বাংলাদেশে শীতকালে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা কোথায়, কোন কোন বছরে ছিল?
দেশজুড়ে জেঁকে বসেছে শীত, হাড়কাঁপানো শীতে স্থবির হয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। বিশেষ করে রাজধানীসহ সারা দেশের নিম্ন আয়ের খেটে খাওয়া ও ছিন্নমূল মানুষ পড়েছেন চরম বিপাকে।
পৌষ ও মাঘ দুই মাস মিলিয়ে শীতকাল। ইংরেজি ক্যালেন্ডারের হিসেবে বাংলাদেশ ও এর আশেপাশের অঞ্চলে জানুয়ারিকে বলা হয় বছরের শীতলতম মাস। তবে শীতের আবহ আসতে শুরু করে পৌষের মাঝামাঝি সময় থেকে। অনেক সময় অগ্রহায়ণ থেকেই শীতের বাতাস টের পাওয়া যায়।
এবারের শীতকালও তার ব্যতিক্রম নয়। বিদায়ী বছরের ডিসেম্বরে, অর্থাৎ পৌষের মাঝামাঝি সময়েই দেশজুড়ে যে মাত্রায় শীত পড়েছে, তাতে জনজীবন প্রায় বিপর্যস্ত।
ডিসেম্বরের শেষের দিকে টানা কয়েক দিন বাংলাদেশের মতো গ্রীষ্মপ্রধান দেশে সূর্যের দেখা মেলেনি। চারপাশ ছিল ঘন কুয়াশায় ঢাকা, বিশেষ করে ২৯ ডিসেম্বর।
ইতিহাস বলছে, এবারের শীতে মানুষ যে ধরনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, এই অঞ্চলের মানুষ এর আগে আরও বেশি হাড়কাঁপানো ও হিমশীতল শীতকাল দেখেছে।
সর্বনিম্ন তাপমাত্রা কবে, কোথায়, কত ছিল?
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, একাধিকবার দেশের তাপমাত্রা তিন ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও নীচে নেমেছিল।
১৯৬৪ সালে সিলেটের শ্রীমঙ্গলের তাপমাত্রা ছিল সর্বনিম্ন, তিন দশমিক তিন ডিগ্রি সেলসিয়াস। চার বছরের মাথায় শ্রীমঙ্গলের তাপমাত্রার পারদ আরো নীচে নামে। ১৯৬৮ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি সেখানকার তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় দুই দশমিক আট ডিগ্রি সেলসিয়াস।
এর ঠিক ৫০ বছর পর, ২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসের শীত সব রেকর্ড ভেঙ্গে দেয়। সে বছর পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় দুই দশমিক ছয় ডিগ্রি সেলসিয়াস। ইতিহাসে এটিই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে কম তাপমাত্রা।
ওই একই বছর রংপুর বিভাগের সৈয়দপুরের তাপমাত্রাও রেকর্ড ভেঙ্গেছিল, এটি গিয়ে ঠেকেছিল দুই দশমিক নয় ডিগ্রি সেলসিয়াসে। ২০১৮ সালে উত্তরাঞ্চলের জেলা নীলফামারীর ডিমলা, কুড়িগ্রামের রাজারহাট ও দিনাজপুরের তাপমাত্রা ছিল তিনের ঘরে। সেগুলো হলো যথাক্রমে– তিন, তিন দশমিক এক ও তিন দশমিক দুই ডিগ্রি সেলসিয়াস।
এর আগে ২০১৩ সালে বাংলাদেশে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। সেসময় রংপুর, দিনাজপুর ও সৈয়দপুরের তাপমাত্রা ছিল যথাক্রমে তিন দশমিক পাঁচ, তিন দশমিক দুই ও তিন ডিগ্রি সেলসিয়াস। তালিকায় আছে রাজশাহীও। ২০০৩ সালে সেখানকার তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় তিন দশমিক চার ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা এখন পর্যন্ত রেকর্ড হওয়া সর্বনিম্ন তাপমাত্রার মধ্যে অন্যতম।
