আমদানি করা ‘পুরনো কাপড়েই’ যেভাবে শীত তাড়াচ্ছে দেশের লাখো পরিবার
পুরান ঢাকার সদরঘাটের নর্থব্রুক হল রোড। বুড়িগঙ্গার পাড় ঘেঁষা এই সড়কে হাঁটলে চোখে পড়বে সারি সারি দোকান। সাইনবোর্ডের দিকে তাকালে মনে হবে এগুলো যেন সবজির আড়ত। কিন্তু ভেতরে উঁকি দিলেই ভুল ভাঙবে। থরে থরে সাজানো পুরোনো সব শীতের কাপড়। একসময় এখানে সবজির পাইকারি ব্যবসা হতো, এখন সেই জায়গা দখল করেছে চট্টগ্রাম থেকে আসা বিদেশি পুরোনো পোশাক।
প্লাস্টিকের মোড়কে শক্ত করে বাঁধা এসব কাপড়ের গাঁট। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা একে বলেন 'বেল', কেউবা ডাকেন 'গাইট' নামে। এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে এসব পুরোনো কাপড় প্রথমে আসে চট্টগ্রামে, সেখান থেকে সোজা এই নর্থব্রুক হল রোডে।
শীতের প্রকোপ বাড়তেই এখানে ব্যস্ততা বেড়ে যায়। বিশেষ করে শৈত্যপ্রবাহের পূর্বাভাস থাকলে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের ভরসা হয়ে ওঠে এসব গরম কাপড়।
সরেজমিনে দেখা যায়, পাইকারি বিক্রেতারা আস্ত বেল বা গাইট খুলে সাজিয়ে রেখেছেন। ঢাকার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা খুচরা বিক্রেতারা সেখান থেকে বেছে বেছে কাপড় কিনছেন। কেউ কেউ আবার বাছাবাছির ঝামেলায় না গিয়ে পুরো বেলই কিনে নিয়ে যাচ্ছেন।
বায়তুল মোকাররম এলাকার ফুটপাতে কাপড় বিক্রি করেন তুলসীদেব সাহা। ১৯৭২ সাল থেকে তিনি এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। একটি খোলা বেলের সামনে দাঁড়িয়ে মনোযোগ দিয়ে কাপড় বাছাই করছিলেন তিনি।
কেনার কৌশল সম্পর্কে প্রবীণ এই ব্যবসায়ী বলেন, 'মাসখানেক আগে দোকানের জন্য দুটি বেল কিনেছিলাম। আজ আবার এসেছি। তবে এবার আর আস্ত বেল নেব না। বেছে বেছে ২০০ জ্যাকেট আর ১০০ সোয়েটার নেব।'
রাজধানীর নিউমার্কেট, মতিঝিল, বায়তুল মোকাররম, গুলিস্তান, পল্টন কিংবা মিরপুর—শীতের হাওয়া বইতেই পাল্টে গেছে এসব এলাকার ফুটপাতের চেহারা। ফুটপাতজুড়ে এখন পুরোনো শীতবস্ত্রের পসরা। জ্যাকেট, সোয়েটার, কার্ডিগান, শার্ট থেকে শুরু করে মাফলার, কানটুপি এমনকি কম্বলও মিলছে এসব দোকানে। বাহারি নকশা আর মানের এসব কাপড় হুকে ঝুলিয়ে কিংবা চৌকিতে সাজিয়ে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করছেন বিক্রেতারা।
ঢাকায় বিক্রি বাড়লেও এই ব্যবসার মূল কেন্দ্র আসলে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম। বিদেশ থেকে আমদানি করা এসব কাপড়ের বড় চালান চট্টগ্রাম বন্দর হয়ে প্রথমে ঢোকে খাতুনগঞ্জের আমিন মার্কেট এবং মাঝিরঘাট এলাকায়। সেখান থেকেই চাহিদা অনুযায়ী সারা দেশের পাইকারি বাজারে ছড়িয়ে পড়ে এই পুরোনো কাপড়।
বাংলাদেশ পুরোনো কাপড় ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সভাপতি আবুল কালাম বলেন, 'খাতুনগঞ্জ, মাঝিরঘাট ও জহুর মার্কেট থেকেই মূলত সারা দেশের ব্যবসায়ীরা পুরোনো কাপড়ের বেল বা গাইট কিনে নিয়ে যান।'
