সোমবার গাজায় পৌঁছাতে পারেন শহিদুল আলম; দিতে চান চিকিৎসাসেবা, জানাতে চান গাজার খবর
আলোকচিত্রী শহিদুল আলম বলেছেন, তারা আগামী সোমবার গাজায় পৌঁছাবেন। সেখানে পৌঁছানোর পর তারা গাজার খবরাখবর তুলে ধরতে এবং ফিলিস্তিনিদের চিকিৎসাসেবা প্রদান করতে চান। আজ শনিবার বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যায় দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে ভার্চ্যুয়ালি দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা জানান।
গাজা অভিমুখে কনশানস নামের একটি নৌযানটিতে আছেন দৃকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও আলোকচিত্রী শহিদুল আলম। এটি ফ্রিডম ফ্লোটিলা কোয়ালিশন (এফএফসি) ও থাউজেন্ড ম্যাডলিনস টু গাজার (টিএমটিজি) জাহাজ। ইসরায়েলের অবরোধ ভাঙতে ও গাজায় ত্রাণ পৌঁছাতে গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলার অংশ হিসেবে এই প্রচেষ্টা।
শহিদুল আলমের সঙ্গে যখন কথা হচ্ছিল, তখন জানা গেল 'কনশানস' নৌযানটির অবস্থান গাজা থেকে প্রায় ৩৭০ নটিক্যাল মাইল দূরে।
শহিদুল আলম জানালেন, কতটুকু দূরত্বে আছি সেটি গুরুত্বপূর্ণ নয়। ইসরায়েল সাধারণত এর অনেক আগেই পথরোধ করে। তার ধারণা, প্রায় ২০০ নটিক্যাল মাইল দূরে থাকতেই হয়তো ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী তাদের জাহাজে ওঠার চেষ্টা করতে পারে।
গত বৃহস্পতিবার (২ অক্টোবর) গাজায় ত্রাণ বহনকারী একটি ফ্লোটিলার প্রায় ৪০টি জাহাজের প্রায় সবকটিকে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী আটক করে। এতে ইসরায়েল বিরুদ্ধে বিশ্বের বহু দেশ নিন্দা জানায়। অনেকে দেশে ইসরায়েলের এই কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদে বিক্ষোভ-মিছিলও হয়। এছাড়াও ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী সুইডিশ আন্দোলনকর্মী গ্রেটা থুনবার্গসহ ৪৫০ জনেরও বেশি বিদেশি কর্মীকে বন্দি করেছে।
এসব ঘটনার জেরে শহিদুল আলম বলেন, ''যেহেতু 'কনশানস' আগের জাহাজগুলোর চেয়ে অনেক বড়, তাই আমরা ধারণা করছি না যে তারা নৌকা থেকে এতে উঠবে। এর পরিবর্তে, তারা সম্ভবত হেলিকপ্টারে করে এসে এই জাহাজে অবতরণ করবে। কারণ, এত উঁচু একটি জাহাজে নিচ থেকে ওঠা কঠিন হবে।''
তিনি যোগ করেন, 'আমরা এমনটাই আশঙ্কা করছি এবং সে অনুযায়ী প্রস্তুতি নিচ্ছি।'
জাহাজে ওঠার পর গত কয়েক দিনে শহিদুল আলম সামুদ্রিক প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছেন। তিনি অসুস্থ বোধ করার কথাও জানান। ঝড়ের বিষয়ে সতর্কতা ও সামনের কয়েকটি জাহাজ আটকের খবরের মধ্যেই তাদের নৌবহরটি গাজা অভিমুখে এগিয়ে চলছে।
গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা গত ৩১ আগস্ট বার্সেলোনা থেকে যাত্রা শুরু করে। শহিদুল আলম গত ৩০ সেপ্টেম্বর ইতালি হয়ে 'কনশানস' জাহাজে ওঠেন।
আয়োজকরা এটিকে গাজার উদ্দেশে পরিচালিত সবচেয়ে বড় সামুদ্রিক মিশন হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এতে ৪৪টি দেশের প্রায় এক হাজার কর্মী, রাজনীতিবিদ, ডাক্তার, সাংবাদিক ও শিল্পী রয়েছেন, যারা ইসরায়েলের অবরোধ ভাঙতে ও গাজায় ত্রাণ পৌঁছাতে বৈশ্বিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে একত্র হয়েছেন।
