পিডিবির ৬০% বকেয়া পরিশোধ না করলে রমজান-গ্রীষ্মে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের আশঙ্কা বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদকদের
সরকার যদি অবিলম্বে দীর্ঘদিনের বকেয়া বিদ্যুৎ বিলের একটি বড় অংশ পরিশোধ না করে, তাহলে রমজান ও আসন্ন গ্রীষ্মে দেশে ব্যাপক লোডশেডিং দেখা দিতে পারে—এমন সতর্কবার্তা দিয়েছেন স্বাধীন বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীরা (আইপিপি)।
রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ইন্ডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিপ্পা) নেতারা জানান, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) কাছে তাদের বকেয়া পাওনা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা। এসব বিল আট থেকে ১০ মাস ধরে পরিশোধ করা হয়নি।
স্থানীয় ও যৌথ উদ্যোগের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বকেয়া বিল মিলিয়ে মোট অঙ্ক ২৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে জানান তারা।
বিপ্পার সভাপতি ডেভিড হাসনাত বলেন, 'বকেয়া বিলের অন্তত ৬০ শতাংশ যদি এখনই পরিশোধ না করা হয়, তাহলে বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু রাখা অসম্ভব হয়ে পড়বে।'
তিনি বলেন, 'এর ফলে রমজান ও গ্রীষ্মের সর্বোচ্চ চাহিদার সময়ে ভয়াবহ ও ব্যাপক লোডশেডিং দেখা দেবে।'
সংবাদ সম্মেলনে বিপ্পার শীর্ষ নেতাদের পাশাপাশি জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী ভারী জ্বালানি তেলভিত্তিক বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
ডেভিড হাসনাত বলেন, 'আট থেকে ১০ মাস টাকা না পেয়ে কোনো ব্যবসাই টিকে থাকতে পারে না।' তিনি বলেন, দীর্ঘদিন বিল পরিশোধে দেরির কারণে অনেক স্থানীয় বিদ্যুৎ উৎপাদক ইতোমধ্যেই চরম সংকটে পড়েছেন।
বিপ্পার সভাপতি বলেন, 'এই পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু রাখা একেবারেই সম্ভব নয়। টাকা না পাওয়ায় যদি কেন্দ্র বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে এর দায় আমাদের ওপর এক শতাংশও চাপানো যাবে না।'
বিপ্পার তথ্য অনুযায়ী, এই অর্থসংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদকরা ইতোমধ্যে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার ক্ষতির মুখে পড়েছেন। মূলত মুদ্রার দরপতন ও বাড়তি ব্যাংক সুদের বোঝার কারণেই এই ক্ষতি হয়েছে।
হাসনাত বলেন, 'আমাদের ঋণের খরচ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। জ্বালানি আমদানি, ঋণ পরিশোধ, এলসি খোলা—সব ক্ষেত্রেই চাপ বেড়েছে।'
বকেয়া পরিশোধ না করেই এলডি আরোপ, তীব্র ক্ষোভ
বকেয়া বিল পরিশোধ না করেও অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিভ্রাটের অভিযোগে উৎপাদকদের ওপর 'লিকুইডেটেড ড্যামেজেস' (এলডি) আরোপ করায় পিডিবির তীব্র সমালোচনা করেন বিপ্পার নেতারা।
হাসনাত বলেন, 'এই বৈপরীত্যই সবচেয়ে উদ্বেগজনক। একদিকে পিডিবি মাসের পর মাস আমাদের টাকা দিতে পারছে না, অন্যদিকে আমাদের বিল থেকে এলডি কেটে নিচ্ছে। এটি কোনোভাবেই যুক্তিসংগত বা ন্যায্য নয়।'
বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির (পিপিএ) ১৩.২(১) ধারা অনুযায়ী, বিল জমা দেওয়ার ৪০ দিনের মধ্যে পিডিবির বিল পরিশোধ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদকদের দাবি, দীর্ঘদিন বিল পরিশোধ না হলে বিদ্যুৎ সরবরাহের দায় স্থগিত হওয়ার কথা থাকলেও তারা জাতীয় স্বার্থে বিদ্যুৎ উৎপাদন চালিয়ে গেছেন।
বিপ্পার অভিযোগ, এলডি-সংক্রান্ত বিধানগুলো বৈষম্যমূলকভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে। স্থানীয় উদ্যোক্তাদের লক্ষ্য করে শাস্তি দেওয়া হলেও বিদেশি ও যৌথ উদ্যোগের উৎপাদকদের ক্ষেত্রে ভিন্ন আচরণ করা হচ্ছে।
হাসনাত বলেন, 'বিদ্যুৎ খাতে কার্যত দুটি ব্যবস্থা চালু আছে। স্থানীয় উদ্যোক্তারা শাস্তির মুখে পড়ছেন, আর যৌথ উদ্যোগ ও বিদেশি আইপিপিরা নিয়মিত অর্থ পাচ্ছে।'
বিইআরসি-তে সালিশি আবেদন এবং 'স্থিতাবস্থা' লঙ্ঘন
এর আগে ভারী জ্বালানি তেলভিত্তিক প্রায় ৩০টি বিদ্যুৎকেন্দ্র এলডি কর্তনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে (বিইআরসি) সালিশি আবেদন করেছিল।
