নির্বাচনী আচরণবিধি ভেঙে প্রচারণা চালাচ্ছেন অধিকাংশ প্রার্থী
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থী এবং তাদের পক্ষে নেতা-কর্মীরা প্রচারণা চালাচ্ছেন।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড সারাদেশে বিএনপির ২০ জন, জামায়াতের ১৫ জন, এনসিপির ১০ জন এবং স্বতন্ত্র ২৫ জন প্রার্থীসহ অন্তত ১০০ জন প্রার্থীর গত এক সপ্তাহের প্রচারণা কার্যক্রম পর্যালোচনা করেছে। এতে দেখা গেছে, প্রার্থী ও তাদের সমর্থকদের পরিচালিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে প্রায় সবাই কোনো না কোনোভাবে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিয়েছেন।
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, আগামী ২২ জানুয়ারি থেকে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হওয়ার কথা। অর্থাৎ তফসিল ঘোষণার পর থেকে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার তিন সপ্তাহ আগে পর্যন্ত প্রার্থী বা তাদের পক্ষে কেউই নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিতে পারবেন না।
তবে এই নির্দেশনা উপেক্ষা করে প্রার্থীরা শুধু সশরীরেই নন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকসহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মেও ভোট চেয়ে প্রচারণা চালাচ্ছেন।
বুধবার (৭ জানুয়ারি) মির্জাপুর উপজেলা ও পৌর বিএনপি এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের উদ্যোগে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভার ব্যানারে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার রূহের মাগফেরাত কামনায় দোয়া মাহফিল এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের চার দিনের সফরে উত্তরবঙ্গ আগমন উপলক্ষে প্রস্তুতিমূলক আলোচনা সভার কথা উল্লেখ থাকলেও সেখানে টাঙ্গাইল-৭ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আবুল কালাম আজাদ সিদ্দিকীর পক্ষে ভোট চাওয়া হয়। সভায় প্রার্থী নিজেও ভোট চান। অনুষ্ঠানের ব্যানারে "ধানের শীষে ভোট দিন" লেখা সংযুক্ত ছিল।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার খুলনা-৫ আসনে দলটির প্রার্থী। তিনি গত ২ জানুয়ারি হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের এক সমাবেশে দাঁড়িপাল্লাকে বিজয়ী করার জন্য ভোট চেয়েছেন। পাশাপাশি বিভিন্ন তারিখে গণসংযোগও করেছেন।
এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক মাহবুব আলম লক্ষ্মীপুর-১ আসনে ১১ দলীয় জোটের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে তার ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে গত ৬ ও ৭ জানুয়ারিসহ বিভিন্ন তারিখে দলীয় প্রতীক শাপলা কলির পক্ষে ভোট চেয়ে তার ছবিসংবলিত পোস্টার প্রচারণার উদ্দেশ্যে প্রকাশ করেছেন।
বুধবার খুলনার রূপসায় খুলনা-৪ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আজিজুল বারী হেলাল একটি শোকসভা করেন। সেখানে তিনি ধানের শীষের পক্ষে ভোট চান এবং সরকার ক্ষমতায় গেলে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার আশ্বাস দেন। সভায় তিনি একটি কার্ডও প্রদর্শন করেন।
জয়পুরহাট-২ আসনে জামায়াতের প্রার্থী এস এম রাশেদুল আলম তার ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে গত ২৭ ডিসেম্বর, ১ ও ৪ জানুয়ারিসহ বিভিন্ন তারিখে দাঁড়িপাল্লার পক্ষে ভোট চেয়ে তার ছবিসংবলিত পোস্টার প্রকাশ করেছেন।
লক্ষ্মীপুর-১ আসনে জামায়াতের প্রার্থী নাজমুল হাসান পাটওয়ারীর অফিসিয়াল ফেসবুক পেইজে দলীয় প্রতীক দাঁড়িপাল্লায় ভোট চেয়ে জনসংযোগের ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছে।
একইভাবে লক্ষ্মীপুর-২ আসনে জামায়াতের প্রার্থী মাস্টার রুহুল আমিন তার ফেসবুক পেইজে দলীয় প্রতীক দাঁড়িপাল্লার পক্ষে ভোট চেয়ে জনসংযোগের ভিডিও পোস্ট করেছেন।
স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে ঢাকা-৯ আসনের তাসনীম জারা তার নির্বাচনী এলাকায় ভোটারদের সঙ্গে ক্যাম্পেইন করে নিজের পক্ষে ভোট চাওয়ার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নিয়মিত প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।
