জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই দিনব্যাপী হিম উৎসব উদযাপিত
'জ্বলে যাক, পুড়ে যাক শোষকের দল; শোধনের শিখা বেড়ে হোক দাবানল'—এই স্লোগান সামনে রেখে প্রতিবছরের মতো এবারও উদযাপিত হলো দুই দিনব্যাপী হিম উৎসব।
৫ ও ৬ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত এই উৎসবে আলোকচিত্র প্রদর্শনী, আর্ট ক্যাম্প, পুতুলনাচ, নৃত্যানুষ্ঠান, পঞ্চরস যাত্রাপালা, হিমশিম (শৈশবের খেলা), আগুন খেলা এবং পালা গানের আসর পরিবেশন করা হয়।
প্রতিবছর 'পরম্পরায় আমরা' ওপেন প্লাটফর্ম থেকে গণ-অর্থায়নে হিম উৎসব আয়োজন করা হয়। এই উৎসবের প্রস্তুতি চলে টানা দুই মাস, কখনো কখনো তারও বেশি সময় ধরে। অর্থ সংগ্রহের ক্ষেত্রেও শিক্ষার্থীরা নেয় নান্দনিক ও বুদ্ধিদীপ্ত নানা উদ্যোগ। নিজেদের নকশায় তৈরি ব্যাজ, বুকমার্ক ও ক্যালেন্ডার নামমাত্র শুভেচ্ছা মূল্যে দেওয়া হয়।
আয়োজকদের মতে, "দমবন্ধ করা সময়ের ভেতর দিয়ে আমরা আরেকটি শীত পার করছি। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্র—সবখানেই—প্রশ্ন করার ভাষা সংকুচিত করার প্রক্রিয়া চলছে। এছাড়াও ভিন্নমত দমনের চেষ্টা হয়ে উঠছে নিত্যদিনের বাস্তবতা। ক্যাম্পাস এখন আর কেবল শেখার জায়গা নয়; এটি এক নিয়ন্ত্রিত পরিসরে পরিণত হচ্ছে, যেখানে এমনকি গান, কবিতা, চিত্রকলা প্রায়শই 'অপ্রয়োজনীয়' হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। এই সময়ে সংস্কৃতি আর কেবল বিনোদন নয়; হয়ে ওঠে টিকে থাকার কৌশল এবং প্রতিরোধের মাধ্যম। এই বাস্তবতায় "পরম্পরায় আমরা" হিম উৎসব ১৪৩২ আয়োজন করছে, যেখানে শিল্পচর্চা মিলিত হবে শোষণ ও ভয়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামে।"
নতুন শিল্পীদের জন্য উন্মুক্ত প্লাটফর্ম
হিম উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ থাকে শিক্ষার্থীদের তৈরি শিল্পকর্ম। পৌষ-মাঘ মাসের প্রচণ্ড শীতে, কুয়াশাচ্ছন্ন হিমশীতল হাওয়ায় যখন ক্যাম্পাসজুড়ে দুলতে থাকে শিক্ষার্থীদের তৈরি 'হিম উৎসব আসছে' লেখা নানা আকর্ষণীয় ব্যানার, তখন উৎসবের উদযাপন পায় ভিন্ন মাত্রা।
অষ্টম হিম উৎসবেও নান্দনিকভাবে আয়োজন করা হয় চিত্র প্রদর্শনী ও আর্ট ক্যাম্প। ৫ ও ৬ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছবি চত্বরে চলে চিত্র প্রদর্শনী 'Rawটরিক', আর সপ্তম ছায়ামঞ্চে প্রদর্শিত হয় 'দহনকাল' (আর্ট ক্যাম্প)।
শিল্পই যেখানে প্রতিরোধের হাতিয়ার
প্রতিবছরের মতো এবারও হিম উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ হিসেবে ছিল পালা গানের আসর। এ ছাড়া আয়োজন করা হয় পাপেট শো, পালা গান ও বাউল গানের অনুষ্ঠান। পালা গানের পাশাপাশি অনুষ্ঠিত হয় বিজলীরাণী অপেরা, পঞ্চরস যাত্রাপালা এবং তেলেগু সম্প্রদায়ের নৃত্য পরিবেশনা।
আয়োজকরা জানান, "হিম উৎসব কোনো বিচ্ছিন্ন আয়োজন নয়। এটি এই ক্যাম্পাসের ভেতরে দাঁড়ানো একটি সাংস্কৃতিক অবস্থান, যেখানে আমরা আবার শিখতে চাই একসঙ্গে থাকা, একসঙ্গে ভাবা এবং একসঙ্গে উচ্চারণ করা। আমরা বিশ্বাস করি, যে রাষ্ট্রে প্রশ্ন করা নিষিদ্ধ হয়, সেখানে শিল্পই হয়ে ওঠে প্রতিরোধের হাতিয়ার। যেখানে ইতিহাস মুছে ফেলার চেষ্টা চলে, শিল্পচর্চাই হতে পারে স্মৃতির সংগ্রহশালা।"
হিম উৎসব ১৪৩২-এর অন্যতম আয়োজক নুর-ই-তামিম স্রোত বলেন, "এবারে আমরা অষ্টমবারের মতো হিম উৎসবের আয়োজন করছি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা শীতকালে এই উৎসবটি আয়োজন করে, কোনো স্পন্সর বা পার্টনারশিপ ছাড়া, সম্পূর্ণ ক্রাউড ফান্ডিংয়ের মাধ্যমে। ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থী, রিকশাওয়ালা, দোকানদার, কর্মকর্তা, স্টাফ ও শিক্ষকরা নিজেদের মতো করে অর্থ দিয়ে উৎসবকে সম্ভব করেন। এই অর্থ থেকেই তৈরি হয় মূল ফান্ড, যা ব্যবহার করা হয় অনুষ্ঠান পরিচালনার জন্য।"
তিনি আরও বলেন, "হিম উৎসবের কোনো আয়োজক কমিটি নেই। এটি ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীদের একটি কমিউনিটি 'পরম্পরা' দ্বারা পরিচালিত হয়, যার কোনো অফিস নেই—শুধু একটি ফেসবুক পেজ আছে। কমিউনিটির একমাত্র পোস্ট হলো ট্রেজারার, যার মাধ্যমে সব অর্থ সংগ্রহ ও ব্যয় করা হয়।"
স্রোত বলেন, "উৎসবের মূল উদ্দেশ্য হলো দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সাংস্কৃতিক চর্চা শহরের মানুষের সামনে তুলে ধরা এবং শিল্পীদের স্বাধীনতা বজায় রাখা। এখানে অংশ নেওয়া শিল্পীরা কোনো অর্থ পান না। শিক্ষার্থীদের অর্থের মাধ্যমে ডেকোরেশন, সাউন্ড সিস্টেম এবং দর্শকদের সুবিধা নিশ্চিত করা হয়।"
তিনি বলেন, "হিম উৎসব শুধুমাত্র বিনোদন নয়; এটি একটি শিক্ষামূলক ও সাংস্কৃতিক উদ্যোগ। এটি প্রশ্ন করা, ভিন্নমত প্রকাশ এবং শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। প্রায় ১০–১২ বছরের এই প্রচেষ্টা দেখিয়েছে যে, অর্থ কখনো শিল্পকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না; বরং শিল্পের কাছেই অর্থ পরাজিত হয়।"