ঢাকা ও চট্টগ্রামের বাইরে বিশেষ করে উত্তরবঙ্গসহ দেশের যেসব এলাকায় শীতের প্রকোপ বেশি, সেখানে এসব কাপড়ের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে শীত নিবারণের জন্য এসব সাশ্রয়ী পোশাকই এখন প্রধান ভরসা।
জাপান-কোরিয়ার কাপড়ে লাভ বেশি, তবে বাজারে মন্দার সুর
পুরান ঢাকার সদরঘাটের নর্থব্রুক হল রোড এবং বাংলাবাজার মোড়ের মল্লিক টাওয়ার—ঢাকার খুচরা বিক্রেতাদের কাছে এই দুটি জায়গাই হলো পুরোনো কাপড়ের প্রধান আড়ত। অবশ্য অনেক বিক্রেতা ঝুঁকি কমাতে সরাসরি চট্টগ্রামের বিশ্বস্ত মহাজনদের কাছ থেকেও আনিয়ে থাকেন।
বাজার ঘুরে দেখা যায়, মান ও উৎপত্তিস্থল ভেদে এসব কাপড়ের দামে রয়েছে ভিন্নতা। ৮০ থেকে ১০০ কেজি ওজনের এক 'বেল' বা গাইট জিপার জ্যাকেটের দাম পড়ে ১৮ থেকে ৩৫ হাজার টাকা। সোয়েটার বা ছোট কাপড়ের বেল পাওয়া যায় ১৫ থেকে ২৫ হাজার টাকায়। আর কম্বল ও কমফোর্টারের বেলের দাম ১২ থেকে ২০ হাজার টাকার মধ্যে।
তবে শার্ট বা শৌখিন জ্যাকেটের ক্ষেত্রে হিসাবটা ভিন্ন। মান ঠিক রাখতে এগুলো অনেক সময় বেলের বদলে পিস হিসেবে বিক্রি হয়। যেমন, ১০০ পিস শার্টের দাম প্রায় ২৫ হাজার টাকা পড়লেও ২০০ পিস কিনলে দাম কিছুটা কমে; সেক্ষেত্রে ৪০ হাজার টাকার মধ্যেই পাওয়া যায়।
দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ বিক্রেতা তুলসীদেব সাহা বলেন, 'দক্ষিণ কোরিয়া আর জাপানের কাপড়ের মান সবচেয়ে ভালো। জ্যাকেট হোক বা শার্ট—কিছু কাপড় তো একদম নতুনের মতো দেখায়। এ কারণে এগুলোর দাম আর চাহিদাও একটু বেশি।'
স্বল্প পুঁজিতে ব্যবসার সুযোগ থাকায় এই খাতে ভিড় করছেন অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও ফুটপাতের হকাররা। চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের এক পাইকারি ব্যবসায়ী জানান, মাত্র ২০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে এই ব্যবসা শুরু করা যায় এবং লাভের হারও বেশ ভালো।
মৌসুম বুঝে পণ্য বদলে ফেলেন এই ব্যবসায়ীরা। পুরানা পল্টনের ফুটপাতে এখন কম্বল আর পর্দা বিক্রি করছেন রুবেল হোসেন। তিনি বলেন, 'গরমের সময় শার্ট-প্যান্ট বেচতাম, এখন শীতের মাল নামিয়েছি। শীত শেষ হলে আবার অন্য কিছু তুলব।'
তবে ব্যবসার বর্তমান অবস্থা নিয়ে রুবেল কিছুটা চিন্তিত। দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি বললেন, 'আগের মতো ব্যবসা আর নেই। তিন-পাঁচ বছর আগেও দিনে ২০-২৫টা কম্বল অনায়াসেই বেচতাম। এখন ১০টাও বিক্রি হয় না।'
ঢাকার অলিগলি থেকে শুরু করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এই পুরোনো কাপড়ের বাজার এখন নিম্ন ও মধ্যবিত্তের শীত নিবারণের বড় ভরসাস্থল। তবে আমদানিনির্ভর এই ব্যবসায় মুদ্রাস্ফীতি আর মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার প্রভাবও বেশ স্পষ্ট।
ফুটপাতে অল্প টাকায় পুরোনো শীতবস্ত্রের ধুম
