মাঠে নেমে যে রাজনৈতিক সৌজন্য আশা করেছিলাম, তা আমরা পাইনি: জামায়াত নেতা দেলাওয়ার
মাঠে নেমে যে রাজনৈতিক সৌজন্য প্রত্যাশা করা হয়েছিল, বাস্তবে তার প্রতিফলন মেলেনি বলে মন্তব্য করেছেন ঠাকুরগাঁও-১ আসনের ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নেতা মো. দেলাওয়ার হোসেন।
নির্বাচনী প্রচারণার শেষ সময়ে তিনি বলেন, "মাঠে নেমে যে রাজনৈতিক সৌজন্য, বড়ত্ব ও মহানুভবতা প্রত্যাশা করেছিলাম, দুর্ভাগ্যজনকভাবে তার প্রতিফলন আমরা পাইনি। বরং আমাদের প্রতি কঠোরতা, প্রতিহিংসা ও বিদ্বেষমূলক আচরণ করা হয়েছে।"
"তবে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি—হেরে যাবে হিংসা, বিদ্বেষ ও নিন্দাবাদ; আর জয় হবে আমাদের ধৈর্য, ভালোবাসা ও আন্তরিকতার ইনশাআল্লাহ," যোগ করেন তিনি।
সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) রাত সাড়ে ৯টার দিকে ঠাকুরগাঁও-১ আসনের নির্বাচনী এলাকার পৌর শহরের গোয়ালপাড়া সবুজ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত এক নির্বাচনী সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
দেলাওয়ার হোসেন বলেন, "আমরা প্রতিপক্ষের প্রতি সহানুভূতি দেখিয়েছি, ভালোবাসা দেখিয়েছি, শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শন করেছি। কিন্তু এর বিপরীতে আমাদের প্রতি যখন প্রতিহিংসাপরায়ণ আচরণ করা হয়, তখন আমি স্পষ্টভাবে বলেছি—এই হিংসা ও বিদ্বেষের রাজনীতি টিকবে না।"
তিনি আরও বলেন, "আগামী ১২ তারিখ ইনশাআল্লাহ প্রমাণ হবে, জনগণ ভালোবাসা ও ন্যায়ের পক্ষেই রায় দেয়।"
প্রচারণার শেষ পর্যায়ে ভোটারদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, "আমি আপনাদের কাছে কোনো অন্ধ সমর্থন চাই না। আমি চাই আপনারা আপনাদের বিবেককে প্রশ্ন করুন, যাকে ভোট দেবেন, তাকে কি কাছে পাবেন? সে কি আপনার সুখে-দুঃখে পাশে দাঁড়াবে? সে কি শারীরিকভাবে ও মানসিকভাবে আপনাদের পাশে থাকার সক্ষমতা রাখে?"
তিনি বলেন, "একটু ভাবুন, কে ঠাকুরগাঁওয়ের জন্য কাজ করবে? কে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ পরিবেশ গড়ে দেবে? কে আপনার আমার সন্তানের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার সাহস ও সততা রাখে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজেই আপনারা সিদ্ধান্ত নিন।"
বিগত সরকারের সময় নিজের কারাবরণের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে দেলাওয়ার হোসেন বলেন, "সাড়ে পাঁচ বছর কারাগারে আমার জীবন কেটেছে। প্রায় ২০০টি মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা দিয়ে আমাকে নানাভাবে চাপে রাখা হয়েছিল।"
"৫৭ দিনের রিমান্ডে নিয়ে বর্বর ও নিষ্ঠুর নির্যাতনের মাধ্যমে আমাকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। সেই ইতিহাস আপনারা জানেন। আপনারাই আমার জন্য কেঁদেছেন, দোয়া করেছেন, রোজা রেখেছেন, তাহাজ্জুদের নামাজে চোখের পানি ঝরিয়েছেন," যোগ করেন তিনি।
