প্রচারের ৫ দিনেই ২০ হামলা-সংঘর্ষ: ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বাড়ছে নির্বাচনি সহিংসতা
আসন্ন সংসদ নির্বাচন যতই এগিয়ে আসছে, ঢাকাসহ সারা দেশে নির্বাচনি সহিংসতার ঘটনা ততই বাড়ছে। গত ২২ জানুয়ারি থেকে নির্বাচনি প্রচারণা শুরু হওয়ার পর থেকে সোমবার পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে অন্তত ২০টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। যার অধিকাংশই বিএনপি এবং জামায়াত ও এনসিপি নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের মনোনীত প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যে। আজ সোমবারও ঢাকাসহ সারাদেশে অন্তত ৫টি সহিংসতার খবর পাওয়া গেছে।
সোমবার সকালে ঢাকা-১৮ আসনে 'ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ' জোটের প্রার্থী এবং এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলামের নির্বাচনি গণসংযোগে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী এস এম জাহাঙ্গীর হোসেনের সমর্থকেরা হামলা করেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। খিলক্ষেত থানার ডুমনি বাজার এলাকায় এই হামলার ঘটনা ঘটে।
এ বিষয়ে এনসিপি প্রার্থী আরিফুল ইসলাম বলেন, 'সোমবার সকালে খিলক্ষেত থানার ডুমনি বাজার এলাকায় শান্তিপূর্ণ গণসংযোগ চলাকালে বিএনপি নেতা দিদার মোল্লার নেতৃত্বে একদল সন্ত্রাসী সম্পূর্ণ পরিকল্পিতভাবে আমাদের উপর হামলা চালায়। এতে আমাদের বেশ কয়েকজন সহযোদ্ধা আহত হলে তারা প্রতিরোধ গড়ে তুলে। নির্বাচনের আগ মুহূর্তে প্রতিপক্ষের এই সহিংস আচরণ প্রমাণ করে তারা জনসমর্থনে ভীত হয়ে সন্ত্রাসের পথ বেছে নিয়েছে।'
পাল্টা বক্তব্যে বিএনপি প্রার্থী এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, 'আমি ঘটনাটি শুনেছি এবং দলকে জানিয়েছি। দলের নির্দেশে অভিযুক্ত দিদার মোল্লাকে শোকজ করা হয়েছে। ঘটনা জানার পর আমি আরিফুল ইসলাম আবিদকে ফোন করেছি। আমরা সবাইকে নিয়ে সহাবস্থানে বিশ্বাস করি। আমাদের পক্ষ থেকে কোনও উসকানিমূলক কিছু ঘটবে না।'
এদিকে সোমবার টাঙ্গাইল-২ আসনের গোপালপুর উপজেলায় ১১ দলীয় জোটের জামায়াত প্রার্থী মো. হুমায়ুন কবীরের প্রচারণায় যাওয়া নারী কর্মীদের ওপর বিএনপির নেতা-কর্মীরা হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ করেছে জামায়াত।
এর আগে গত রবিবার যশোর-২ আসনে জামায়াত প্রার্থী ডা. মোসলেহ উদ্দীন ফরিদের পক্ষে প্রচারণাকালে নারী নেত্রীদের ওপর যুবদল হামলা ও হেনস্তা করেছে বলে অভিযোগ করা হয়। এতে দুইজন নারী আহত হন। এ সময় ঝিকরগাছা উপজেলা যুবদলের সভাপতি আরাফাত রহমান কল্লোলের বিরুদ্ধে নারী নেত্রীদের মোবাইল ফোন ও ব্যাগ ছিনতাইয়ের অভিযোগ তুলেছেন ঝিকরগাছা উপজেলা মহিলা জামায়াত নেতৃবৃন্দ।
একই দিন (রোববার) চুয়াডাঙ্গা-১ আসনের আলমডাঙ্গা উপজেলার খাদিমপুর ইউনিয়নে জামায়াতের নারী কর্মীদের হেনস্তার অভিযোগ ওঠে। বিকেলে জামায়াতের পক্ষে ভোট চাইতে গেলে বিএনপির সমর্থকদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডা ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। পরে উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বাঁধলে ১৩ জন আহত হন।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন নেতাকর্মীদের দেখে বিএনপি প্রার্থী শরীফুজ্জামান বলেন, 'নির্বাচনী মাঠের শান্ত পরিবেশ পরিকল্পিতভাবে অশান্ত করা হচ্ছে। জামায়াতের অতর্কিত হামলায় নারীসহ বিএনপির ৮ জন নেতাকর্মী আহত হয়েছেন।' অপরদিকে জামায়াত প্রার্থী মাসুদ পারভেজ রাসেল বলেন, 'জামায়াতের নারীকর্মীদের বারবার নির্বাচনি প্রচারণায় বাধা দেওয়া হচ্ছে। বিএনপির হামলায় জামায়াতের নারীসহ ৫ জন আহত হয়েছেন।'
সহিংসতার চিত্র আরও পাওয়া গেছে নাটোরেও। গত ২২ জানুয়ারি নাটোর–২ আসনে নির্বাচনী গণসংযোগ চলাকালে জামায়াতে ইসলামীর নারী কর্মীদের ওপর বিএনপি নেতা–কর্মীরা চড়থাপ্পড়সহ হামলা চালিয়ে বাধা প্রদান করে বলে জামায়াত জোটের প্রার্থী অভিযোগ করেছেন।
গত ২৩ জানুয়ারি সন্ধ্যায় কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামে বিএনপির নির্বাচনী জনসভায় চেয়ারে বসাকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও যুবদলের নিজস্ব নেতা-কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। ভাতশালা গ্রামে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী অ্যাডভোকেট মো. ফজলুর রহমানের নির্বাচনী জনসভার শেষ পর্যায়ে কাস্তুল ইউনিয়ন যুবদলের একটি মিছিলকে কেন্দ্র করে এই ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত ৩০ জন নেতা-কর্মী আহত হন। এছাড়া ২৪ জানুয়ারি মেহেরপুরের গহরপুর গ্রামে নারী কর্মীদের হেনস্তার প্রতিবাদ করায় তিনজনকে মারধর করার অভিযোগ করেছে জামায়াত।
সোমবার প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিনের সাথে বৈঠক শেষে বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, 'বিভিন্ন জায়গাতে আচরণবিধি লঙ্ঘন হচ্ছে, হামলা হচ্ছে। আমাদের নারী কর্মীদের উপর হামলা হচ্ছে। গায়ে পড়ে এ সমস্ত হামলা করা হচ্ছে। গত চার দিনে আমরা উদ্বেগ এবং উৎকণ্ঠার সাথে লক্ষ্য করছি এ বিষয়। আমরা দেখতেছি ওনারা (ইসি) কী করেন।'
সার্বিক পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ দাবি করেন, ভোটের মাঠে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড অবশ্যই রয়েছে। নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, 'আমরা বিভিন্ন জায়গায় সহিংসতার অভিযোগ পাচ্ছি এবং আসন ভিত্তিক অভিযোগগুলো তদন্ত কমিটিকে পাঠাচ্ছি। তারা বিষয়গুলো তদন্ত করে ব্যবস্থা নিবে। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে আমরা প্রতিটি অভিযোগ গুরুত্ব সহকারে খতিয়ে দেখছি।'