বিপ্পা জানায়, ২০২৬ সালের ৮ জানুয়ারি বিইআরসি আবেদনগুলো খারিজ করে দিয়ে পিডিবির সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির পরামর্শ দেয়।
বিপ্পার সাবেক সভাপতি ইমরান করিম বলেন, সালিশি প্রক্রিয়া চলাকালে এলডি হিসাব ও কর্তনের বিষয়ে সব পক্ষকে 'স্ট্যাটাস কো' বা স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে নির্দেশ দিয়েছিল বিইআরসি।
ইমরান করিম বলেন, 'স্পষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও পিডিবি কিছু বিদ্যুৎ উৎপাদকের পাওনা থেকে বেআইনিভাবে এলডি কেটে নিয়েছে। এতে পুরো খাতে নতুন করে অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।'
তিনি সতর্ক করে বলেন, রমজান ও সেচ মৌসুমের আগে এ ধরনের অস্থিরতা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
ইমরান করিম বলেন, 'এই পরিস্থিতির কারণে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতা, ঋণ খেলাপি হওয়ার ঝুঁকি, ব্যাংক খাতে চাপ এবং জ্বালানি আমদানির সক্ষমতা কমে যাচ্ছে।'
'একই পিপিএ, ভিন্ন আচরণ'
স্পষ্ট অসঙ্গতির উদাহরণ হিসেবে ইমরান করিম বরিশাল ইলেকট্রিক পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের কথা উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, 'শুরুতে পিডিবি বরিশাল ইলেকট্রিকের ক্যাপাসিটি পেমেন্ট থেকে এলডি কেটে নেয়।'
'পরে আইনি মতামত ও মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের ভিত্তিতে ২০২৫ সালের ২১ মে সেই অর্থ ফেরত দেওয়া হয়,' বলেন তিনি।
ইমরান করিম বলেন, 'একই পিপিএ থাকার পরও একটি কোম্পানি টাকা ফেরত পেল, অন্যরা এখনও কর্তনের শিকার। আইনের চোখে কি এটি সমান আচরণ?'
বিদেশি বনাম স্থানীয় উৎপাদক
বিপ্পার নেতারা বলেন, বিদেশি ও দেশীয় বিদ্যুৎ উৎপাদকদের সঙ্গে পিডিবির আচরণে দ্বৈত বাস্তবতা স্পষ্ট।
ইমরান করিম বলেন, দীর্ঘদিন অর্থ না পাওয়ায় আদানি পাওয়ার বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ কমিয়েছে। এ ক্ষেত্রে কোনো এলডি আরোপ করা হয়নি।
হাসনাত বলেন, 'বিদেশি কোম্পানিগুলো টাকা না পেলে বিদ্যুৎ সরবরাহ কমায়, আর চুক্তিগত কারণে পিডিবি তাদের ওপর এলডি আরোপ করতে পারে না।'
তিনি বলেন, 'অন্যদিকে স্থানীয় উৎপাদকরা বিপুল ক্ষতির মধ্যেও বিদ্যুৎ সরবরাহ চালিয়ে যান, অথচ শাস্তি পাচ্ছেন।'
তিনি প্রশ্ন করেন, 'রমজান, গ্রীষ্ম ও সেচ মৌসুমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করাটাই কি অপরাধ?'
রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও প্রতিহিংসার শঙ্কা
হাসনাত বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার ঠিক আগে এলডি আরোপ নতুন সরকারের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়াতে পারে।
তিনি প্রশ্ন করেন, 'যদি সুন্দর ব্যবস্থা রেখে যাওয়ার উদ্দেশ্য থাকত, তাহলে মেয়াদের একেবারে শেষে এসে এলডি আরোপ করা হলো কেন?'
তিনি বলেন, 'এতে আইপিপি ও পরবর্তী সরকারের মধ্যে শুধু সংঘাতই তৈরি হবে।'
বিদ্যুৎ উৎপাদকদের মধ্যে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা বাড়ছে বলেও জানান তিনি।
হাসনাত বলেন, 'একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যে সব আইপিপিই আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত।'
তিনি বলেন, 'আমরা আমাদের ন্যায্য দাবিগুলো তুললে আমাদের সমস্যাসৃষ্টিকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হতে পারে—এই আশঙ্কা রয়েছে।'
জাতীয় পর্যালোচনা কমিটির মতে, শেখ হাসিনা সরকারের আমলে করা বহু বিদ্যুৎ চুক্তির ভিত্তি ছিল স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতি।
এই পর্যবেক্ষণের জবাবে ডেভিড হাসনাত বলেন, সব আইপিপি মালিক নিষ্পাপ নন, কিছু চুক্তি সত্যিই অন্যায্য ছিল।
তিনি বলেন, 'সরকারকে সেই চুক্তিগুলো চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে। বিপ্পা পূর্ণ সহযোগিতা করবে। তবে পুরো খাতকে দুর্নীতিগ্রস্ত বলা অন্যায়।'
তিনি জানিয়েছেন, সরকার উদ্যোগ নিলে পিপিএর কাঠামোর মধ্যেই চুক্তি পুনরায় আলোচনার জন্য আইপিপিরা প্রস্তুত আছে।