আবেগঘন কণ্ঠে তিনি বলেন, "আল্লাহ আপনাদের দোয়া কবুল করেছেন। যেখান থেকে কেউ কোনোদিন ফিরে আসেনি, সেখান থেকে আল্লাহ আমাকে ফিরিয়ে এনেছেন, সুস্থ করেছেন এবং আজ আপনাদের সামনে কথা বলার সুযোগ দিয়েছেন।"
তিনি বলেন, "বাকি জীবনটুকু যেন আল্লাহর গোলামী করে, মানুষের সেবা ও মানবতার কল্যাণে কাটাতে পারি—এই দোয়া চাই।"
ছাত্রজীবন থেকে সমাজসেবার সঙ্গে যুক্ত থাকার কথা উল্লেখ করে দেলাওয়ার হোসেন বলেন, "আল্লাহ যদি আপনাদের ভোটে আমাকে বিজয়ী করেন, তাহলে মানবতার সেবা আরও সহজ ও ব্যাপকভাবে করার সুযোগ সৃষ্টি হবে।"
দেলাওয়ার হোসেন স্পষ্ট করে বলেন, "আমি বিলাসবহুল গাড়ি, বাড়ি বা আরাম-আয়েশের জন্য এমপি হতে চাই না। আমি জনপ্রতিনিধি হতে চাই আপনাদের জন্য কিছু করতে চাই।"
তিনি বলেন, "আমি মজলুম মানুষের পক্ষে কাজ করতে চাই, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখতে চাই। যারা মিথ্যা মামলায় হয়রানির শিকার, যারা চাঁদাবাজির কারণে নিঃস্ব—আমি তাদের পাশে থাকতে চাই।"
সবার কাছে একবার সুযোগ চেয়ে দেলাওয়ার হোসেন বলেন, "আমি কথা দিচ্ছি, আপনাদের স্বপ্নের ঠাকুরগাঁও গড়ে দেব। এমন ঠাকুরগাঁও, যেখানে আমাদের সন্তানেরা বড় হয়ে বলবে, আমাদের বাবা-দাদাদের সময় যে ঠাকুরগাঁও ছিল, আমরা তার চেয়েও ভালো ঠাকুরগাঁও পেয়েছি।"
নিজের তারুণ্যের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, "আমি তরুণ ও যুবক। ইতিহাস সাক্ষী, পৃথিবীর প্রতিটি বড় পরিবর্তন এসেছে তরুণদের হাত ধরেই। আমরাও আপনাদের সঙ্গে নিয়ে আগামী দিনের পরিবর্তনের ঠাকুরগাঁও গড়বো ইনশাআল্লাহ।"
ভোটারদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, "আমাকে পাওয়ার জন্য আপনাদের কোনো সিরিয়াল লাগবে না, কোনো নেতার দরজায় ঘুরতে হবে না। আমি নিজেই আপনাদের কাছে আসবো। আপনারা সরাসরি আমার সঙ্গে দেখা করতে পারবেন, কথা বলতে পারবেন।"
তিনি আরও বলেন, "আমার সঙ্গে যারা থাকবেন, তারাও আপনাদের হক নষ্ট করবেন না। প্রার্থী শুধু নয়, প্রার্থীর আশপাশের মানুষগুলোকেও দেখে-বুঝে ভোট দেওয়ার অনুরোধ জানাই। কারণ একটা সময় হয়তো আমি ঢাকা বা বাইরে কোথাও থাকবো। তখন তো ঠাকুরগাঁওয়ে আমার সঙ্গী সাথীরাই আপনাদের সঙ্গে ও পাশে থাকবেন। তখন যদি তারা আপনাদের উপর জুলুম নির্যাতন চালায়; আপনাদের হক মেরে খায়, তাহলে তো হলো না। এই নিয়ন্ত্রণটা আমার নিজেরও থাকতে হবে এবং আমার সঙ্গে যারা থাকে তারা এরকম কেউ না।"
সবশেষে তিনি বলেন, "মজলুম মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার যে আন্দোলন শুরু হয়েছে, সেই লড়াইয়ে আপনাদের সঙ্গে নিয়েই আমরা জিতবো ইনশাআল্লাহ। আগামী ১২ তারিখ ন্যায় ও ইনসাফের পক্ষে আপনার মূল্যবান ভোট প্রদান করবেন।"
সভায় ১১ দলীয় জোটের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ, স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন।
