জ্বালানি সংকটে চট্টগ্রামে সাগরে হাহাকার, বিপাকে জেলে ও ট্রলার মালিকরা
চট্টগ্রামে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটে বিপাকে পড়েছেন ফিশিং বোট মালিক ও জেলেরা। চাহিদা অনুযায়ী ডিজেল না পাওয়ায় ভরা মৌসুমেও অনেক ট্রলার সাগরে যেতে পারছে না। ফলে কর্ণফুলী নদীর বিভিন্ন ঘাট ও ফিশারি ঘাটে অলস পড়ে আছে শত শত ট্রলার। আর হাজারো জেলে কাটাচ্ছেন কর্মহীন সময়।
ফিলিং স্টেশন মালিক ও ডিলারেরা জানান, চাহিদার তুলনায় তারা অনেক কম জ্বালানি পাচ্ছেন। এক লাখ লিটার ডিজেলের চাহিদা থাকলেও সরবরাহ করা হচ্ছে মাত্র ৪০ হাজার লিটার বা তারও কম। অগ্রিম টাকা জমা দেওয়ার পরও প্রয়োজনীয় তেল মিলছে না।
তাদের ভাষ্য, রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা পেট্রলিয়াম থেকে কম সরবরাহ পাওয়াই এর মূল কারণ।
জ্বালানি-সংকটের কারণে অনেক ট্রলার ঘাটে বসে আছে। কিছু ট্রলার সমুদ্রে থাকলেও ফিরে এসে আবার সাগরে যেতে পারবে কি না, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। স্বাভাবিক সময়ে একটি ট্রলার ২৫ থেকে ২৮ দিন সাগরে থাকতে পারলেও বর্তমানে যে পরিমাণ তেল পাওয়া যাচ্ছে, তা দিয়ে ১০ থেকে ১২ দিনের বেশি থাকা সম্ভব হচ্ছে না। এতে খরচ ওঠানো কঠিন হয়ে পড়ছে। ফলে অনেক মালিক ট্রলার সাগরে পাঠাচ্ছেন না।
ট্রলার মালিকদের মতে, একটি ট্রলারে গড়ে ১ হাজার থেকে ২ হাজার লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়। বড় ট্রলারের ক্ষেত্রে এই চাহিদা ৩,৫০০ থেকে ৪,০০০ লিটার পর্যন্ত। কিন্তু এখন পর্যাপ্ত জ্বালানি না পাওয়ায় কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে বাজারে তেলের দামও বেড়েছে। সরকারি নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে কিনতে হলেও মিলছে না পর্যাপ্ত সরবরাহ।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম সামুদ্রিক মৎস্য আহরণকারী বোট মালিক সমিতির সভাপতি নুর হোসাইনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ক্যামেরার সামনে কথা বলতে চাননি। তবে তিনি বলেন, তেলের সংকট আছে, কিন্তু বেশি দাম দিলে জেলেরা তেল পাচ্ছেন।
জেলেরা বলছেন, তারা দিনমজুরের মতো আয় করেন। কয়েকদিন কাজ বন্ধ থাকলেই পরিবার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। অনেকের মাসিক কিস্তি রয়েছে। ফলে আয় বন্ধ থাকায় তারা আর্থিক সংকটে পড়ছেন। এক জেলে জানান, আগে একবার তেল নিয়ে গেলে প্রায় এক মাস সাগরে থাকতে পারতেন। এখন ১০ থেকে ১২ দিনের বেশি থাকা যাচ্ছে না। এতে লাভের বদলে লোকসান হচ্ছে।
এদিকে সামনে এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে শুরু হতে যাচ্ছে ৫৮ দিনের সামুদ্রিক মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা। মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণের জন্য প্রতিবছর বিভিন্ন সময়ে মোট প্রায় ১৪৮ দিন মাছ ধরা বন্ধ রাখতে হয়। ফলে বছরের সীমিত সময়েই জেলেরা আয় করতে পারেন। এর মধ্যেও যদি জ্বালানি-সংকটের কারণে মাছ ধরতে না পারেন, তাহলে তাদের জীবিকা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে।
রহিম মিয়া নামে এক মাঝি বলেন, "একদিকে জ্বালানির কারণে সাগরে যেতে পারতেছি না, অন্যদিকে সামনে নিষেধাজ্ঞা। আমরা পরিবার নিয়ে কীভাবে বাঁচব?"
সরকার অবশ্য বারবার দাবি করছে, দেশে জ্বালানির কোনো ঘাটতি নেই। তবে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বাস্তব চিত্র ভিন্ন। প্রশাসনের ভাষ্য, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী অবৈধভাবে মজুদ করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে।
এমন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালানো হচ্ছে। সম্প্রতি এক অভিযানে প্রায় ২৫ হাজার লিটার অবৈধ ডিজেল উদ্ধার করা হয়েছে। এ পর্যন্ত জেলায় প্রায় ৯৮টি অভিযান পরিচালনা করে কয়েক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে এবং করা হয়েছে একাধিক মামলা।
জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সতর্ক করা হয়েছে, কেউ কৃত্রিম সংকট তৈরি বা অতিরিক্ত মজুদ করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে তারা জানিয়েছে, দেশে পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুদ রয়েছে এবং নিয়মিত আমদানি কার্যক্রম চলমান।
চট্টগ্রাম বিভাগের মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, এই সংকট শুধু মৎস্য খাতেই নয়, অন্যান্য খাতেও প্রভাব ফেলছে। জ্বালানির অভাবে তাদের নিজস্ব কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে। তবে নিষেধাজ্ঞা চলাকালে জেলেদের জন্য সরকারি সহায়তা হিসেবে চাল, ডালসহ বিভিন্ন সুবিধা চালু রয়েছে বলেও তারা জানিয়েছেন।
সব মিলিয়ে জ্বালানি-সংকট, বাড়তি খরচ এবং সামনে দীর্ঘ নিষেধাজ্ঞা—এই তিন চাপের মধ্যে পড়ে চট্টগ্রামের জেলেরা চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন।