সম্ভাব্য বাধা বা বিপদের মোকাবিলায় জাহাজে কী ব্যবস্থা রয়েছে, তা জানতে চাইলে শহিদুল আলম জানান, তাদের নৌযানটি কোনো ধরনের আক্রমণ প্রতিরোধ করার উপযোগী নয়।
তিনি বলেন, 'আমরা সচেতনভাবে কোনো সহিংস অবস্থান না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এর পরিবর্তে, আমরা আমাদের সব ডেটা সুরক্ষিত করা এবং সাইবার নিরাপত্তা জোরদার করার দিকে মনোনিবেশ করছি। এছাড়াও, অত্যন্ত যোগ্য আইনজীবীরা আমাদের নির্দেশনা দিয়েছেন যে কী আশা করা যেতে পারে এবং কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে হবে এবং ফিলিস্তিন ও অন্যান্য জায়গায় আমাদের দল রয়েছে, যারা ইতোমধ্যে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিচ্ছে।'
শহিদুল আলম বলেন, 'আমাদের দলে বেশির ভাগই সাংবাদিক ও চিকিৎসক। পেশাদার হিসেবে আমাদের উদ্দেশ্য এই অবৈধ অবরোধ ভাঙা। কারণ, আমাদের আটকানো বা পথ পরিবর্তন করানোর কোনো আইনি অধিকার ইসরায়েলের নেই। আমরা আন্তর্জাতিক জলসীমায় আছি।'
শহিদুল আলম আরও বলেন, 'ইসরায়েল বিশেষভাবে সাংবাদিক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের লক্ষ্যবস্তু করেছে। আমরা এর প্রতিবাদ করতে চাই। এই মিশনের উদ্দেশ্য ত্রাণ বা সহায়তা প্রদানের বাইরেও বিস্তৃত।'
তিনি বলেন, 'আমরা গাজা থেকে প্রতিবেদন করতে এবং সেখানকার মানুষদের চিকিৎসাসেবা দিতে চাই, যা থেকে তারা দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চিত।'
দলটি গাজায় থেকে সেবা দেওয়ার পরিকল্পনা করছে কি না, তা জানতে চাইলে শহিদুল আলম বলেন, 'আমরা সেটাই করতে চাই। আমাদের অনুমতি দেওয়া হবে কি না, সেটা অন্য বিষয়, কিন্তু এটাই আমাদের লক্ষ্য।'
সম্ভাব্য প্রতিরোধ প্রসঙ্গে শহিদুল আলম জানান, গাজায় পৌঁছানোর অনেক আগেই বাধা আসতে পারে।
তিনি ব্যাখ্যা করেন, 'আগের ফ্লোটিলাগুলোর অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বলা যায়, অনেক আগেই সেগুলোকে আটকানো হয়েছে। আমরাও এমনটাই আশঙ্কা করছি। কিন্তু আমাদের চেষ্টা হলো তীরে পৌঁছানো এবং আমরা যেকোনো পরিস্থিতিতে সেটা করতে চাই।'
শহিদুল আলম ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগের বিষয়েও জানান। তিনি জানান, দলটি এখন পর্যন্ত শুধু পরোক্ষ বার্তা পেয়েছে। তিনি বলেন, 'আমরা কেবল তাদের সাথেই যোগাযোগ রেখেছি, যাদের আমরা পুরোপুরি বিশ্বাস করি।'
শহিদুল আলম আরও বলেন, 'তবে আমরা সাংবাদিক হিসেবে কাজ চালিয়ে যেতে চাই। আমরা কোনো পক্ষ নিচ্ছি না। আমরা সত্য খুঁজে বের করতে, সত্য তুলে ধরতে এবং সেই অবস্থানে অবিচল থাকতে চাই।'
ফ্লোটিলার গাজায় পৌঁছানোর সম্ভাব্য সময় সম্পর্কে শহিদুল আলম বলেন, 'আমরা যদি স্বাভাবিক গতিতে এগোতে থাকতাম, তাহলে রোববারের মধ্যেই পৌঁছাতে পারতাম। তবে ধীরগতির জাহাজগুলোর সাথে সমন্বয় করার জন্য জাহাজের গতি কমানো হয়েছে। আমরা সম্ভবত সোমবার পৌঁছাব।'
