শেষ হলো প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রচারণা, ভোটের অপেক্ষায় দেশ
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং গণভোটের সব ধরনের প্রচার-প্রচারণা আজ সোমবার শেষ হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) বিধিমালা অনুযায়ী, ভোটগ্রহণের ৪৮ ঘণ্টা আগে থেকে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের সব ধরনের প্রচার কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকবে। এই হিসেবে আজ সকাল সাড়ে ৭টা থেকে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে। এই সময়ে কোনো সভা, সমাবেশ, মিছিল, পোস্টার ক্যাম্পেইন, লিফলেট বিতরণ বা সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারণামূলক কার্যক্রম চালানো যাবে না।
ইসি সচিবালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ বলেন, 'নির্বাচন কমিশন আইন ও বিধি অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের পর প্রচারণা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। যদি কেউ এই নির্দেশনা অমান্য করেন, তবে তাৎক্ষণিক আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'
ইসির দাবি, এবারের নির্বাচনী পরিবেশ অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভালো। কমিশন কর্মকর্তারা বলছেন, নির্বাচনী সহিংসতা, বড় ধরনের সংঘাত বা ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ আগের তুলনায় কম। মাঠ পর্যায়ের প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্রিয় অংশগ্রহণের ফলে পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার টিবিএসকে বলেন, 'নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে আমি স্পষ্টভাবে বলতে চাই—উদ্বেগের কোনো কারণ নেই। সবার সহযোগিতায় নির্বাচন ঘিরে থাকা শঙ্কা আমরা ইতিমধ্যে কাটিয়ে উঠেছি। ইনশাআল্লাহ, ১২ ফেব্রুয়ারি আমরা একটি সুন্দর, শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দিতে পারব। বাংলাদেশের ইতিহাসের সব নির্বাচনের তুলনায় এবারের পরিবেশ ভালো।'
তিনি জানান, নির্বাচনকালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সব বাহিনী মিলিয়ে প্রায় ১১ থেকে ১২ লাখ সদস্য মোতায়েন থাকবে। 'সবার একটাই লক্ষ্য—বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম সেরা একটি নির্বাচন উপহার দেওয়া।'
এছাড়া ১ হাজার ৫১ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করছেন এবং তারা ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মাঠে থাকবেন।
এদিকে, অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ভোট নিশ্চিত করতে সাড়ে ৮২ ঘণ্টার জন্য বহিরাগতদের নিজ এলাকার বাইরে অবস্থান বা যাতায়াতের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে ইসি। গতকাল ইসি জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব মো. শহিদুল ইসলামের পাঠানো নির্দেশনায় সারাদেশের জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার এবং পুলিশ কমিশনারদের এই সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়।
ইসির সিদ্ধান্তে বলা হয়, আজ সকাল ৭টা থেকে (ভোট শুরুর ৪৮ ঘণ্টা আগে) ১৩ ফেব্রুয়ারি বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত (ভোট শেষ হওয়ার ২৪ ঘণ্টা পর) এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে।
বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত সারাদেশে একযোগে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। ২৯৯টি সংসদীয় আসনে ব্যালট পেপার এবং স্বচ্ছ ব্যালট বাক্সে ভোট নেওয়া হবে। একই দিন গণভোটও অনুষ্ঠিত হবে। প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে একটি আসনে ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়েছে।
ইসির তথ্যমতে, এবারের নির্বাচনে মোট ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৮৯৯ জন। সারাদেশে ৪২ হাজারেরও বেশি ভোটকেন্দ্র এবং প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার ভোটকক্ষ স্থাপন করা হয়েছে। ইসি জানিয়েছে, প্রতিটি কেন্দ্রে প্রয়োজনীয় লজিস্টিক এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে।
শেষ মুহূর্তে ইসিতে অভিযোগের পাহাড়
নির্বাচনী প্রচারণার শেষ পর্যায়েও ইসিতে অভিযোগ জমা পড়া অব্যাহত রয়েছে। গতকাল ১১ দলীয় জোটের নেতারা প্রধান নির্বাচন কমিশনারের (সিইসি) সঙ্গে দেখা করে বিভিন্ন অভিযোগ তুলে ধরেন। এছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম এবং কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীও অভিযোগ জানিয়েছেন।
আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, 'আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে থাকা কিছু কর্মকর্তার ভূমিকা অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের অনুকূল নয়। তাদের যথাযথ নির্দেশনা দেওয়া এবং প্রয়োজনে প্রত্যাহার করা দরকার; অন্যথায় এসব এবং আরও কিছু এলাকায় নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না।'
এনসিপি মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, ইসি কিছু সিদ্ধান্ত চাপের মুখে নিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। 'উদাহরণস্বরূপ, একটি দলের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে আমরা কেন্দ্রে বিএনসিসি মোতায়েন না করার অবস্থানের কথা শুনেছি। প্রশাসনিক রদবদল নিরপেক্ষ ও রুটিন মাফিক হওয়া উচিত ছিল, কিন্তু আমরা দেখছি নির্দিষ্ট কিছু দলকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। যখন একটি বিশেষ দলের প্রার্থীরা অভিযোগ করেন, তখন কর্মকর্তাদের তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাহার করা হয়।'
তিনি আরও বলেন, তাদের প্রার্থীদের জমা দেওয়া লিখিত অভিযোগের কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। 'আমাদের ভোটার এবং নির্বাচনী স্বেচ্ছাসেবক—বিশেষ করে নারী স্বেচ্ছাসেবকরা—বারবার হামলা, সাইবার বুলিং এবং শারীরিক লাঞ্ছনার শিকার হচ্ছেন। এই আসনগুলোর জন্য সুনির্দিষ্ট ও লক্ষ্যভিত্তিক পরিকল্পনা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি স্পষ্ট নির্দেশনা থাকা উচিত।'
সিইসির সঙ্গে বৈঠকের পর ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম অভিযোগ করেন, নির্বাচনের পরিবেশ নষ্ট করার চেষ্টা চলছে।
কাদের সিদ্দিকী সিইসির সঙ্গে বৈঠকের পর গণমাধ্যমকে বলেন, তিনি রাস্তায় জনগণের মধ্যে সাধারণ উৎসাহ দেখছেন না। তিনি অভিযোগ করেন, টাঙ্গাইলের কিছু এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী রাতে বাড়িঘরে হানা দিচ্ছে এবং গ্রেপ্তার করছে। ইসি তার অভিযোগ শুনেছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে।
এদিকে, নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে সারাদেশের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা ৪৬১টি ঘটনায় ২৫৯টি মামলা করেছেন এবং ৩ কোটি ২১ লাখ ৫৯ হাজার ৯৫০ টাকা জরিমানা করেছেন।
গণভোট ও ১৩তম সংসদ নির্বাচনের কেন্দ্রীয় সমন্বয় কমিটির সদস্য সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানান, এই ব্যবস্থাগুলো ৮ জানুয়ারি থেকে ৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, গত ৩ ফেব্রুয়ারি সর্বোচ্চ ৩৩টি লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটে, যার ফলে ১৩টি মামলা হয় এবং মোট ২ লাখ ৫৪ হাজার ৪০০ টাকা জরিমানা করা হয়।