ওই বছরগুলোতে তাপমাত্রা কম হওয়ার কারণ
আবহাওয়াবিদরা জানিয়েছেন, দেশের শীতকালে কিছু বিশেষ বছরে তাপমাত্রা সর্বনিম্ন হয়ে থাকার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করে। টানা কয়েক দিনের কুয়াশা, শক্তিশালী শৈত্যপ্রবাহ, দিন ও রাতের তাপমাত্রার বড় পার্থক্য বা রাতের পরিষ্কার আকাশের মতো অবস্থা তাপমাত্রা কমানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
আবহাওয়াবিদ মো. বজলুর রশিদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, অনেক সময় বাতাসের স্তর বদলে উপরের জেট স্ট্রিম বা শক্তিশালী বাতাস নিচে নেমে আসে বা কুয়াশা কেটে যায়। তখন সেই এলাকায় কুয়াশা সরায় এবং ভূমির তাপ দ্রুত উপরের দিকে উঠে গিয়ে তাপমাত্রা কমে যায়। তবে তিনি উল্লেখ করেন, এটি ব্যতিক্রমী ঘটনা এবং সব সময় এমন হয় না।
তিনি আরও বলেন, 'ওই বছরগুলোর তাপমাত্রা একেবারে নির্ভুল ধরা যাবে না। কারণ, তখনকার প্রযুক্তি এখনকার মতো উন্নত ছিল না। তাপমাত্রা মাপার স্টেশনও কম ছিল, অনেক জায়গায় ম্যানুয়াল থার্মোমিটার ব্যবহার হতো। যদি আশেপাশের সব স্টেশনে একই মাপ পাওয়া যেত, তাপমাত্রার অবস্থা বোঝা সহজ হতো। স্থানীয় আবহাওয়ারও প্রভাব থাকতে পারে।'
তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, হিমালয়ের পাদদেশে কখনও কখনও উচ্চচাপের বলয় তৈরি হয়। তখন সেখানে থেকে ঠান্ডা হিমেল বাতাস বয়ে এসে বাংলাদেশে প্রবেশ করে শীতকে আরও বাড়িয়ে দেয়। এছাড়া, উপরের আকাশে থাকা জেট স্ট্রিম বা দ্রুতগতির ঠান্ডা বাতাস সাধারণত অনেক ওপরে বয়ে যায়। কিন্তু যখন এটি নিচে নেমে আসে, তখন আরও তীব্র ঠান্ডা অনুভূত হয়।
উত্তরাঞ্চলেই কেন বেশি শীত?
সর্বনিম্ন তাপমাত্রার রেকর্ড বলছে, শীতকালে উত্তরাঞ্চলের তাপমাত্রাই সবসময় সবচেয়ে কম থাকে। এর কারণ, শৈত্যপ্রবাহের প্রবেশদ্বার হলো বাংলাদেশের এ অঞ্চল।
শীতকালে উত্তর ভারতের দিল্লি-কাশ্মীর অঞ্চল খুব ঠান্ডা থাকে। আর পৃথিবীর স্বাভাবিক বায়ুপ্রবাহের নিয়ম অনুযায়ী বাতাস পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে যায়। অর্থাৎ, ভারতের দিল্লি, বিহার, উত্তরপ্রদেশ, কাশ্মীর, পশ্চিমবঙ্গ হয়ে ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে রাজশাহী, যশোর, কুষ্টিয়া বেল্ট ধরে তা বাংলাদেশে ঢোকে।
আর এই বাতাসের পথে উত্তরাঞ্চল প্রথম পড়ে বলেই সেখানে এত বেশি ঠান্ডা অনুভুত হয়।
পাশাপাশি, উত্তরাঞ্চলে ঘন কুয়াশা বেশি হয়, যা সূর্যের আলোকে ভূপৃষ্ঠে ঢুকতে দেয় না। ফলে দিনের বেলাতেও সেখানকার তাপমাত্রা কম থাকে। আবার, উত্তরাঞ্চলে বিস্তীর্ণ খোলা মাঠ থাকায় রাতে তাপ দ্রুত বের হয়ে যায়, তাই সেখানে তীব্র ঠান্ডা অনুভূত হয়।
