গর্ভাবস্থা থেকে বার্ধক্য পর্যন্ত সামাজিক নিরাপত্তার রূপরেখা থাকবে নতুন বাজেটে
বিএনপির প্রতিশ্রুত ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড কর্মসূচির বিস্তৃতির পাশাপাশি আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে লাইফ-সাইকেলভিত্তিক সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে বাংলাদেশকে কল্যাণকর রাষ্ট্রে রূপান্তরের পরিকল্পনা আগামী বাজেটে তুলে ধরতে যাচ্ছে সরকার।
নতুন এই পদ্ধতির আওতায় গর্ভাবস্থা থেকেই রাষ্ট্রীয় সহায়তা শুরু হবে। এরপর শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, বেকার ভাতা এবং বার্ধক্যে আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাধ্যমে এই সহায়তা অব্যাহত থাকবে। মূলত প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম চলে আসা দারিদ্র্যের চক্র ভেঙে ফেলাই এই উদ্যোগের লক্ষ্য।
আগামী ১১ জুন জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এটি হবে বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেট।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমানে খণ্ডিত সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী ব্যবস্থা থেকে সরে এসে সব নাগরিককে অন্তর্ভুক্ত করে পূর্ণাঙ্গ সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামোর ঘোষণা দেবেন আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
তারা জানান, পর্যায়ক্রমে সব নাগরিককে আজীবন সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামোর আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। উপকারভোগী নির্বাচনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে আগামী অর্থবছর থেকেই 'ওয়ান পার্সন, ওয়ান অ্যাকাউন্ট' (এক ব্যক্তি, একটি অ্যাকাউন্ট) নামে 'ডায়নামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি সিস্টেম' চালুর কাজ শুরু হবে।
এই ব্যবস্থার মাধ্যমে লাইফ-সাইকেলভিত্তিক সামাজিক নিরাপত্তা মডেল বাস্তবায়ন করতে চায় সরকার।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, কয়েক বছর আগে বাংলাদেশ লাইফ-সাইকেলভিত্তিক সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে কাজ শুরুর উদ্যোগ নিয়েছিল।
তিনি টিবিএসকে বলেন, 'তবে পরে এ বিষয়ে খুব বেশি অগ্রগতি হয়নি। সরকারকে সুস্পষ্ট কৌশল, সম্ভাব্য ব্যয়ের হিসাব এবং আগামী ১৫ থেকে ২০ বছরের জনসংখ্যাভিত্তিক প্রাক্কলন তৈরি করতে হবে।'
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে বিদ্যমান কর্মসূচিগুলো এডহক ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং একটির সঙ্গে আরেকটির সমন্বয় খুবই কম। অনেকেই শিক্ষাজীবন শেষ করার পরও বেকার থাকছেন, আবার অবসরে যাওয়ার পর অনেকের কোনো পেনশনও থাকে না।
তিনি বলেন, 'সরকার যদি একটি পূর্ণাঙ্গ কৌশল তৈরি করতে পারে, তাহলে বাস্তবায়ন সম্ভব হবে। না হলে এটি শুধু কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। যেহেতু লাইফ-সাইকেলভিত্তিক সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে আগে কিছু ভিত্তিমূলক কাজ হয়েছে, সেখান থেকেই সরকার শুরু করতে পারে।'
আগের উদ্যোগ
যুক্তরাজ্য, সুইডেন, ডেনমার্ক, নরওয়ে, ফিনল্যান্ড, জার্মানি, ফ্রান্স, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও জাপানসহ বিশ্বের বেশ কয়েকটি উন্নত দেশ এ ধরনের সামাজিক নিরাপত্তা মডেল অনুসরণ করে।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় বাংলাদেশ ২০১৫ সালে লাইফ-সাইকেলভিত্তিক জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশল প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছিল। তবে পরে সেই উদ্যোগ থেমে যায়।
বাংলাদেশে ইতোমধ্যে গর্ভকালীন মাতৃত্ব ভাতা, সন্তান জন্মের পর দুগ্ধদানকারী মায়েদের সহায়তা, শিক্ষা উপবৃত্তি, বেকার শ্রমিকদের জন্য তিন মাসের ভাতা এবং বয়স্ক ভাতাসহ বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি চালু রয়েছে।
তবে এসব কর্মসূচি কোনো সমন্বিত কাঠামোর আওতায় পরিচালিত হচ্ছে না। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান উপকারভোগীদের অনেকেই এ সহায়তা পাওয়ার যোগ্য নন।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, সরকারের পরিকল্পিত লাইফ-সাইকেলভিত্তিক সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা ধীরে ধীরে সর্বজনীন কাভারেজের দিকে এগোবে।
তিনি বলেন, 'তবে উপকারভোগী নির্বাচন প্রক্রিয়া অবশ্যই স্বচ্ছ হতে হবে। বর্তমানে ফ্যামিলি কার্ড পাওয়া ব্যক্তিদের প্রায় ১৮ শতাংশ এ কর্মসূচির জন্য যোগ্য ছিলেন না বলে জানা গেছে।'
তিনি বলেন, বাংলাদেশকে কল্যাণকর রাষ্ট্রে রূপান্তর করতে জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশল পুনর্বিবেচনা করতে হবে। তিনি বলেন, 'বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারেও এ ধরনের অঙ্গীকার ছিল।'
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে পর্যাপ্ত রাজস্ব আহরণই হবে সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
২০৩২ সালের মধ্যে সব নাগরিককে আওতাভুক্ত করার পরিকল্পনা
