হরমুজ প্রণালি অচল করে দিতে পারে ইরানের খুদে সাবমেরিন বহর
এ-১০ থান্ডারবোল্ট যুদ্ধবিমানগুলো নিচু দিয়ে উড়ে হরমুজ প্রণালির ওপর দিয়ে ছুটে চলা ইরানি স্পিডবোটগুলোকে লক্ষ্য করে অভিযান চালায়।
এর সঙ্গে যোগ দেয় এএইচ-৬৪ অ্যাপাছে হেলিকপ্টার, আর যুক্তরাষ্ট্রের দাবি অনুযায়ী, হরমুজতীরে দক্ষিণ ইরানের ভূগর্ভস্থ অস্ত্র স্থাপনাগুলোতে ৫ হাজার পাউন্ড ওজনের বোমা হামলা চালানো হয়।
এই অভিযানের লক্ষ্য ছিল ইরানের দ্রুতগামী নৌযান ও ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি ধ্বংস করা—যেগুলো এই প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী তেলবাহী জাহাজগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছিল—এবং এর মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ আবার চালু করা ও বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট নিরসন করা।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, জাহাজ চলাচলের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি এমন এক শক্তি, যা মার্কিন যুদ্ধবিমান সহজে শনাক্ত বা লক্ষ্যবস্তু করতে পারে না। সেটা হচ্ছে, পারস্য উপসাগরের অগভীর ও ঘোলা পানির জন্য বিশেষভাবে তৈরি ইরানের ছোট আকারের সাবমেরিনের বহর।
ইরানের কাছে সর্বোচ্চ ১০টি ঘাদির শ্রেণির সাবমেরিন রয়েছে, যেগুলোর ওজন প্রায় ১২০ টন এবং দৈর্ঘ্য ২৯ মিটার—যা প্রচলিত অ্যাটাক সাবমেরিনের আকারের প্রায় দশ ভাগের এক ভাগ।
এর বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের ওহিও শ্রেণির পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিনের ওজন প্রায় ১৮ হাজার ৭৫০ টন এবং দৈর্ঘ্য ১৭০ মিটার।
আর এই ক্ষুদ্র আকারের কারণে ঘাদির শ্রেণির সাবমেরিনগুলো ৩০ মিটার গভীর পানিতেও কার্যকরভাবে চলতে পারে—যা হরমুজ প্রণালির গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের গড় গভীরতা। এত অগভীর পানিতে অবস্থান করে শত্রুর শনাক্তকরণ ব্যবস্থাও এড়াতে পারে এসব সাবমেরিন।
তার সঙ্গে হরমুজ প্রণালির পরিবেশ—অগভীর পানি, তেল উত্তোলনের জন্য ড্রিলিং ও জাহাজ চলাচলের উচ্চ শব্দ—মার্কিন বাহিনীর জন্য এসব সাবমেরিনকে সোনার দিয়ে শনাক্ত ও ধ্বংস করা কঠিন করে তোলে।
এই সাবমেরিনগুলো হুত নামের টর্পেডো নিক্ষেপ করতে পারে, যা ইরানের দাবি অনুযায়ী, সুপারক্যাভিটেটিং প্রযুক্তির সাহায্যে পানির নিচে ঘণ্টায় প্রায় ২২০ মাইল গতিতে ছুটে গিয়ে লক্ষ্যে আঘাত হানে।
বিশ্লেষকদের মতে, একটি ঘাদির শ্রেণির সাবমেরিন রাতের অন্ধকারে ডজনখানেক মাইনও স্থাপন করতে পারে।
গত চার দশক ধরে পারস্য উপসাগরের ভৌগোলিক ও পরিবেশগত বৈশিষ্ট্য নিয়ে গবেষণা করেছে ইরান এবং তাদের সাবমেরিন ক্রুদের এই জলসীমাতেই প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
