিমের সদস্যদের এলোপাতাড়ি মারধর করে। পরে তাদের পার্শ্ববর্তী একটি গ্যারেজে আটকে রেখে মুচলেকা নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। পাশাপাশি দেশ টিভির একটি গাড়ি (প্রাইভেট কার) ভাঙচুর এবং দুই সাংবাদিকের কাছে থাকা মানিব্যাগ, নগদ টাকা, ক্যামেরা ও অন্যান্য সরঞ্জাম ছিনিয়ে নিয়ে যায় হামলাকারীরা।
আহত অন্য দুজন হলেন—দেশ টিভির ক্যামেরাপারসন কাইয়ুম ও চালক জয়নাল।
ঘটনার খবর পেয়ে সাভার মডেল থানা পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে গুরুতর আহতদের উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পাঠায়। এছাড়া এ ঘটনায় জড়িত ৪ জনকে আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সাভার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরমান আলী।
দেশ টিভির সিনিয়র রিপোর্টার ও হামলার শিকার সাংবাদিক তুহিন দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, 'সকালে অফিসের নির্ধারিত কাজে (অ্যাসাইনমেন্ট) মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকের বিস্তার নিয়ে সংবাদ সংগ্রহের জন্য ওই এলাকায় যাই আমরা। আমাদের সাথে এসএ টিভির স্থানীয় প্রতিনিধি সাদ্দাম হোসেনও ছিলেন। স্থানীয় বিভিন্ন মানুষের বক্তব্যসহ যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ করে আমরা ফিরে আসছিলাম। যে গলিটি শামীমের মাদক ব্যবসার জন্য পরিচিত, সেই গলিতে একটু থেমে দূর থেকে মাদক সিন্ডিকেটের স্থাপন করা সিসিটিভি ক্যামেরার দৃশ্য (ফুটেজ) নিয়ে গাড়িতে উঠে চলে আসার সময় একজন ব্যক্তি কথা বলতে চায়। পরে আমি গাড়ি থেকে নামার সাথে সাথেই মাদক ব্যবসায়ী শামীমসহ ৪০ বা ৫০ জন লোক দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আমাদের ওপর অতর্কিতভাবে হামলা চালায়।'
তিনি আরও যোগ করেন, 'এ সময় হামলাকারীরা আমাদের গাড়ি ভাঙচুর করাসহ আমাদের এলোপাতাড়ি মারধর, আমার পেটে ও পিঠে ছুরিকাঘাত এবং সাদ্দামের চোখে ছুরিকাঘাত করে। আমাদের সাথে থাকা যাবতীয় জিনিসপত্র ছিনিয়ে নিয়ে প্রকাশ্যে আমাদের তুলে শামীমের গ্যারেজে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেও আমাদের ওপর নির্যাতন চালায় তারা। এক পর্যায়ে আমরা হাসপাতালে যাওয়ার সুযোগ দেওয়ার অনুরোধ জানালে শামীম জানায় পুলিশ আসছে, তারা আসলে মুচলেকা দিয়ে তারপর যেতে হবে। এর কিছু সময় পর প্রথমে পুলিশের একটি দল এবং পরে আরও কিছু পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্য ঘটনাস্থলে গিয়ে আমাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠান।'
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন গুরুতর আহত সাদ্দাম হোসেন বলেন, 'সম্প্রতি মাদক ব্যবসায়ী শামীমকে নিয়ে পৃথক দুটি প্রতিবেদন করার পর তুহিন ভাই আমার সাথে যোগাযোগ করে মাদকের বিস্তার নিয়ে প্রতিবেদন করার কথা জানান এবং আমাকে সহযোগিতার অনুরোধ করেন। সেই সুবাদেই আজ আমি দেশ টিভির টিমের সাথে যোগ দেই।'
তিনি আরও বলেন, 'হামলার এক পর্যায়ে শামীম পিস্তল ঠেকিয়ে আমাকে গুলি করতে উদ্যত হলে আরেক ব্যক্তি তিন দফায় আমাকে ছুরিকাঘাত করে এবং একটি আঘাত আমার চোখের কোণে লাগে। তাকে নিয়ে সম্প্রতি প্রতিবেদন করায় আমার ওপর আগে থেকেই তার ক্ষোভ ছিল।'
সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ডা. সোনিয়া রহমান দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, 'আমরা দুজন রোগী পেয়েছি। এর মধ্যে একজনের (তুহিন) শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল হলেও অন্যজনের (সাদ্দাম) চোখে গুরুতর জখম থাকায় তাকে জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তর করা হয়েছে। তবে অন্য যে রোগী স্থিতিশীল রয়েছেন, তাকেও স্বজনদের অনুরোধে অন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।'
আহত দুজনের শরীরেই ছুরিকাঘাতের চিহ্ন রয়েছে বলেও নিশ্চিত করেছেন এই চিকিৎসক।
সাভার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরমান আলী বলেন, 'খবর পেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থল থেকে আহতদের উদ্ধার করে পুলিশের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি ঘটনাস্থল থেকে জড়িত ৪ জনকে আটক করা হয়েছে। এ ঘটনায় মূল অভিযুক্ত শামীমসহ অন্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।'
এর আগে গত ১০ মে রাতে গোপন তথ্যের ভিত্তিতে মাদক ব্যবসায়ী শামীমকে লক্ষ্য করে ওই এলাকায় অভিযান চালায় র্যাব। অভিযানে শামীমকে গ্রেপ্তার করা না গেলেও পার্শ্ববর্তী স্থান থেকে ৩ জনকে একটি বিদেশি পিস্তল, হেরোইন, ইয়াবা ও গাঁজাসহ গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
র্যাব সূত্র জানায়, তাদের তথ্য অনুযায়ী শামীম নিজে মাদক কাছে না রেখে লোক দিয়ে ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে। সেদিন অভিযানে যারা গ্রেপ্তার হয়েছিল, তারাও শামীমের সহযোগী বলে ধারণা করা হচ্ছে। এছাড়া শামীমের বিরুদ্ধে সাভার ও আশুলিয়া থানায় একাধিক মামলা রয়েছে বলেও জানিয়েছে র্যাব।
