তেলের ঘাটতির সতর্ক সংকেত, বিশ্ববাজারে জ্বলে উঠছে লাল বাতি
মাত্র ছয় সপ্তাহ আগেও বিশ্ব যেন অপরিশোধিত তেলে ভাসছিল। বাজারে সরবরাহ ছিল চাহিদার তুলনায় বেশি, আর দাম ছিল কম ও স্থিতিশীল। কিন্তু এখন জ্বালানি বাজারের কিছু অংশ এমন আচরণ করছে, যেন বিশ্ব তেলের তীব্র সংকটের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে।
এর প্রধান কারণ মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, যা ইতিহাসের সবচেয়ে বড় তেল সরবরাহ ব্যাঘাত সৃষ্টি করেছে। এর ফলে প্রতিদিন আনুমানিক ১ কোটি ২০ লাখ থেকে ১ কোটি ৫০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল বাজারে আসতে পারছে না।
এত বড় মাত্রার সরবরাহ ধাক্কা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়। জরুরি ভিত্তিতে তেল মজুত ছাড়া কিংবা ওপেক প্লাস জোটের উৎপাদন বাড়ানোর প্রতিশ্রুতিও এই ঘাটতি পূরণে যথেষ্ট নয়।
এখন জ্বালানি তেলের বিশ্ববাজারে লাল সতর্ক সংকেত জ্বলছে—বিশ্ব অর্থনীতিকে সচল রাখতে যে পরিমাণ তেলের প্রয়োজন, তার বাস্তব সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
লিপো অয়েল অ্যাসোসিয়েটসের সভাপতি অ্যান্ডি লিপো বলেন, "এই পরিস্থিতি যত দীর্ঘায়িত হবে, ততই ভয়ংকর হয়ে উঠবে। আজ হয়তো ঘাটতি নেই, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা দেখা দেবে।"
তিনি সতর্ক করে বলেন, "আমরা যদি বর্তমান পথে চলতে থাকি, তাহলে জ্বালানি ফুরিয়ে যাবে।"
বাজারের অস্বাভাবিক আচরণ
ফিউচার (ভবিষ্যৎ বা আগাম অনুমিত মূল্যে পরিচালিত) ও চলতি বা প্রকৃত তেলবাজার উভয়ই বড় ধরনের সতর্ক সংকেত দিচ্ছে।
এই মাসের শেষের ডেলিভারির চুক্তিগুলো পরবর্তী মাসগুলোর তুলনায় অনেক বেশি দামে লেনদেন হচ্ছে। এই পরিস্থিতিকে 'ব্যাকওয়ার্ডেশন' বলা হয়, যা ইঙ্গিত দেয় যে বাজার ভবিষ্যতে তেলের সরবরাহ ঝুঁকির মুখে পড়বে বলে মনে করছে।
সরবরাহ সংকটই যুক্তরাষ্ট্রের তেলের ফিউচার মূল্য এ বছর প্রায় দ্বিগুণ হওয়ার প্রধান কারণ। অথচ এখনও এপ্রিল মাস চলছে। অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড সূচক ব্রেন্টের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলারের ওপরে উঠে গেছে।
তবে বাস্তবে সরবরাহযোগ্য তেলের দাম আরও দ্রুত বাড়ছে—যা আরেকটি সতর্ক সংকেত। 'ডেটেড' ব্রেন্ট, যা চলতি বাজারে তেলের দাম পরিমাপ করে, গত সপ্তাহে ১৪১.২৬ ডলারে পৌঁছেছে—২০০৮ সালের পর যা সর্বোচ্চ।
ম্যাককোয়ারি গ্রুপের বৈশ্বিক জ্বালানি কৌশলবিদ বিকাশ দ্বিবেদী বলেন, "এটা যেন শেষ পানির বোতলের মতো—এর জন্য আপনি যেকোনো দাম দিতে প্রস্তুত। সরবরাহ সংকটের সময় চলতি তেলের মূল্য নির্ধারণ বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ার চেয়ে এক প্রকার শিল্পই বেশি বলা যায়।"
সংকটের আরেকটি লক্ষণ হিসেবে বিশ্বের বৃহত্তম তেল রপ্তানিকারক সৌদি আরব তাদের তেলের জন্য রেকর্ড পরিমাণ অতিরিক্ত মূল্য নিচ্ছে বলে জানা গেছে।
ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, এশিয়ার গ্রাহকদের কাছে আরব লাইট ক্রুডের বেঞ্চমার্কের তুলনায় ১৯.৫০ ডলার বেশি এবং ইউরোপে ব্রেন্টের তুলনায় সর্বোচ্চ ৩০ ডলার বেশি দামে তেল সরবরাহ করছে সৌদি আরব।
এই পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়ছে যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তাদের ওপরও। লিপোর হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় মার্কিনরা প্রতিদিন পেট্রল, জেট ফুয়েল ও অন্যান্য পরিবহন জ্বালানিতে প্রায় ৮৩০ মিলিয়ন ডলার বেশি খরচ করছে।