এই ভৌগোলিক সুবিধা ও বিশেষভাবে তৈরি সাবমেরিন ব্যবহার করে ইরান বিশ্ব অর্থনীতিকে কার্যত জিম্মি করতে এবং জাহাজ চলাচলের পথে 'চোকপয়েন্ট' তৈরি করতে পারে।
অবশ্য ঘাদির শ্রেণির সাবমেরিনই ইরানের একমাত্র শক্তি নয়।
ইরানের ই-ঘাবাসি ও আল-সাবেহাত হলো ডুবুরিদের পরিবহনকারী নৌযান, যা বিশেষ অভিযান ও গোপনে মাইন পাতার কাজে নৌকমান্ডোরা ব্যবহার করতে পারেন। আবার এগুলোকে বিস্ফোরক বহনকারী আত্মঘাতী নৌযান হিসেবেও ব্যবহার করা সম্ভব।
এ ছাড়া প্রায় ৬০০ টন ওজনের ফতেহ শ্রেণির সাবমেরিন উন্নত সেন্সর ও টর্পেডো বহনে সক্ষম। এগুলো তুলনামূলক গভীর পানিতে কাজ করতে পারে। আবার উপকূলের কাছাকাছি জলসীমাতেও চলাচল করতে পারে।
ইরানের পুরোনো সাবমেরিনের মধ্যে রয়েছে নাহাং শ্রেণির সাবমেরিন এবং রাশিয়া থেকে কেনা কিলো শ্রেণির সাবমেরিন সাবমেরিন, যেগুলোর নাম তারেঘ, ইউনূস ও নূহ।
এই কিলো শ্রেণির সাবমেরিনগুলো ইরানের নিজের তৈরি সাবমেরিনগুলোর চেয়ে বড়, প্রায় ৩,০০০ টন। ফলে পারস্য উপসাগরের অগভীর উত্তর অংশে কার্যকরভাবে অপারেশন পরিচালনা করতে পারে না।
ইরানের নতুন বেসাত শ্রেণির সাবমেরিন সম্পর্কেও তথ্য সীমিত, তবে এটিকে আধা-ভারী সাবমেরিন হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
এসব সাবমেরিন টর্পেডো ও নৌ-মাইন বহনে সক্ষম। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের মূল লক্ষ্য মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ডুবানো নয়; বরং গোপনে মাইন পেতে নৌপথ বন্ধ করে দেওয়া—যা পরিষ্কার করতে কয়েক সপ্তাহ লাগতে পারে।
ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) নৌবাহিনীর কাছে শত শত দ্রুতগতির আক্রমণাত্মক নৌযান রয়েছে, যা সংকীর্ণ জলপথে 'ঝাঁক' বেঁধে আক্রমণের কৌশলে ব্যবহার করা হয়।
জুলফাগার শ্রেণির নৌযান এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উন্নত, যা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও বহন করতে পারে।
এ ছাড়া ছোট ছোট অস্ত্রসজ্জিত স্পিডবোট রয়েছে, যেগুলো ইরানের দীর্ঘ উপকূলজুড়ে ছোট বন্দর ও খাঁড়ি থেকে পরিচালনা করা যায়।
বাভার-২ একটি ভিন্নধর্মী "ফ্লাইং বোট", যা পানির ওপর ভেসে উঠে গতি বাড়াতে পারে।
ইরান সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রিমোট-নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরকবাহী নৌযানও প্রদর্শন করেছে, যেগুলো উপকূলীয় এলাকায় আগে থেকেই মোতায়েন করে প্রয়োজন অনুযায়ী সক্রিয় করা যায়।
যদিও মার্কিন বিমান হামলায় কিছু আইআরজিসি নৌঘাঁটি ধ্বংস হয়েছে, এসব ছোট নৌযান সহজে লুকানো যায়, ফলে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করা প্রায় অসম্ভব।
স্পিডবোটের চেয়েও ইরানের ট্রাকে পরিবহন করা জাহাজ-বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রগুলো দীর্ঘমেয়াদে আরও বড় হুমকি, কারণ এগুলো আকাশ থেকে সহজে শনাক্ত করা যায় না।
