তেলের লাইনে ফুরিয়ে যাচ্ছে সময়, আয়ের চাকা থমকে যাচ্ছে রাইড শেয়ারিং চালকদের
জ্বালানি-সংকট বাড়তে থাকায় রাজধানীতে ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ লাইন এখন যেন পরিচিত দৃশ্য হয়ে উঠেছে। এতে রাইড শেয়ারিং চালকদের সময় ও আয়—দুটোই কমে যাচ্ছে।
ছুটির দিনেও এর প্রভাব স্পষ্ট ছিল। শুক্রবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের বিপরীতে মেঘনা ফিলিং স্টেশনের সামনে মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ির দীর্ঘ সারি দেখা যায়। এতে রাইড শেয়ারিং চালকদের ভোগান্তির চিত্রই ফুটে ওঠে স্পষ্ট।
সারির ঠিক মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে ছিলেন ইয়াসিন, ড্যাফোডিল পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগের শিক্ষার্থী তিনি। মধ্যবিত্ত পরিবারের বড় সন্তান ইয়াসিন পড়াশোনার খরচ চালাতে রেড-শেয়ারিং চালক হিসেবে বাইক নিয়ে বের হন।
ইয়াসিন বলেন, "আগে পাম্পে এসে পাঁচ মিনিটে তেল নিয়ে বেরিয়ে যেতাম। এখন সকাল সাড়ে ১১টা বাজে, অথচ এক ঘণ্টা ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। পাম্প থেকে বলছে, ৬০০ টাকার বেশি তেল দেবে না। এইটুকু তেলে সারা দিন চালানো সম্ভব নয়। অথচ লাইনে দাঁড়িয়েই আমার দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়টা শেষ হয়ে যাচ্ছে।"
ইয়াসিনের মতো হাজারো চালকের এখন প্রধান শত্রু আর যানজট নয়, বরং তেলের লাইনে দীর্ঘ অপেক্ষা। প্রতিদিন গড়ে তিন থেকে চার ঘণ্টা সময় নষ্ট হচ্ছে শুধু জ্বালানি সংগ্রহ করতে।
যেখানে আগে একজন চালক দিনে ১০ থেকে ১২টি ট্রিপ দিতে পারতেন, এখন দীর্ঘ সময় লাইনে থাকার কারণে সেই সংখ্যা নেমে এসেছে ৫ থেকে ৬টিতে। সময় নষ্ট হওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়ছে দিন শেষে তাদের আয়ের ওপর।
ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের সরবরাহ হুমকির মুখে পড়েছে। জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহেও তৈরি হয়েছে নানামুখী জটিলতা। সরবরাহ চেইনে অসামঞ্জস্যের কারণে অনেক পাম্পে সীমিত পরিমাণে তেল বিক্রি করা হচ্ছে।
ফলে একদিকে যেমন দীর্ঘ লাইন তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে পাম্পগুলো বাধ্য হয়ে নির্দিষ্ট পরিমাণ, অর্থাৎ ৫০০ বা ৬০০ টাকার বেশি তেল না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। এতে চালকদের প্রতিদিনই একাধিকবার পাম্পে যেতে হচ্ছে, যা তাদের কর্মঘণ্টা কমিয়ে দিচ্ছে।
বিশেষ করে রাইড শেয়ারিং চালকদের ক্ষেত্রে এর প্রভাব বেশি। কারণ, তাদের আয় সরাসরি নির্ভর করে তারা কত বেশি ট্রিপ দিতে পারছেন তার ওপর। কিন্তু তেলের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকায় তারা পিক আওয়ারের গুরুত্বপূর্ণ সময় হারাচ্ছেন।
রাজধানীর বাড্ডা এলাকায় পরিবার নিয়ে থাকেন কাজী ফান্নু। একসময় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে গাড়িচালক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। চাকরি হারানোর পর তার সম্বল ছিল শুধু ড্রাইভিংয়ের অভিজ্ঞতা। পরে গাড়ি ভাড়া নিয়ে উবার চালানো শুরু করেন। কিন্তু বর্তমান জ্বালানি-সংকট তাকে নতুন করে বিপাকে ফেলেছে।
কাজী ফান্নু আক্ষেপ করে বলেন, "বাড্ডা থেকে রামপুরা পর্যন্ত পাম্পগুলোতে তেলের জন্য হাহাকার। ৫০০-৬০০ টাকার তেল দিয়ে বড় ট্রিপ নেওয়া যায় না। পাম্পে দুই ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে যখন ট্রিপে বের হই, তখন দেখা যায় যাত্রী নেই।"
"আগে যেখানে দিনে ১,৫০০ থেকে ২,০০০ টাকা আয় হতো, এখন সব খরচ বাদ দিয়ে ৫০০ টাকা ঘরে নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে। পরিবার নিয়ে এই আয়ে ঢাকায় টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে যাচ্ছে," যোগ করেন তিনি।
অন্যদিকে, সাধারণ যাত্রীদের অভিযোগ, রাইড শেয়ারিংয়ের ভাড়া আগের চেয়ে অনেক বেড়ে গেছে। নিয়মিত উবার ব্যবহারকারী বেসরকারি চাকরিজীবী সায়মা আক্তার টিবিএসকে জানান, অ্যাপে যে ভাড়া দেখায়, চালকেরা তার চেয়ে বেশি দাবি করেন। অনেক সময় তারা যেতেই চান না।
তবে চালকদের ভাষ্য ভিন্ন। দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা এবং চাহিদামতো তেল না পাওয়ার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে তারা কিছুটা বাড়তি টাকা দাবি করতে বাধ্য হচ্ছেন। তাদের মতে, দুই থেকে তিন ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মানে অন্তত ৩০০ টাকার সম্ভাব্য আয় হারানো। সেই ক্ষতি কিছুটা বাড়তি ভাড়ার মাধ্যমে সমন্বয়ের চেষ্টা করেন তারা।
উবারচালক হাসান রশিদ টিবিএসকে বলেন, "আমরা ইচ্ছা করে ভাড়া বাড়াই না। কিন্তু যখন দেড় থেকে দুই ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, তখন সেই সময়টা তো আর ফেরত পাওয়া যায় না। তাই কিছুটা বেশি আয়ের চেষ্টা করতে হয়। সরকার তেল দেওয়ার সীমা তুলে দেওয়ার পরও পাম্পগুলো তা মানছে না।"
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "যদি নাই মানতে পারে, তাহলে সরকার এমন সিদ্ধান্ত দিল কেন?"
যানবাহনভেদে তেলের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণের বিষয়ে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের বিপরীত পাশের মেঘনা ফিলিং স্টেশনের স্বত্বাধিকারী আহমাদ রুশদ টিবিএসকে বলেন, "এটা ছাড়া কী করার আছে? এখন সবাই এসে ট্যাংক ফুল করতে চাচ্ছে। বেশি সংখ্যক গ্রাহকের কাছে পৌঁছানোর জন্যই এমনটা করতে হচ্ছে।"
