প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলের সমালোচনা করলে জনগণের পেট ভরবে না: তারেক রহমান
প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলের সমালোচনা করলে জনগণের পেট ভরবে না বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
তিনি বলেন, 'নির্বাচনি জনসভায় দাঁড়িয়ে একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে আমরা আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী দল, যারাই হোক না কেন, তাদের সম্পর্কে অনেক কথা বলতে পারি। তাদের দোষ-ত্রুটি তুলে ধরতে পারি। কিন্তু তাতে কি জনগণের কোনো উপকার হবে? সমালোচনা করার স্বার্থেই শুধু সমালোচনা করি, তাতে দেশের সাধারণ মানুষের উপকার হবে না, পেট ভরবে না।'
দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময় পর চট্টগ্রামে সমাবেশের মঞ্চে রবিবার (২৫ জানুয়ারি) দুপুরে তিনি এসব কথা বলেন। নগরীর রেলওয়ে পলোগ্রাউন্ড মাঠে আয়োজিত নির্বাচনি সমাবেশে চট্টগ্রাম নগরীর, দক্ষিণ ও উত্তর জেলা ছাড়াও তিন পার্বত্য জেলা, কক্সবাজারের নেতা-কর্মীরা অংশ নিয়েছেন।
দেশের কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনাই দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ ছাড়া বাস্তবায়ন সম্ভব নয় বলে জানান বিএনপি চেয়ারম্যান।
তারেক রহমান বলেন, 'দুর্নীতিই গত বছরগুলোতে বাংলাদেশের জনগণকে তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে। তাই বিএনপি সরকার গঠন করতে পারলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং কোনো দুর্নীতিবাজকে ছাড় দেওয়া হবে না, সে যেই হোক না কেন।'
তিনি আরও বলেন, 'যত পরিকল্পনাই গ্রহণ করা হোক না কেন, সেগুলো বাস্তবায়নের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হচ্ছে দুর্নীতি। দুর্নীতিকে নিয়ন্ত্রণ না করতে পারলে কোনো পরিকল্পনাই সফল হবে না।'
এ কারণেই দুর্নীতি দমনকে প্রধান অঙ্গীকার হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, 'অতীতে বিএনপি সরকার প্রমাণ করেছে যে তারা দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে সক্ষম। ২০০১ সালে খালেদা জিয়া সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশকে ধীরে ধীরে দুর্নীতির করাল গ্রাস থেকে বের করে আনার চেষ্টা করা হয়েছিল। বিএনপি সরকার গঠন করলে আইনের চোখে সবাই সমান থাকবে। অপরাধীর পরিচয় দল দিয়ে নয়, অপরাধ দিয়েই বিচার করা হবে। কেউ আইন ভঙ্গ করলে কিংবা দুর্নীতির মাধ্যমে সরকারি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বাধা দিলে, তাকে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।'
দেশের মানুষ একটি নিরাপদ ও স্থিতিশীল পরিবেশ চায়, যেখানে তারা নির্বিঘ্নে চলাফেরা, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং জীবিকা নির্বাহ করতে পারবে জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, 'জনগণ শুধু নিরাপত্তাই নয়, একই সঙ্গে এমন একটি পরিবেশ চায়; যেখানে তাদের সন্তানরা নিশ্চিন্তে লেখাপড়া করতে পারবে এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত হতে পারবে।'
তিনি বলেন, 'বিএনপি সরকার গঠন করতে পারলে শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে মৌলিক সংস্কারের পরিকল্পনা রয়েছে। শিক্ষা ব্যবস্থা শুধু সার্টিফিকেটকেন্দ্রিক থাকবে না। শিক্ষাজীবন শেষে তরুণ সমাজ যেন সহজেই কর্মসংস্থানের সুযোগ পায়, সে লক্ষ্যেই শিক্ষা কারিকুলাম ও কাঠামো পুনর্গঠন করা হবে।'
প্রাথমিক শিক্ষা থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত ধাপে ধাপে পরিবর্তন এনে কর্মমুখী শিক্ষা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
তিনি বলেন, 'বিএনপি শুধু হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিতে চায় না। বরং দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ, নারী ও শিশুদের কাছে সরাসরি স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে চায়। এ লক্ষ্যে এক লাখ হেলথকেয়ার কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনার রয়েছে, যারা ঘরে ঘরে গিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা দেবে। এতে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশাধিকার নিশ্চিত হবে।'
দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক নারী উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, 'এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী না করতে পারলে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব নয়। খালেদা জিয়ার সরকারের সময় মেয়েদের শিক্ষা ব্যবস্থা বিনামূল্যে করার ফলে নারীদের একটি বড় অংশ শিক্ষিত হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় বিএনপি সরকার গঠন করতে পারলে গ্রামগঞ্জের নারীদের কাছে ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে, যাতে তারা অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও সহায়তা পেতে পারে।'
কৃষকদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশের মূল প্রাণশক্তি হচ্ছে কৃষক। কৃষক ভালো থাকলে বাংলাদেশ ভালো থাকবে। খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করতে কৃষি উৎপাদন বাড়ানো জরুরি। এজন্য বিএনপি সরকার গঠন করলে পর্যায়ক্রমে দেশের সব কৃষকের কাছে 'কৃষক কার্ড' বিতরণের পরিকল্পনা রয়েছে। যার মাধ্যমে কৃষক ও কৃষানীরা ঋণসহ বিভিন্ন সুবিধা পাবেন এবং ধীরে ধীরে স্বাবলম্বী হয়ে উঠবেন।
চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জলাবদ্ধতা ও বন্যা সমস্যার কথা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, 'খাল-বিল ও নদীনালা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এ সংকট সৃষ্টি হয়েছে। বিএনপি সরকার গঠন করলে দেশব্যাপী খাল খনন কর্মসূচি চালু করা হবে। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে দু হাতে কোদাল দিয়ে খাল কাটব।'
চট্টগ্রামের ইপিজেড ও কেপিজেডসহ দেশের বিভিন্ন রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল বিএনপি সরকারের সময় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, 'এখানে লক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। আগামী দিনে বিএনপি সরকার গঠন করতে পারলে ইপিজেডের সংখ্যা বাড়ানো হবে এবং নতুন শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা হবে, যাতে আরও ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়।'
বক্তব্যের শেষ অংশে তারেক রহমান গণতন্ত্র, ভোটাধিকার ও মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান।
আগামী ১২ তারিখের নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীকে ভোট দিয়ে বিএনপিকে সরকার গঠনের সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
তারেক রহমান ছাড়াও সমাবেশে বক্তব্য রাখেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দীন, চট্টগ্রাম সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন, মীর নাছির, মীর হেলাল, সাঈদ আল নোমান, নাজিমুর রহমান, সরোয়ার জামাল নিজাম, আবু সুফিয়ান, মোহাম্মদ শাহাজাহান চৌধুরী, আসলাম চৌধুরী, গোলাম আকবর খন্দকার, গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী, মোহাম্মদ এরশাদ উল্লাহ, এসএম ফজলুল হক, হারুনুর রশিদ প্রমুখ।
এর আগে বেলা ১২টা ২২ মিনিটের দিকে তিনি নগরীর রেলওয়ে পলোগ্রাউন্ড মাঠে পৌঁছালে স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে সমাবেশস্থল।
মঞ্চে ওঠার আগে তারেক রহমান সামনে থাকা গুম-খুনের শিকার নেতা-কর্মীদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।
সকালে চট্টগ্রামের হোটেল রেডিসন ব্লু বে ভিউ'র মেজবান হলে 'ইয়ুথ পলিসি টক উইথ তারেক রহমান' শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম ও এর আশপাশের ৫০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৩৪০ জন শিক্ষার্থী অংশ নেন।
প্রশ্নোত্তর পর্বে ছাত্রছাত্রীরা তারেক রহমানকে সরাসরি প্রশ্ন করার সুযোগ পান। তিনি মঞ্চে ঘুরে ঘুরে শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন গ্রহণ করেন এবং জবাব দেন। সেখান থেকে ১১টা ৪০ মিনিটে তিনি বের হয়ে লাল-সবুজের বাসে চড়ে সমাবেশস্থলে যান।
তারেক রহমান সর্বশেষ চট্টগ্রামে এসেছিলেন ২০০৫ সালে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাচনী প্রচারণায় এসে তিনি নগরীর লালদিঘী ময়দানে জনসভা করেছিলেন।
