সোশ্যাল মিডিয়া যেভাবে বিজয়কে রাজনৈতিক 'সুপারস্টারে' পরিণত করেছে
ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য তামিলনাড়ুর সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে প্রচারণা চালানোর সময় মাধার বদরুদ্দিনের ছবি যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত হয়, তখন খুব কম মানুষই ভেবেছিল যে তার জয়ের কোনো সম্ভাবনা আছে।
বদরুদ্দিন 'তামিলগা ভেট্টি কাড়াগাম' (টিভিকে) নামের একটি রাজনৈতিক দলের সদস্য। দলটির নেতৃত্বে আছেন চলচ্চিত্র তারকা থেকে রাজনীতিবিদ হওয়া চন্দ্রশেখর জোসেফ বিজয়, যিনি 'থালাপতি বিজয়' নামে জনপ্রিয়। তিনি মাদুরাই কেন্দ্রীয় আসন থেকে নির্বাচন করেন। এই এলাকাতেই অবস্থিত জনপ্রিয় হিন্দু উপাসনালয় মীনাক্ষী অম্মান মন্দির।
গত মাসে নির্বাচনের আগে ৪২ বছর বয়সী মাংস ব্যবসায়ী বদরুদ্দিনকে দলের সমর্থকদের একটি দল নিয়ে ভোট চাইতে দেখা যায়।
বিপরীতে, প্রভাবশালী আঞ্চলিক দলগুলোর—দ্রাবিড় মুনেত্র কাড়াগাম (ডিএমকে) এবং অল ইন্ডিয়া আন্না দ্রাবিড় মুনেত্র কাড়াগাম (এআইএডিএমকে)—তার দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর ছিল বিশাল জনসভা, রঙিন মিছিল এবং তাদের পক্ষে প্রচারণায় ছিলেন উচ্চপর্যায়ের জ্যেষ্ঠ নেতা ও তারকারা।
তার প্রতিদ্বন্দ্বীরাও ছিলেন অত্যন্ত প্রভাবশালী। ডিএমকে প্রার্থী ছিলেন রাজ্যের মন্ত্রী এবং জ্যেষ্ঠ নেতা পালানিভেল থিয়াগা রাজন এবং এআইএডিএমকে-এর পক্ষে ছিলেন সুপরিচিত অভিনেতা-পরিচালক সুন্দর সি।
তাই কেউই, এমনকি রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরাও মনে করেননি যে টুপি পরা একজন মুসলিম প্রার্থী, যিনি বিখ্যাত মন্দিরনগরীর হিন্দু-অধ্যুষিত কেন্দ্রীয় অঞ্চল থেকে নির্বাচন করছেন, তিনি জয়ী হতে পারেন। তিনি কোনো প্রভাবশালী পরিবার বা রাজনৈতিক বংশ থেকেও আসেননি। এমনকি দলের নেতা বিজয়ও তার এলাকায় গিয়ে প্রচারণা চালাননি।
কিন্তু গত সপ্তাহে বদরুদ্দিন তার শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বীদের হারিয়ে ১৯ হাজারেরও বেশি ভোটের ব্যবধানে জয়ী হন।
বদরুদ্দিন বিবিসিকে বলেন, 'আমার একমাত্র শক্তি ছিলেন আমাদের নেতা বিজয় এবং দলের নির্বাচনি প্রতীক বাঁশি। আমি আমাদের নেতার নীতির ভিত্তিতে প্রচারণা চালিয়েছি এবং দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছি।'
তিনি একমাত্র চমক ছিলেন না। বিজয়ের দলের প্রার্থীরা—যাদের বেশিরভাগই ছিলেন প্রথমবারের মতো নির্বাচনে অংশ নেওয়া—১০৮টি আসনে জয় পান। ফলে ২৩৪ সদস্যের বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে মাত্র ১০টি আসন দূরে থেকে বিজয়ের দল ভারতের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম বড় অঘটন ঘটায়। কয়েকদিনের অনিশ্চয়তার পর রোববার বিজয় রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।
ভারতের নির্বাচনি রাজনীতি সাধারণত অর্থ, বর্ণ এবং ধর্ম দ্বারা প্রভাবিত হয়। বিজয় যদিও রাজ্যের সবচেয়ে পরিচিত মুখগুলোর একজন, তবু তিনি মোট মিলিয়ে তিন সপ্তাহেরও কম সময় সরাসরি প্রচারণা চালিয়েছেন। গত বছরের সেপ্টেম্বরে তার এক সমাবেশে পদদলিত হয়ে কয়েক ডজন মানুষের মৃত্যু হলে তিনি দুই মাসেরও বেশি সময় প্রচারণা থেকে বিরতি নেন।
