ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিটের নির্মাণ ব্যয় কমল ৪,৪৬৫ কোটি টাকা
প্রকল্প ব্যয় কমিয়ে আনার জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে কাজ শুরু হওয়ার আগেই ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের দ্বিতীয় ইউনিটের (ইআরএল-২) নির্মাণব্যয় ৪ হাজার ৪৬৫ কোটি টাকা কমানো হয়েছে।
টিবিএসের হাতে সংশোধিত প্রস্তাবের কপি এসেছে। সেই প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রকল্পের নতুন ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৩১ হাজার কোটি টাকা, যা আগে ছিল ৩৫ হাজার ৪৬৫ কোটি টাকা। সংশোধিত এ প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে জমা দেওয়া হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানান, গত ২৩ ডিসেম্বর শর্তসাপেক্ষে প্রকল্পটি অনুমোদন দেয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)।
তারা বলেন, একনেক সভায় প্রকল্পের বিভিন্ন দিক—যেমন বিস্তারিত ইঞ্জিনিয়ারিং, নকশা, নির্মাণ তদারকি, কমিশনিং এবং সংশ্লিষ্ট ভবন ও অবকাঠামো খাতগুলো পুনরায় পরীক্ষা করে ব্যয় যৌক্তিকভাবে কমিয়ে আনতে বলা হয়েছিল।
এই নির্দেশনার পর বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যান আমিন উল আহসানের নেতৃত্বে ইআরএল ও জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি ব্যয় পর্যালোচনা কমিটি গঠন করা হয়।
এই কমিটি মূলধনী ব্যয় এবং এর উপ-খাতগুলো, যেমন ইঞ্জিনিয়ারিং ডিজাইন, প্রি-কমিশনিং ও কমিশনিং, অভ্যন্তরীণ রাস্তা, প্ল্যান্ট-সংশ্লিষ্ট ভবন ও অন্যান্য সরঞ্জামের ব্যয় গভীরভাবে পর্যালোচনা করে।
পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনার পর কমিটি প্রকল্পের মোট ব্যয় ৩১ হাজার কোটি টাকায় নামিয়ে আনার সুপারিশ করে বলে জানান কর্মকর্তারা।
১২.৫৯ শতাংশ ব্যয় সাশ্রয়
বিপিসি কর্মকর্তারা জানান, পর্যালোচনা কমিটি বেশ কিছু খাতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ব্যয় কমিয়েছে। প্ল্যান্ট-সংশ্লিষ্ট ভবন নির্মাণে ব্যয় ৭৬৮.৮৩ কোটি টাকা কমিয়ে ২৫০ কোটি টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রকৌশল ও অন্যান্য সরঞ্জামাদিতে ১ হাজার ৭২৬ কোটি টাকা ব্যয় কমানো হয়েছে। মূল প্রকল্প প্রস্তাবে এই খাতে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৮ হাজার ২০৩.৮৯ কোটি টাকা।
অন্যান্য স্থাপনাদি নির্মাণে ব্যয় ১ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা কমিয়ে ৯ হাজার ৫০৬ কোটি টাকা করা হয়েছে। এছাড়া অন্যান্য মূলধন ব্যয় খাতে ১ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা খরচ কমিয়ে ৩ হাজার ৮১৫ কোটি টাকা করা হয়েছে। অভ্যন্তরীণ রাস্তার নির্মাণ খরচ ২৮৮ কোটি টাকা থেকে কমিয়ে ১৩৮ কোটি টাকা করা হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা জানান, এই সংশোধনীর ফলে একনেক অনুমোদিত মূল ব্যয়ের চেয়ে ১২.৫৯ শতাংশ খরচ কমছে। সরকারি খাতে উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়ন , প্রক্রিয়াকরণ ও অনুমোদন ও সংশোধন নির্দেশিকা জুন ২০২২ অনুযায়ী, প্রকল্প ব্যয় ১০ শতাংশ বা তার বেশি কমলে তা প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভায় (পিইসি) উপস্থান করতে হয়।