জেট ফুয়েলের দাম বাড়ছে, ফ্লাইট কমাচ্ছে এয়ারলাইনগুলো
তেলবাজারে বেশি নজর থাকলেও, পরিশোধিত জ্বালানি যেমন জেট ফুয়েল, ডিজেল ও পেট্রলের সম্ভাব্য ঘাটতি বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
গত এক মাসে জেট ফুয়েলের দাম দ্বিগুণ হয়েছে, কারণ অপরিশোধিত তেলের সংকট সরাসরি এর সরবরাহে প্রভাব ফেলছে। সাধারণত বিমানবন্দরগুলো কয়েক দিনের জ্বালানি মজুত রাখে, কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এয়ারলাইনগুলো নিজস্ব জ্বালানি মজুত বা হেজিং প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে।
লিপো বলেন, তিনি "জেট ফুয়েল (সরবরাহ) নিয়ে খুবই উদ্বিগ্ন।" তবে তিনি উল্লেখ করেন, জ্বালানি পুরোপুরি ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই এয়ারলাইনগুলো ফ্লাইট বাতিল শুরু করবে।
এই প্রবণতা ইতোমধ্যে দেখা যাচ্ছে। কিছু এয়ারলাইন তাদের সক্ষমতা কমাচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনাইটেড এয়ারলাইন আগামী ছয় মাসে তাদের ফ্লাইট সূচি ৫ শতাংশ কমানোর পরিকল্পনা করেছে। এমনকী গ্রীষ্মকালীন মৌসুম, সাধারণত যখন মার্কিনীদের ভ্রমণের চাপ বেশি থাকে–সেই সময়ের ফ্লাইট শিডিউল কমিয়েছে।
অন্যান্য এয়ারলাইনগুলো ইতোমধ্যে টিকিটের দাম বাড়ানো এবং ব্যাগেজ ফি পুনরায় চালু করেছে। ব্লুমবার্গের তথ্য অনুযায়ী, ইতালির কিছু বিমানবন্দরে জ্বালানি ব্যবহারে সীমাবদ্ধতাও আরোপ করা হয়েছে।
রেশনিং ও রপ্তানি সীমিতকরণ
ইরান যুদ্ধ যদি চলতে থাকে, আর তার জেরে হরমুজ প্রণালি আরও ছয় থেকে আট সপ্তাহ বন্ধ থাকে—তাহলে ডিজেলের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। এমনকি গ্রীষ্মকালীন মৌসুমে পেট্রলের সংকটও তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন দ্বিবেদী।
এই সমস্যাগুলো সহজে সমাধান হবার নয়। অপরিশোধিত তেল বিকল্প পথে পরিবহন করা গেলেও জেট ফুয়েল, ডিজেল ও পেট্রল সাধারণত পাইপলাইনের মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব ও পশ্চিম উপকূল সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে, কারণ এই অঞ্চলগুলো নিজস্ব চাহিদা মেটাতে আংশিকভাবে আমদানির ওপরই নির্ভর করে।
তেল বাজারের স্বাধীন বিশ্লেষক টম ক্লোজা বলেন, " যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূলের বাজার যেকোনো মুহূর্তে বিশৃঙ্খল হয়ে উঠতে পারে।"
সংকটের আশঙ্কায় কিছু দেশ ইতোমধ্যে সরবরাহ ও চাহিদার ব্যবধান কমাতে নানা সীমাবদ্ধতা আরোপ শুরু করেছে।
সরবরাহের দিক থেকে চীন, থাইল্যান্ড, পাকিস্তান ও দক্ষিণ কোরিয়া রপ্তানি সীমিত করেছে। আর রাশিয়া পেট্রল রপ্তানি বন্ধ করেছে।
অন্যদিকে চাহিদা নিয়ন্ত্রণে এশিয়ার কিছু দেশ, যেমন মিয়ানমার ও বাংলাদেশ জ্বালানি রেশনিং শুরু করেছে। যদিও বাংলাদেশে সরকার তা কিছুদিনের মধ্যেই প্রত্যাহার করে, তবু ফিলিং স্টেশনগুলোতে জ্বালানির সংকট চলমান আছে।
জ্বালানি রেশনিং এর মতো পদক্ষেপের মূল্যও দিতে হয়—কারণ, এতে স্থানীয় অর্থনীতির গতি মন্থর হয়ে পড়ে।
বিশ্বের বৃহত্তম তেল উৎপাদক ও প্রধান পরিশোধনকারী দেশ যুক্তরাষ্ট্র অন্যদের তুলনায় কিছুটা সুরক্ষিত অবস্থানে থাকলেও, বৈশ্বিক সরবরাহ সংকটের প্রভাব থেকে পুরোপুরি মুক্ত নয়।
ক্লোজা বলেন, "এটা যেন একটি জাহাজের গায়ে বড় একটি ছিদ্র তৈরি হয়েছে। সমস্যা শুরু হয়েছে এশিয়ায়, তারপর আফ্রিকা ও ইউরোপে ছড়িয়েছে। একসময় তা যুক্তরাষ্ট্রেও পৌঁছাবে।"
