অঙ্গদান প্রক্রিয়ায় বিধিনিষেধ শিথিল করে মানবদেহে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সংযোজন বিল পাস
৯ এপ্রিল সংসদে 'মানবদেহে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সংযোজন বিল-২০২৬' পাস হয়েছে। চোখ, ত্বক ও অস্থিমজ্জা দানের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ শিথিল করে বিলটি অনুমোদন দেওয়া হয়।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন সংসদে বিলটি উত্থাপন করেন। পরে কণ্ঠভোটে তা পাস করা হয়। আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে বিদ্যমান আইনটির পরিবর্তে নতুন বিধান যুক্ত করে এই আইন প্রণয়ন করা হয়েছে।
নতুন আইনে 'অঙ্গ' শব্দের সংজ্ঞা বিস্তৃত করা হয়েছে। এতে শুধু কিডনি ও লিভারের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ নয়, মানবদেহের টিস্যুও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আইনে অঙ্গ সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং প্রতিস্থাপনের বিস্তারিত পদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়েছে।
আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মৃত ব্যক্তির দেহ থেকে অঙ্গ সংগ্রহের আইনি কাঠামো প্রবর্তন করা। এর মাধ্যমে মৃত ব্যক্তিদের কাছ থেকে অঙ্গ সংগ্রহ করে প্রতিস্থাপনের সুযোগ তৈরি হবে।
এছাড়া আইনে 'সোয়াপ ট্রান্সপ্লান্ট' বা অঙ্গ বিনিময় প্রতিস্থাপনের বিধান রাখা হয়েছে। অমিল বা ইনকম্প্যাটিবল দাতা-গ্রহীতা জোড়ার মধ্যে অঙ্গ বিনিময় করা যাবে। নির্দিষ্ট শর্ত সাপেক্ষে আত্মীয় নন এমন ব্যক্তিদের কাছ থেকেও অঙ্গ দানের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রী জানান, দাতা ও গ্রহীতার তথ্য সংরক্ষণের জন্য একটি কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ গঠন করা হবে। এর মাধ্যমে পুরো প্রক্রিয়ায় তদারকি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে।
জীবিত ব্যক্তির অঙ্গদানের ক্ষেত্রে সাধারণত নিকট আত্মীয়দেরই দাতা হিসেবে অনুমোদন দেওয়া হবে। আইনে দাতা ও গ্রহীতা উভয়ের জন্য বয়সসীমা, বাধ্যতামূলক স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং সংক্রামক রোগ শনাক্তকরণের পরীক্ষার বিধানও উল্লেখ করা হয়েছে।
আইনটিতে কঠোর নিয়ন্ত্রণমূলক বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সরকারি অনুমোদন ছাড়া কোনো হাসপাতাল অঙ্গ প্রতিস্থাপন করতে পারবে না। পাশাপাশি অঙ্গের বাণিজ্য, দালালি এবং এ–সংক্রান্ত বিজ্ঞাপন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
এই আইন লঙ্ঘন করলে—যেমন মিথ্যা আত্মীয়তার দাবি করা হলে—কারাদণ্ড, জরিমানা, চিকিৎসকের লাইসেন্স বাতিল এবং হাসপাতালের অনুমোদন স্থগিত করার মতো শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।
উল্লেখ্য, গত বছরের ১৯ নভেম্বর মানব অঙ্গ প্রতিস্থাপন অধ্যাদেশ ২০২৫–সংক্রান্ত একটি গেজেট প্রকাশ করা হয়েছিল।
আগের আইনে ২২ জন নিকট আত্মীয় কিডনি দান করতে পারতেন। নতুন অধ্যাদেশে এই সংখ্যা বাড়িয়ে ৩০ জন করা হয়েছে। এর মধ্যে চাচাতো-মামাতো-ফুফাতো-খালাতো ভাইবোন, ভাতিজা-ভাগ্নে এবং সৎ ভাইবোনকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সচেতনতার অভাব এবং পর্যাপ্ত প্রচারণা না থাকায় অনেক মানুষ 'ইমোশনাল ডোনেশন' বা আবেগগত সম্পর্কের ভিত্তিতে অঙ্গদানের বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন। পাশাপাশি এই প্রক্রিয়া জটিল হওয়া এবং অনৈতিক বা অবৈধ কার্যক্রমের সম্ভাব্য ঝুঁকিও রয়েছে।
এই নিকটাত্মীয়দের পাশাপাশি নতুন অধ্যাদেশে 'ইমোশনাল ডোনার' বা আবেগীয় দাতা হিসেবেও অঙ্গ দানের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
এ ক্ষেত্রে দাতার বয়স অবশ্যই ১৮ বছরের বেশি হতে হবে, তিনি মানসিকভাবে সুস্থ থাকতে হবে এবং স্বেচ্ছায় ও পূর্ণ অবগতির ভিত্তিতে সম্মতি দিতে হবে।
এছাড়া অঙ্গদানের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের আর্থিক প্রলোভন বা জোরজবরদস্তি থাকা যাবে না।
দাতা ও গ্রহীতার মধ্যে দীর্ঘদিনের পরিচিতি থাকতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট কমিটির অনুমোদনের ভিত্তিতে দাতাকে নিঃস্বার্থ দাতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে।