কর্মকর্তারা জানান, প্রস্তাবিত ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কাঠামোয় ব্যাপক সংস্কারের মাধ্যমে কল্যাণকর রাষ্ট্র গঠনে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
তারা বলেন, অবকাঠামো খাতে প্রধান গুরুত্ব না দিয়ে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় বরাদ্দ বাড়ানো হবে।
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে বরাদ্দ চলতি অর্থবছরের ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা থেকে বেড়ে আগামী বাজেটে ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি হতে পারে।
শুরুর দিকে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হলেও ২০৩২ সালের মধ্যে ধীরে ধীরে সব নাগরিকের জন্য সর্বজনীন সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তুলতে চায় সরকার।
কল্যাণকর রাষ্ট্র গঠনে বিএনপির অঙ্গীকার
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের সব নাগরিককে সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামোর আওতায় আনার অঙ্গীকার করেছেন। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত জেলা প্রশাসক সম্মেলনেও তিনি এ প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন।
অনুষ্ঠানে তারেক রহমান বলেন, 'রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতিটি মানুষকে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় নিয়ে আসাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী নির্ধারিত ও নির্বাচিত প্রতিটি খাতে ধীরে ধীরে মানুষের কাছে বিভিন্ন ধরনের সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হবে।'
বিএনপির ফ্ল্যাগশিপ প্রকল্পের অংশ হিসেবে আগামী অর্থবছরে ৪১ লাখ নারীপ্রধান পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড এবং ৪২ লাখ ৫০ হাজার কৃষককে কৃষক কার্ড দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
এছাড়া, খাল খনন প্রকল্পের মাধ্যমে ৩৪ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিকল্পনা রয়েছে। সব মিলিয়ে নতুন করে ১ কোটি ২১ লাখ মানুষকে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় আনা হবে। নগদ অর্থ ও খাদ্য সহায়তাভিত্তিক ১৮টি কর্মসূচির উপকারভোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে ৩ কোটি ৬৩ লাখে।
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সংশোধিত বেতন কাঠামো ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন, সৃজনশীল অর্থনীতিতে সহায়তা, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বেশি গুরুত্ব এবং প্রতিরক্ষা খাতে কেনাকাটা বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে সরকারের।
কর্মকর্তারা আরও জানান, আগামী বাজেটে মাতৃত্ব ভাতা, দুগ্ধদানকারী মায়ের ভাতা, বয়স্ক ভাতা ও প্রতিবন্ধী ভাতার উপকারভোগীর সংখ্যা এবং ভাতার পরিমাণ—দুইই বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
দরিদ্র ও প্রান্তিক শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনের শুরু থেকেই উপবৃত্তি নিশ্চিত করা এবং দক্ষতা উন্নয়নে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে সরকারের।
বেকার বা হঠাৎ কর্মহীন হয়ে পড়া ব্যক্তিদের জন্যও সহায়তার ব্যবস্থা থাকবে। পাশাপাশি বয়স্ক ভাতা ব্যবস্থায় সংস্কার এনে সুবিধা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
নতুন বেতন কাঠামো ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা ইতোমধ্যে অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতার খসড়া প্রস্তুত করেছেন। সেখানে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। আগামী রোববার এ খসড়া অর্থমন্ত্রীর কাছে জমা দেওয়ার কথা রয়েছে।
এক কর্মকর্তা টিবিএসকে বলেন, প্রস্তাবিত নতুন বেতন কাঠামো একবারে পুরোপুরি বাস্তবায়নের আর্থিক সক্ষমতা সরকারের নেই।
তিনি বলেন, 'এ কারণেই খসড়া বাজেট বক্তৃতায় ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে অর্থমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার ওপর।'
প্রস্তাবে নতুন কাঠামোর আওতায় বাড়তি মূল বেতনের অর্ধেক আগামী অর্থবছরে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। বাকি অর্ধেক ২০২৭-২৮ অর্থবছরে দেওয়া হবে এবং পরের বছর সংশোধিত বেতন কাঠামো অনুযায়ী সব ধরনের ভাতা চালু করা হবে।
প্রতিরক্ষা ব্যয়
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, বিশ্বজুড়ে উত্তেজনা বৃদ্ধির কারণে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর চাপের মুখে রয়েছে সরকার। বিশেষ করে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও আধুনিক যুদ্ধবিমান কেনাসহ বিভিন্ন খাতে অতিরিক্ত বরাদ্দের প্রয়োজন হতে পারে।
এক কর্মকর্তা বলেন, 'বিশ্বজুড়ে একের পর এক সংঘাত চলছে এবং অনেক দেশ তাদের সামরিক সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। পূর্ব এশিয়াতেও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ছে, ফলে ওই অঞ্চলের দেশগুলো প্রতিরক্ষা জোরদার করছে। বাংলাদেশের ওপরও প্রতিরক্ষা কেনাকাটা বাড়ানোর চাপ রয়েছে, যার কারণে এ খাতে বরাদ্দ বাড়তে পারে।'
