এক বছরে দুটি প্রিমিয়াম রুট বন্ধ: বিমানের রুট পরিকল্পনা কতটা টেকসই?
এক বছরের ব্যবধানে দুটি প্রিমিয়াম দূরপাল্লার রুট সাময়িকভাবে বন্ধ করেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। এর মধ্যে একটি রুটে কোনো লোকসান না থাকার পরও সেটি সাময়িক বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। হজ কার্যক্রম পরিচালনা, উড়োজাহাজ সংকট ও ব্র্যান্ডের ভাবমূর্তি বজায় রাখার লড়াইয়ে রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী সংস্থাটি যখন হিমশিম খাচ্ছে, তখন এসব তাদের বহর পরিকল্পনা ও রুট কৌশলের গভীর কাঠামোগত দুর্বলতাকে সামনে নিয়ে এসেছে।
সর্বশেষ হজ কার্যক্রমকে সামনে রেখে আগামী মার্চ থেকে ঢাকা-ম্যানচেস্টার রুট সাময়িকভাবে স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মাত্র কয়েক মাস আগেই ব্যাপক লোকসানের কারণে ঢাকা থেকে জাপানের নারিতায় ফ্লাইট পরিচালনা সাময়িকভাবে বন্ধ করেছিল বিমান।
খাত-সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এভাবে হুটহাট দূরপাল্লার রুট সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়ার এই প্রবণতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বরং এটি সম্ভাব্যতা যাচাই ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার গভীর ত্রুটিরই প্রতিফলন।
এ সংকটের মূল কারণ বিমানের ওয়াইড বডি উড়োজাহাজের সংখ্যা ক্রমেই কমে যাওয়া এবং সেগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ। গত পাঁচ বছরে বহরে নতুন কোনো উড়োজাহাজ যুক্ত হয়নি। এছাড়া লিজে উড়োজাহাজ সংগ্রহের চেষ্টাও বারবার ব্যর্থ হয়েছে। অন্যদিকে বোয়িং থেকে নতুন উড়োজাহাজ ডেলিভারি পেতে আরও অন্তত ছয় বছর লাগবে। ফলে স্থিতিশীল নেটওয়ার্ক কৌশল বাস্তবায়নের পরিবর্তে বিমান কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে বারবার রুট রদবদল করছে।
এভিয়েশন বিশ্লেষক ও বিমানের পরিচালনা পর্ষদের সাবেক সদস্য কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, শুধু মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমঘন রুটগুলোতে মনোযোগ দিলে এয়ারলাইন্সের ব্র্যান্ড ইমেজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
তিনি টিবিএসকে বলেন, 'বিমান কোনো বাজেট ক্যারিয়ার নয়। জোরালো ভাবমূর্তি ধরে রাখতে চাইলে শুধু শ্রমবাজারের রুটে মনোযোগ দিয়ে ঢাকা-ম্যানচেস্টারের মতো প্রিমিয়াম রুট বাদ দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। ব্র্যান্ডের মান ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক রুটগুলো চালু রাখা জরুরি।'
তবে বিমান কর্তৃপক্ষের দাবি, রুট বন্ধ বা স্থগিত করা অব্যবস্থাপনার লক্ষণ নয়; বরং উড়োজাহাজ তীব্র সংকটের সময়ে এটি দায়িত্বশীল, নিরাপত্তা-কেন্দ্রিক ও বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত।
বহর সংকটে স্থগিত ম্যানচেস্টার রুট