সংশোধিত এই প্রকল্প প্রস্তাব আজ (১ ফেব্রুয়ারি) পিইসি সভায় উপস্থাপন করার কথা রয়েছে।
১ বিলিয়ন ডলারের ঋণপ্রস্তাব আইএসডিবির
একনেক সভায় প্রকল্পটি নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়নের জন্য অনুমোদন দিলেও সহজ শর্তের বৈদেশিক ঋণ পাওয়ার সম্ভাবনা যাচাই করার নির্দেশও দেওয়া হয়।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সূত্র জানায়, ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক (আইএসডিবি) এই প্রকল্পে ১ বিলিয়ন ডলার বা আরো বেশি ঋণ দিতে আগ্রহ দেখিয়েছে। সংস্থাটি গত ২২ ডিসেম্বর এক চিঠিতে ইআরএল-২ নির্মাণে ১ বিলিয়ন ডলার ঋণ দেওয়ার প্রাথমিক প্রস্তাব দিয়েছে। তবে বিষয়টি চূড়ান্ত হবে সংস্থার মিশনের বাংলাদেশ সফরের পর।
প্রকল্পের পুনরুজ্জীবন
ফ্রান্সের প্রতিষ্ঠান টেকনিপ-এর ঠিকাদারিতে ১৯৬৮ সালে দেশের একমাত্র তেল পরিশোধনাগার চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারি প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০১০ সালে প্রথমবারের মতো এর দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। ২০১৩ সালে সরকার এর জন্য ১৩ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিলেও কাজের কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। পরে ২০২২ সালে বিপিসি নিজস্ব অর্থ দিয়ে কাজ শুরুর উদ্যোগ নেয় এবং প্রাক্কলিত ব্যয় বাড়িয়ে ২৩ হাজার কোটি টাকা করা হয়; কিন্তু সেবারও কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি।
২০২৪ সালে এস আলম গ্রুপ ২৫ হাজার কোটি টাকায় ইআরএল-২ নির্মাণের প্রস্তাব দিলে ৯ জুলাই তা অনুমোদিত হয়। তবে আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে হাসিনা সরকারের পতনের পর প্রকল্পটি স্থগিত করা হয়।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর বিপিসি নতুন করে প্রকল্পটি সচল করার উদ্যোগ নেয়। এর প্রাক্কলিত ব্যয় তখন ধরা হয়েছিল ৩৬ হাজার ৪১০ কোটি টাকা। শুরুতে বিদেশি ঋণ নিশ্চিত না হওয়ায় এটি সরকারি তহবিল ও বিপিসির নিজস্ব সম্পদে সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত নিয়ে বাজেট সংশোধন করা হয়; যদিও শুরুর দিকের মূল প্রাক্কলন ছিল ৪২ হাজার ৯৭৪ কোটি টাকা।
বার্ষিক ৪৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল শোধন
কর্মকর্তারা বলেন, বর্তমানে ইস্টার্ন রিফাইনারি দেশের পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যের চাহিদার মাত্র ২০ শতাংশ পূরণ করে। বাকি চাহিদা আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা হয়। ইআরএল-২ ইউনিট বিশ্বমানের 'ইউরো-৫' মানের গ্যাসোলিন ও ডিজেল উৎপাদন করবে। একইসঙ্গে এটি বিদ্যমান রিফাইনারির ডিজেল, মোটর স্পিরিট ও অকটেনকেও 'ইউরো-৫' মানে উন্নীত করবে।
বিপিসি ইতিমধ্যে ইনস্টলেশন অব সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) উইথ ডাবল পাইপ লাইন নামক প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে বছরে ৪৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল পরিবহন করা যাবে।
কর্মকর্তাদের প্রক্ষেপণ অনুসারে, ইআরএল-২ থেকে বছরে এই প্রকল্প হতে প্রায় ৪ লাখ টন ফার্নেস অয়েল, ৬০ হাজার টন এলপিজি, ৬ লাখ টন ইউরো-৫ গ্যাসোলিন, ১১ লাখ টন ইউরো-৫ ডিজেল, ২ লাখ টন লুব বেজ অয়েল ও ৫ লাখ টন জেট-ফুয়েল উৎপাদন করা সম্ভব হবে।