এদিকে, বিএনপির পরিচালিত ফেসবুক পেইজ "Bangladesh Nationalist Party-BNP" ও "BNP Media Cell" ছাড়াও দলের বিভিন্ন নেতা ও নেতা-কর্মীদের পরিচালিত ফেসবুক পেইজ থেকে দলীয় প্রতীক "ধানের শীষের" পক্ষে প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
একইভাবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী পরিচালিত ফেসবুক পেইজ "Bangladesh Jamaat-e-Islami", এনসিপির "National Citizen Party – NCP", ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের "Islami Andolan Bangladesh" এবং এবি পার্টির "Amar Bangladesh Party–এবি পার্টি"সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ফেসবুক পেইজে দলীয় প্রতীকের পক্ষে ভিডিও ও ছবি প্রকাশ করে নির্বাচনী প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
যদিও নির্বাচনী আচরণবিধি অনুযায়ী, বিধিমালা লঙ্ঘন করে প্রচারণা চালানো শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কোনো প্রার্থী বা তার পক্ষে অন্য কেউ নির্বাচন-পূর্ব সময়ে এই বিধিমালার কোনো বিধান লঙ্ঘন করলে অনধিক ছয় মাসের কারাদণ্ড অথবা অনধিক ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড কিংবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন। আর কোনো নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল নির্বাচন-পূর্ব সময়ে এই বিধিমালার কোনো বিধান লঙ্ঘন করলে অনধিক ১ লাখ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডনীয় হবে। এছাড়া, বিধি লঙ্ঘনের কারণে প্রার্থীদের প্রার্থিতা বাতিল পর্যন্ত হতে পারে।
নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামী ২১ জানুয়ারি প্রতীক বরাদ্দের আগে প্রার্থীদের প্রচারণায় অংশ নেওয়ার সুযোগ নেই। কেউ যদি এর আগেই প্রচারণায় অংশ নেন, সে বিষয়ে উপযুক্ত তথ্যসহ রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ দেওয়া হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রচারণায় অংশ নিয়ে শোকজ
প্রচারণায় অংশ নেওয়ার অভিযোগে ইতোমধ্যে কয়েকজন প্রার্থীকে শোকজও করা হয়েছে।
হবিগঞ্জ-১ (নবীগঞ্জ-বাহুবল) আসনের বিএনপি মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থী রেজা কিবরিয়াকে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে নির্বাচনী অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটি। কমিটির চেয়ারম্যান ও আজমিরীগঞ্জ সিভিল জজ আদালতের বিচারক সায়দুর রহমান বুধবার এ শোকজ নোটিশ দেন। এতে আগামী ১৪ জানুয়ারির মধ্যে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নোটিশে উল্লেখ করা হয়, গত ২ জানুয়ারি সন্ধ্যা ৬টার দিকে নবীগঞ্জ উপজেলার ইমামবাড়ী বাজার এলাকায় রেজা কিবরিয়া তার কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে লিফলেট ও হ্যান্ডবিল বিতরণ করে নির্বাচনী প্রচারণা চালান।
এছাড়া নওগাঁ-৪ (মান্দা) আসনে বিএনপির প্রার্থী ইকরামুল বারীকেও (টিপু) নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে বুধবার শোকজ করা হয়েছে।
কারণ দর্শানোর নোটিশে বলা হয়, নির্বাচনী অনুসন্ধান কমিটির কাছে আসা একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, মঙ্গলবার (৫ জানুয়ারি) কয়াপাড়া-কামারকুড়ি উচ্চবিদ্যালয় মাঠে দোয়া মাহফিল ও শোকসভা ব্যানারে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি ধানের শীষের পক্ষে ভোট চান। একই দিনে তার ভেরিফায়েড ফেসবুক প্রোফাইলে বিভিন্ন এলাকায় গণসংযোগের ভিডিও-ও প্রকাশ করা হয়।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ টিবিএসকে বলেন, "প্রচারণার নির্ধারিত সময়ের আগে প্রার্থী কিংবা প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণার সুযোগ নেই। কেউ বিধি ভঙ্গ করলে বিষয়টি রিটার্নিং কর্মকর্তাদের নজরে এলে তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন। প্রতীক বরাদ্দের আগে কোনো প্রার্থীই প্রচারণা চালাতে পারবেন না।"