বিমান ঘোষণা করেছে, ২০২৬ সালের ১ মার্চ থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ঢাকা-ম্যানচেস্টার-ঢাকা রুট সাময়িকভাবে স্থগিত থাকবে। এই সিদ্ধান্তের পেছনে উড়োজাহাজের স্বল্পতা, আসন্ন হজ কার্যক্রম, বিদ্যমান উড়োজাহাজগুলোর দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ ও পুরো নেটওয়ার্কজুড়ে বহরের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তাকে কারণ হিসেবে দেখিয়েছে সংস্থাটি।
ম্যানচেস্টারে বসবাসরত সিলেটি বংশোদ্ভূত প্রবাসীরা রুটটি সচল রাখার দাবি জানিয়ে আসছিলেন। এর প্রতিক্রিয়ায় বিমান জানিয়েছে, ঢাকা-লন্ডন রুটটি চালু রয়েছে এবং সেটি যাত্রীদের চাহিদা মেটাতে সক্ষম। বিমান আরও বলেছে, লন্ডন থেকে ম্যানচেস্টারের দূরত্ব প্রায় ২৬২ কিলোমিটার এবং ট্রেনে সেখানে পৌঁছাতে সময় লাগে প্রায় দুই ঘণ্টা।
বিমানের সূত্রমতে, ম্যানচেস্টার রুট খুব একটা লাভজনক না হলেও লোকসানিও ছিল না। 'তবে জাতীয় স্বার্থ এবং হজ কার্যক্রম পরিচালনার খাতিরে পিক পিরিয়ডে উড়োজাহাজগুলো অন্য রুটে সরিয়ে নেওয়া বা পুনর্বণ্টন করা প্রয়োজন হয়ে পড়ে,' একজন ঊর্ধতন কর্মকর্তা বলেন।
এই রুট বন্ধ হওয়ার ইতিহাস অবশ্য নতুন নয়। উড়োজাহাজ সংকটের কারণে ২০১২ সালে রুটটি প্রথমবার বন্ধ করা হয়েছিল। পরে প্রবাসীদের দীর্ঘদিনের দাবির মুখে ২০২০ সালের শুরুতে এ রুট ফের চালু করা হয়। চালুর পাঁচ বছরেরও কম সময়ে আবারও এই রুট স্থগিতের সিদ্ধান্তে যাত্রীদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
বিমানের মুখপাত্র বোসরা ইসলাম টিবিএসকে জানান, ইউরোপ, হজ ও মধ্যপ্রাচ্যের রুটগুলোতে বোয়িং ৭৮৭ ও ৭৭৭-এর মতো ওয়াইড বডি উড়োজাহাজ ব্যবহার করা হয়। তিনি বলেন, 'ম্যানচেস্টার দূরপাল্লার গন্তব্য; সেখানে এক ফ্লাইটের জন্য একটি উড়োজাহাজকে বেশ কয়েক দিন ব্যস্ত থাকতে হয়। অথচ একই সময়ে ওই উড়োজাহাজ দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে একাধিক ফ্লাইট পরিচালনা করা জায়।'
তিনি আরও বলেন, সীমিত বহর নিয়ে উড়োজাহাজের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা এখন পরিচালনগতভাবে অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নজর এখন মধ্যপ্রাচ্যের রুটে
বিমান বলছে, তারা এখন মধ্যপ্রাচ্যের গন্তব্যগুলোকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। কারণ এসব রুটে প্রবাসী কর্মী, ওমরাহ যাত্রী, ট্রানজিট যাত্রী ও কার্গো পরিবহনের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। বর্তমানে দুবাই, জেদ্দা, রিয়াদ, দোহা, দাম্মাম ও মাস্কাটের মতো রুটগুলোতে যাত্রীর প্রচণ্ড চাপ দেখা যাচ্ছে।
বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শফিকুর রহমান সম্প্রতি গণমাধ্যমকে বলেছেন, রেমিট্যান্স আয়, ট্রানজিট যাত্রী ও কার্গো পরিবহনের গুরুত্ব বিবেচনায় মধ্যপ্রাচ্যে কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা তাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। তবে কাজটি করা হবে ধাপে ধাপে এবং পুরো প্রক্রিয়া নির্ভর করবে বহরে উড়োজাহাজের প্রাপ্যতার ওপর।
তিনি বলেন, 'আমাদের ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধি কৌশল বাজার চাহিদা এবং আমাদের পরিচালনাগত সক্ষমতার সাথে সামঞ্জস্য রেখে সাজানো হয়েছে। যেকোনো নতুন রুট সম্প্রসারণ ধাপে ধাপে সম্পন্ন করা হবে, যার ভিত্তি হবে সতর্কতাপূর্ণ উড়োজাহাজ পরিকল্পনা এবং বাণিজ্যিক সম্ভাব্যতা যাচাই।'