কিছু জায়গায় তার সমাবেশ বাতিলও করা হয়, যার কারণ হিসেবে দল 'লজিস্টিক সমস্যা' ও সময়ের অভাবের কথা বলেছিল।
তাই প্রশ্ন থেকে যায়, বদরুদ্দিনের মতো প্রার্থীরা মাঠপর্যায়ে কম দৃশ্যমান থাকা সত্ত্বেও কীভাবে জয় পেলেন?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এর বড় অংশের উত্তর লুকিয়ে আছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। আড়ালে থেকে টিভিকের হাজার হাজার 'সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যোদ্ধা' বদরুদ্দিনসহ অন্য প্রার্থীদের জন্য নিরলসভাবে অনলাইনে প্রচারণা চালিয়েছেন।
বেঙ্গালুরু-ভিত্তিক গণমাধ্যম কৌশলবিদ অনুপ চন্দ্রশেখরন বলেন, 'সম্ভবত এটি ছিল ভারতের প্রথম নির্বাচন, যা প্রায় পুরোপুরি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সহায়তায় জেতা হয়েছে।'
তিনি বলেন, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুকসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে ব্যবহার করে বিজয়ের সমর্থকেরা 'একটি ডিজিটাল বিপ্লবের সূচনা করেছেন।'
ভারতের নির্বাচন সাধারণত বিশাল জনসভা, উত্তেজনাপূর্ণ ভাষণ, ব্যানার, বাড়ি বাড়ি প্রচারণা এবং ব্যাপক গণমাধ্যম প্রচারের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম স্মার্টফোন বাজার হিসেবে ডিজিটাল প্রচারণার ভূমিকা থাকলেও বিজয়ের সমর্থকেরা প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিলেন।
গত বছর সক্রিয় রাজনৈতিক প্রচারণা শুরু করার পর বিজয় কোনো গণমাধ্যম সাক্ষাৎকার দেননি বা সংবাদ সম্মেলনও করেননি। তার জনসভায় দেওয়া বক্তব্যও অন্যান্য নেতাদের তুলনায় অনেক ছোট ছিল। বরং তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে সরাসরি সমর্থকদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন।
কিন্তু বিজয়ের প্রতিটি উপস্থিতিকে অনলাইনে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। তার বক্তব্য ও সংলাপগুলোকে ইনস্টাগ্রাম রিলস ও ইউটিউব শর্টসে রূপান্তর করা হয়, এরপর সেগুলো হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। পুরোনো ও নতুন সমর্থকেরা 'বাঁশি' প্রতীকে ভোট দেন এই আশায় যে নতুন একজন নেতা ইতিবাচক পরিবর্তন আনবেন।
উদাহরণস্বরূপ, মাদুরাই শহরের একটি দলীয় সম্মেলন থেকে বিজয়ের একটি সম্পাদিত সেলফি ভিডিও ২৪ ঘণ্টায় প্রায় ৯০ মিলিয়ন ভিউ পেয়েছে।
তার অনেক চলচ্চিত্রে তিনি দুর্নীতি, অবিচার ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করা ক্ষুব্ধ মানুষের চরিত্রে অভিনয় করেছেন। তিনি নিজেকে বঞ্চিত ও নীরব মানুষের পক্ষে দাঁড়ানো সামাজিক ন্যায়বিচারের রক্ষক হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। এতে তিনি ভক্তদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন।
বিজয়ের সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর একটি ছিল তামিল চলচ্চিত্র শিল্পে ৩০ বছরের ক্যারিয়ারে গড়ে তোলা প্রায় ৮৫ হাজার ফ্যানক্লাবের নেটওয়ার্ক।
