ভারী বৃষ্টিপাত ও আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা: হুমকির মুখে হাওরের বোরো ফসল
সাম্প্রতিক দিনগুলোর ভারী বৃষ্টিপাত এবং আগামী সপ্তাহেও বৃষ্টি অব্যাহত থাকার পূর্বাভাসে সিলেটের হাওর অঞ্চলে আকস্মিক পাহাড়ি ঢলের শঙ্কায় রয়েছেন হাওড়ের কৃষকরা। এটি দেশের বোরো ফসলের জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সুনামগঞ্জ, সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া—এই সাতটি হাওর জেলায় বাংলাদেশের মোট উৎপাদনের ২০ শতাংশ বোরো চাষ হয়। এ বছর কৃষকরা প্রায় ৯ লাখ ৬৩ হাজার ০০০ হেক্টর জমিতে ধান চাষ করেছেন, কিন্তু ফসলগুলো এখনও ফুল আসার পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
আবহাওয়াবিদরা জানিয়েছেন, গত চার দিনে সিলেট অঞ্চলে ইতোমধ্যে প্রায় ২০০ মিমি বৃষ্টিপাত হয়েছে এবং ২৩ মার্চের মধ্যে আরও ২০০-৩০০ মিমি বৃষ্টিপাত হতে পারে। মার্চের জন্য এমন আগাম ও তীব্র বৃষ্টিপাত অস্বাভাবিক, যা আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। ভারতের মেঘালয় ও আসাম থেকে আসা পাহাড়ি ঢল হাওর অববাহিকায় প্রতিবছরই এ ধরনের হুমকি সৃষ্টি করে।
কানাডার সাসকাচোয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়া ও জলবায়ু বিভাগের পিএইচডি গবেষক ও আবহাওয়াবিদ মোস্তফা কামাল পলাশ বলেন, পশ্চিমা লঘুচাপের কারণে সৃষ্ট ভারী বৃষ্টিপাত ২৩ মার্চ পর্যন্ত প্রায় প্রতিদিনই অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের (এফএফডব্লিউসি) মতে, সুরমা-কুশিয়ারা এবং ধনু-বাউলাই নদীর পানি বাড়ছে, যদিও তা এখনও বিপৎসীমার নিচে রয়েছে। তারা আরও জানায়, আগামী কয়েক দিন হাওর অববাহিকায় আরও বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে।
বন্যা পূর্বাভাস সংস্থা জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় সিলেটের লালাখালে ১০৬ মিমি, জাফলংয়ে ৭৪ মিমি এবং শ্রীমঙ্গলে ৫৪ মিমি বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসাম ও মেঘালয়ে যথাক্রমে ৭২ মিমি এবং ৭০.৮ মিমি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
এফএফডব্লিউসি-র নির্বাহী প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হান বলেন, আগামী ২৪-৪৮ ঘণ্টার মধ্যে নদীর পানি কিছুটা বাড়তে পারে তবে তা বিপৎসীমার নিচেই থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে, যা ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি দিচ্ছে।
ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণের কাজ শেষ করতে দেরি হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়েছে। এই বাঁধগুলোর কাজ ফেব্রুয়ারির মধ্যে শেষ করার কথা ছিল। সময়সীমা বাড়ানোর পরেও অনেক এলাকায় কাজ অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে, যা ২০১৭ এবং ২০২২ সালের বিধ্বংসী বন্যার পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা জাগিয়ে তুলেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও আন্দোলনকারীরা বাঁধ নির্মাণে অবহেলা ও অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন। মাটির কাজ বেশিরভাগ শেষ হলেও দুরমুজ, স্লোপ কমপেকশন ও ঘাস লাগানোর কাজ অনেক জায়গায় বাকি আছে। বৃষ্টি শুরু হয়ে যাওয়ায় এখন অবশিষ্ট কাজের প্রভাব খুব একটা কাজে নাও আসতে পারে।
কৃষকরা বলছেন, অসম্পূর্ণ বাঁধ তাদের অরক্ষিত করে ফেলেছে। দেখার হাওরের কৃষক সুলতান মিয়া বলেন, 'কাজ শেষ হওয়ার আগেই বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। যদি আগাম বন্যা আসে, তবে সবকিছু শেষ হয়ে যাবে।'
হাওর বাঁচাও আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক বিজন সেন রায় বলেন, 'বাঁধ নির্মাণে প্রতি বছরই দেরি হয়, এ বছরও তার ব্যতিক্রম নয়। অবহেলার কারণে যদি ফসল তলিয়ে যায়, তবে আমরা কৃষকদের নিয়ে প্রতিবাদ গড়ে তুলব এবং আইনি ব্যবস্থাও নেব।'
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বিডব্লিউডিবি) জানায়, ৭১৮টি প্রকল্প কমিটির মাধ্যমে ৫৩টি হাওরে প্রায় ৬০২ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণের জন্য ১৪৮ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। গত বছরের তুলনায় বাঁধের দৈর্ঘ্য ১১ কিমি বাড়লেও প্রকল্পের সংখ্যা ২৫টি কমেছে, তবে খরচ বেড়েছে ২০ কোটি টাকা।
পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার দাবি করেন, নির্বাচনের কারণে কিছুটা দেরি হলেও বর্ধিত সময়ের মধ্যেই সব কাজ শেষ হয়েছে। কোনো ত্রুটি আছে কি না তা তারা খতিয়ে দেখবেন বলেও তিনি জানান।
সাধারণত মার্চ-এপ্রিল মাসে হাওর অঞ্চলে আকস্মিক বন্যা আঘাত হানে এবং ফসল ও জীবিকার ক্ষতি করে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, বাঁধ নির্মাণে বিলম্ব এবং অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের ধরন কৃষকদের বারবার ক্ষতির মুখে ফেলছে।
