ভোটে দেশব্যাপী এগিয়ে বিএনপি, খুলনায় জামায়াতের আধিপত্য
সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেশব্যাপী সর্বোচ্চ ভোট পেয়েছে বিএনপি। তবে আঞ্চলিক ফলাফলে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র—দেশের আটটি বিভাগের মধ্যে খুলনা বিভাগে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ভোটের হার সবচেয়ে বেশি। এ বিভাগে জামায়াত বিএনপিকে ছাড়িয়ে গেছে।
খুলনা বিভাগের ৩৬টি সংসদীয় আসনে জামায়াত প্রার্থীরা পেয়েছেন ৪৮.২৬ শতাংশ ভোট, যেখানে বিএনপি পেয়েছে ৪৩.৫৫ শতাংশ।
এই বিভাগে ৩৬টি আসনের মধ্যে জামায়াত জয় পেয়েছে ২৫টিতে, আর বিএনপি জয় পেয়েছে ১১টিতে। জামায়াতের জাতীয় পর্যায়ের মোট জয়ের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি এসেছে এই বিভাগ থেকেই।
খুলনা বিভাগের সাতক্ষীরা, চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুরে কোনো আসনেই জয় পায়নি বিএনপি। অন্যদিকে মাগুরা ছাড়া সব জেলাতেই জয় পেয়েছে জামায়াত। যশোরের ছয়টি আসনের মধ্যে একটি ছাড়া বাকি কোনো আসনেই জয় পায়নি বিএনপি।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও সমন্বয়ের ঘাটতি এ অঞ্চলে বিএনপির দুর্বল ফলাফলের প্রধান কারণ। এতে স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচনী প্রচারণা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন খোকন বলেন, হতাশাজনক এই ফলাফল পর্যালোচনা করছে দলটি। তিনি বলেন, "মনোনয়ন সংক্রান্ত কয়েকটি সিদ্ধান্ত যথাযথভাবে নেওয়া হয়নি, এতে নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। অনেক নেতা মনোনয়ন না পেয়ে প্রচারণায় নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন, যা সাংগঠনিক কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।"
যশোর-১ (শার্শা) আসনে বিএনপি প্রথমে তৃণমূল পর্যায়ে জনপ্রিয় মফিকুল হাসান তৃপ্তিকে মনোনয়ন দিলেও পরে তাকে বাদ দিয়ে নুরুজ্জামান লিটনকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। এতে তৃপ্তির অনেক সমর্থক প্রচারণা থেকে সরে দাঁড়ান।
একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয় যশোর-৬ (কেশবপুর) আসনেও। সেখানে প্রথমে মনোনয়ন পাওয়া রওনকুল ইসলাম শ্রাবণের পরিবর্তে আবুল হোসেন আজাদকে প্রার্থী করা হলে স্থানীয় নেতাকর্মীদের একটি অংশ নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। এ সুযোগে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী মুক্তার আলী তার প্রচারণা আরও জোরদার করেন।
অন্যান্য আসনেও বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে বিভাজনের কারণে ভোটের হিসাবে জামায়াত এগিয়ে গেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে, ময়মনসিংহ বিভাগের তিনটি আসনের প্রাপ্ত ভোটের হিসাবে দেখা গেছে, সেখানে জামায়াতে ইসলামীর ভোটের হার ২১.৮৫ শতাংশ, যেখানে বিএনপি পেয়েছে ৫১.৬০ শতাংশ ভোট।
রাজশাহী ও রংপুর বিভাগেও জামায়াতের ভোটের হার প্রায় ৪০ শতাংশ। সব মিলিয়ে আটটি বিভাগের ২৮৯টি আসনে জামায়াতের মোট ভোটের হার ৩১.৯৯ শতাংশ। এর বাইরে এনসিপির ভোটের হার ৩.০৮ শতাংশ।
অন্যদিকে বিএনপির মোট ভোটের হার ৪৯.৬ শতাংশ।
জামায়াত সবচেয়ে কম ভোট পেয়েছে সিলেট বিভাগে, যেখানে ভোটের হার ২২.৬২ শতাংশ। তবে এ বিভাগের ১৯টি আসনের মধ্যে প্রাপ্ত ১০টি আসনের ফলাফলের ভিত্তিতে এ হিসাব করা হয়েছে। এছাড়া ঢাকা বিভাগে জামায়াতের ভোটের হার ২২.৩৮ শতাংশ, বরিশালে ২৩.৪৬ শতাংশ এবং চট্টগ্রামে ২৮ শতাংশ।
বিএনপি সবচেয়ে কম ভোট পেয়েছে রংপুর বিভাগে, যেখানে দলটির ভোটের হার ৪২ শতাংশের কিছুটা কম। এর পর দ্বিতীয় সর্বনিম্ন ভোটের হার খুলনা বিভাগে, ৪৩.৫৫ শতাংশ।
অন্যদিকে বিএনপি সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়েছে সিলেট বিভাগে, যেখানে ভোটের হার প্রায় ৬০ শতাংশ। তবে এ বিভাগের ১৯টি আসনের মধ্যে প্রাপ্ত ১০টি আসনের ফল বিশ্লেষণের ভিত্তিতে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
এ ছাড়া বিভাগভিত্তিক বিএনপির ভোটের হার হলো—রাজশাহী ৫৩.৮৮ শতাংশ, চট্টগ্রাম ৫২ শতাংশ, ময়মনসিংহ ৫২ শতাংশ, ঢাকা ৫১ শতাংশ এবং বরিশাল ৪৭ শতাংশ।
বিভাগভিত্তিক এই পরিসংখ্যান থেকে দেশজুড়ে বিএনপি ও জামায়াতের নির্বাচনী শক্তির ভিন্নতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। জাতীয়ভাবে বিএনপি এগিয়ে থাকলেও খুলনা বিভাগকে জামায়াতের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে দেখা যাচ্ছে।