দুই বছর আগে তিনি দল গঠন করলে তার বিশাল ভক্ত গোষ্ঠী একটি সংগঠিত রাজনৈতিক যন্ত্র এবং দক্ষ অনলাইন বাহিনীতে পরিণত হয়, যারা তার প্রচারণার উপকরণ ও বক্তব্যের অংশগুলো ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেয়।
চন্দ্রশেখরন বলেন, 'বিজয়ের সরাসরি প্রচারণা ছিল সীমিত। কিন্তু ভার্চুয়াল প্রচারণার সেই অদৃশ্য শক্তি ছিল অত্যন্ত কার্যকর। প্রচলিত জনমত জরিপ ও পর্যবেক্ষকেরা এই প্রবণতাকে ধরতে পারেননি।'
তিনি বলেন, বিজয়ের প্রতিটি সমাবেশ দ্রুত দ্বিতীয় একটি 'ডিজিটাল জীবন' পেয়ে যেত। তার দল ও সমর্থকেরা দ্রুত বক্তব্যগুলোকে ছোট ছোট আকর্ষণীয় ভিডিওতে রূপান্তর করতেন এবং কয়েক মিনিটের মধ্যেই সেগুলো ইউটিউবসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে দিতেন। প্রতিদ্বন্দ্বীদের সমালোচনার জবাব দেওয়া এবং প্রচারণার উপকরণ তৈরি করতেও দলের অর্থসমৃদ্ধ ও সুসংগঠিত তথ্যপ্রযুক্তি শাখা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
চন্দ্রশেখরন বলেন, 'এই কার্যক্রমের মডেলে উপস্থিতি, বিষয়বস্তু, নেটওয়ার্ক, সময়, গতি ও প্রতীক—সবকিছুকে একত্র করে একটি ধারাবাহিক প্রবাহ তৈরি করা হয়েছিল।'
এই কৌশলটি বিশেষভাবে নতুন প্রজন্মের ভোটার এবং নারীদের মধ্যে সাড়া ফেলেছে, যারা বিপুল সংখ্যায় বিজয়কে সমর্থন করেছেন। ভোটারদের প্রভাবিত করার অভিযোগ ছাড়া তামিলনাড়ুতে কোনো দলের এমন সাফল্য অর্জন বিরল ঘটনা।
তবে দীর্ঘমেয়াদে চন্দ্রশেখরন সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন।
তিনি বলেন, 'এই মডেল কাজ করেছে কারণ বিজয়ের অতীতের কোনো রাজনৈতিক বোঝা নেই এবং তিনি নতুন মুখ। কিন্তু ক্ষমতায় এসে তাকে কাজ দেখাতে হবে। একই সঙ্গে দলের সাংগঠনিক কাঠামোও শক্তিশালী করতে হবে—শুধু ডিজিটাল জগতে প্রচারণা চালিয়ে চলবে না।'
মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার প্রাক্কালে অনেকেই অভিনেতা বিজয়ের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার অভাব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।
তবে তার দলের সহকর্মীরা বলছেন, তারা এ নিয়ে উদ্বিগ্ন নন।
বদরুদ্দিন বলেন, '১৯৬৭ সালে যখন ডিএমকে ক্ষমতায় এসেছিল তখন তাদের কী ধরনের অভিজ্ঞতা ছিল? আমাদের লক্ষ্য একটি স্বচ্ছ প্রশাসন প্রদান করা এবং আমাদের নেতা সেটি করতে পারবেন।'
এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে বিজয় ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। তিনি একাই তামিলনাড়ুর প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক শক্তি দ্রাবিড় মুনেত্র কাড়াগাম (ডিএমকে) এবং অল ইন্ডিয়া আন্না দ্রাবিড় মুনেত্র কাড়াগামের (এআইএডিএমকে) বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন।
তবে উদ্যাপনের মধ্যেও এখন উপলব্ধি বাড়ছে যে, নির্বাচনে জয় পাওয়াই রাজনীতির শেষ কথা নয়; বরং সেটাই শুরু।
থালাপতি বিজয় এবং তার ভার্চুয়াল যোদ্ধাদের জন্য বাস্তব জীবনের চ্যালেঞ্জ এখনই শুরু হচ্ছে।
