ঋণ খেলাপির ঝুঁকি এড়াতে পটুয়াখালী বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ১,৭৪৪ কোটি টাকা চায় বিদ্যুৎ বিভাগ
পটুয়াখালীর কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের ঋণের প্রথম কিস্তি পরিশোধের জন্য ভর্তুকি হিসেবে ১,৭৪৪ কোটি টাকা ছাড় করতে অর্থ বিভাগের কাছে অনুরোধ জানিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। সতর্ক করে বলা হয়েছে, নির্ধারিত সময়ে অর্থের ব্যবস্থা না হলে সার্বভৌম গ্যারান্টর (সভেরিন গ্যারান্টর) হিসেবে সরকারের খেলাপি হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
গতকাল (১০ মার্চ) পাঠানো এক চিঠিতে বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে, বিদ্যুৎকেন্দ্রটির ঋণের প্রথম কিস্তি হিসেবে ১৪ কোটি ৩০ লাখ ডলার পরিশোধ করতে হবে, যার সময়সীমা আগামী ২৭ মার্চ।
অর্থ বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, "এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদ্যুতের ইউনিট প্রতি মূল্য সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে অনুমোদন না থাকায় ভর্তুকির অর্থ ছাড় করা হয়নি। বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকানাধীন কোম্পানি নিজস্ব তহবিল থেকে ঋণের কিস্তির অর্থের ব্যবস্থা করতে না পারলে সরকার ভর্তুকির বাইরে অন্য উৎস থেকে অর্থ দেওয়ার ব্যবস্থা করবে। কারণ বাংলাদেশ এখনও পর্যন্ত কোনো ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ বা খেলাপি হয়নি। এক্ষেত্রেও সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখা হবে।"
তিনি আরও বলেন, "মাত্রই বিদ্যুৎ বিভাগ চিঠি পাঠিয়েছে। তাদের প্রস্তাব পর্যালোচনা করে আলোচনার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।"
পটুয়াখালীর পায়রা বন্দরের কাছে বাংলাদেশের রুরাল পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড (আরপিসিএল) এবং চীনের নরিনকো ইন্টারন্যাশনাল কোঅপরেশন লিমিটেড–এর যৌথ উদ্যোগে এই বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। ১,৩২০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতার কয়লাভিত্তিক এই কেন্দ্রটি আরপিসিএল-নরিনকো ইন্টারন্যাশনাল পাওয়ার লিমিটেড (আরএনপিএল) নামের কোম্পানির অধীনে পরিচালিত হয়। আরএনপিএলে বাংলাদেশের আরপিসিএল ও চীনের নরিনকো ইন্টারন্যাশনালের মালিকানা সমান, অর্থাৎ ৫০:৫০।
বিদ্যুৎ বিভাগের চিঠির সূত্রে জানা গেছে, বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ৭০:৩০ ঋণ-ইক্যুইটি অনুপাতে মোট ২,৫৩৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ে বাস্তবায়িত হয়েছে। মোট প্রকল্প ব্যয়ের ৩০ শতাংশ ইক্যুইটি হিসেবে কোম্পানির অংশীদার আরপিসিএল ও নরিনকো সমানভাবে দিয়েছে। বাকি ৭০ শতাংশ অর্থ চীনের এক্সিম ব্যাংকের একটি সিন্ডিকেট থেকে ঋণ হিসেবে নেওয়া হয়েছে।
ঋণটি সরকারের নন-কনসেশনাল লোনবিষয়ক স্থায়ী কমিটি অনুমোদন করেছে এবং আরপিসিএলের অংশের ৫০ শতাংশ ঋণের বিপরীতে অর্থ বিভাগ সভেরিন গ্যারান্টি দিয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুটি ইউনিট থেকে মোট ১,৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে। প্রথম ইউনিট জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করে ২০২৫ সালের ১৯ জানুয়ারি। দ্বিতীয় ইউনিট একই বছরের ৯ এপ্রিল থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করে। বিদ্যুৎকেন্দ্রটির ইনিশিয়াল অপারেশন ডেট (আইওডি) ধরা হয়েছে ২০২৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর।
বিদ্যুৎ বিভাগের চিঠিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড ও এই কেন্দ্রের মধ্যে ২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি পাওয়ার পারচেজ এগ্রিমেন্ট স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তিতে বিদ্যুতের ইউনিট মূল্য উল্লেখ না থাকলেও কস্ট বেজস বা ব্যয়ভিত্তিক ট্যারিফ বিবেচনায় বিদ্যুৎ কেনার কথা বলা হয়েছে এবং একটি ট্যারিফ ফর্মুলাও নির্ধারণ করা হয়েছে।
পাওয়ার পারচেজ এগ্রিমেন্ট অনুযায়ী, কমার্শিয়াল অপারেশন ডেট (সিওডি) নির্ধারণের আগ পর্যন্ত কোম্পানির দাখিল করা প্রভিশনাল বিল পরিশোধ করা যাবে। বিদ্যুৎকেন্দ্রের সিওডি নির্ধারিত হওয়ার পর চুক্তিতে উল্লেখিত ফর্মুলা অনুযায়ী ট্যারিফ নির্ধারণ করে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদন নেওয়া হবে।
জানা গেছে, গত জানুয়ারি পর্যন্ত আরএনপিএল বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের কাছে ২,৯৪৭ কোটি টাকার বিল দাখিল করেছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, "ঋণের কিস্তি পরিশোধ ও প্রয়োজনীয় কয়লা আমদানি—উভয় কারণেই অর্থের প্রয়োজন। কিন্তু বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড টাকা ছাড় করছে না। আবার সরকার থেকে যে ভর্তুকি পাওয়ার কথা সেটিও পাওয়া যাচ্ছে না। এর ফলে এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালু রাখা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।"
যদিও আরএনপিএলের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিদ্যুৎ কোম্পানির কাছে ঋণের কিস্তি পরিশোধসহ অন্যান্য ব্যয় মেটানোর মতো প্রয়োজনীয় অর্থ রয়েছে। তবে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড থেকে বিদ্যুতের বিল পাওয়া এবং সরকার থেকে ভর্তুকির অর্থ ছাড়ের জন্য চীনা অংশীদাররা চাপ দিচ্ছে।