ইউরোপের দূরপাল্লার ফ্লাইট পরিচালনার জন্য অতিরিক্ত পাইলট ও কেবিন ক্রু এবং তাদের দীর্ঘ বিশ্রামের প্রয়োজন হয়। হজ ও ওমরাহর মৌসুমে এই একই জনবলকে মধ্যপ্রাচ্যের রুটগুলোতে ব্যাপকভাবে কাজে লাগানো হয়। এতে মধ্যপ্রাচ্যে ফ্লাইটের সংখ্যা বাড়ানো এবং সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়।
আগামী ১৮ এপ্রিল থেকে পরবর্তী হজ ফ্লাইট কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। এই মৌসুমে সীমিত সময়ের মধ্যে হাজার হাজার হজযাত্রী পরিবহনের জন্য নিয়মিত শিডিউলের পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক বিশেষ ফ্লাইটের প্রয়োজন হয়। এই অতিরিক্ত চাপের কারণে প্রায়ই অন্যান্য রুটে ফ্লাইটের সংখ্যা কমিয়ে দেওয়া হয় অথবা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়।
এ ছাড়া রুটিন সি-চেক, ইঞ্জিনের ওভারহল ও কাঠামোগত পরিদর্শনের জন্য উড়োজাহাজগুলোকে সপ্তাহ বা মাসজুড়ে বসিয়ে রাখতে হয়। এতে উড়োজাহাজের প্রাপ্যতা আরও কমে আসে।
বর্তমানে ১৯টি উড়োজাহাজের বহর নিয়ে ২২টি আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করছে বিমান। গত দুই বছরে অন্তত পাঁচবার লিজ নিয়ে অতিরিক্ত উড়োজাহাজ সংগ্রহের চেষ্টা করতে পারেনি সংস্থাটি। এছাড়া গত পাঁচ বছরে বহরে নতুন কোনো উড়োজাহাজ যুক্ত হয়নি।
বোয়িং থেকে কেনা নতুন উড়োজাহাজ ২০৩১ সালের আগে পাওয়ার সম্ভাবনা নেই—অর্থাৎ আরও ছয় বছর লাগবে সেগুলো পেতে। ক্রমবর্ধমান যাত্রী চাহিদার বিপরীতে নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, প্রিমিয়াম যোগাযোগ ব্যবস্থা ও পরিচালনগত স্থায়িত্বের ভারসাম্য বজায় রাখতে গিয়ে রীতিমতো সংগ্রাম করছে রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী সংস্থাটি।
নারিতা রুট: প্রিমিয়াম সেবা, তবে বিপুল লোকসান
বিপুল আর্থিক লোকসানের কারণে গত বছরের জুলাইয়ে বিমানের আরেকটি প্রিমিয়াম দূরপাল্লার সেবা ঢাকা-নারিতা রুট সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। পুনরায় চালু করার মাত্র ২১ মাসের মাথায় রুটটি স্থগিত করা হয়।
রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী সংস্থাটি ১৯৭৯ সালে প্রথম নারিতা রুট চালু করে। এরপর ক্রমাগত লোকসানের কারণে ১৯৮১ ও ২০০৬ সালে একাধিকবার এই রুট বন্ধ করা হয়। পরে ২০২৩ সালের ১ সেপ্টেম্বর ব্যাপক জনউৎসাহের মধ্য দিয়ে রুটটি ফের চালু করা হয়। এতে দীর্ঘ ট্রানজিট বিরতির ঝামেলা কমে যায় এবং ভ্রমণের সময় ৬-৭ ঘণ্টায় নেমে আসে।
তবে বিমান সূত্র জানায়, নারিতা রুটের প্রতিটি ফ্লাইটে প্রায় ৯৫ লাখ টাকা লোকসান গুনতে হতো। এ ফ্লাইটে গড়ে কেবিন অকুপেন্সি বা আসন পূর্ণ থাকত ৬৯ শতাংশ। এই রুটে মোট লোকসানের পরিমাণ দাঁড়ায় ২১৫.৫৮ কোটি টাকা। শেষপর্যন্ত বাধ্য হয়ে বিমান চলাচল বন্ধ করে দেয় কর্তৃপক্ষ। এতে যাওয়ায় যাত্রীরা আবারও তৃতীয় দেশের মাধ্যমে ট্রানজিট রুটে যাতায়াত করতে বাধ্য হচ্ছেন, যা তাদের ভ্রমণ সময় ও খরচ দুটোই বাড়িয়ে দিয়েছে।