চট্টগ্রামের নিউমার্কেট এলাকা। সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে রাস্তার ধারের দৃশ্যটা বদলে যায়। ত্রিপল বিছিয়ে হকাররা সাজিয়ে বসেন জ্যাকেট, সোয়েটার আর কার্ডিগানের পাহাড়। ক্রেতাদের টানতে চলে বিক্রেতাদের গলা ফাটানো হাঁকডাক। মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষ ভিড় করছেন সেসব দোকানে। লক্ষ্য একটাই—সাধ্যের মধ্যে মানানসই একটা গরম কাপড় খুঁজে নেওয়া।
এখানকার নিয়মিত ক্রেতা রুমা হক। তিনি বলছিলেন, 'এই কাপড়গুলো বেশ ভালো। একবার ধুয়ে ইস্ত্রি করলে চেনাই যায় না যে এগুলো পুরোনো। আমাদের মতো সাধারণ মানুষের তো সব সময় নতুন কাপড় কেনার সাধ্য থাকে না। দোকানে যে জ্যাকেট ৮০০ থেকে ১০০০ টাকা, এখানে সেটা ৪০০-৫০০ টাকায় পাওয়া যায়। অনেক সময় নতুনের চেয়েও ভালো মানের কাপড় মিলে যায় এখানে।'
এই বাজারে দরদামটাই আসল। ঠিকঠাক যাচাই করতে জানলে দুই হাজার টাকার মধ্যেই পরিবারের সবার জন্য প্রয়োজনীয় শীতের কাপড় কেনা সম্ভব।
রাজধানী ঢাকার চিত্রও একই। নিউমার্কেট, বায়তুল মোকাররম ও গুলিস্তান এলাকায় কেনাবেচা চলে রাত ১০-১১টা পর্যন্ত। হকার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, কেবল বায়তুল মোকাররম মসজিদের সামনেই অন্তত ৬০ জন পুরোনো কাপড়ের বিক্রেতা বসেন। নিউমার্কেট এলাকায় এই সংখ্যা শতাধিক। বিক্রেতারা জানান, শীতের শুরুতে বিক্রি কিছুটা ঢিমেতালে চললেও হিমেল হাওয়া বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভিড় আরও বাড়ছে।
শহর ছাড়িয়ে জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও এখন পুরোনো কাপড়ের জমজমাট বাজার। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোতে, যেখানে শীতের প্রকোপ বেশি, সেখানে এই পুরোনো কাপড়ই মানুষের প্রধান ভরসা।
রংপুরভিত্তিক একটি সংগঠনের প্রতিনিধি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী সাইমুন আমিন গত পাঁচ বছর ধরে শীতবস্ত্র বিতরণের কাজ করছেন। তিনি বলেন, 'উত্তরাঞ্চলের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষ শীত নিবারণের জন্য মূলত এই আমদানিকৃত পুরোনো কাপড়ের ওপরই সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল। কারণ, সাশ্রয়ী দামে প্রয়োজনীয় উষ্ণতা এখান থেকেই মেলে।'
'ত্রাণ' থেকে যেভাবে বিস্তৃত হলো 'শতকোটির বাণিজ্য'
১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের মানুষের অবস্থা ছিল করুণ। হাড়কাঁপানো শীতেও অনেকের গায়ে ছিল না সামান্য একটা গরম কাপড়। সেই দুঃসময়ে সহায়তার হাত বাড়িয়েছিল আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থা 'অক্সফাম'। ব্রিটেনসহ পশ্চিমা দেশগুলো থেকে ত্রাণ হিসেবে তারা পাঠিয়েছিল পুরোনো কাপড় ও কম্বল। সেই ত্রাণের হাত ধরে শুরু হওয়া পুরোনো কাপড়ের চল এখন দেশের এক বিশাল বাণিজ্যে রূপ নিয়েছে।
তুলসীদেব সাহার স্মৃতিতে এখনো উজ্জ্বল সেই দিনগুলো। স্বাধীনতার সময় তার বয়স ছিল ১৫ বছর। তিনি বলছিলেন, 'দেশ স্বাধীনের পর শীতের মধ্যে আমরা ভীষণ কষ্টে ছিলাম। পরে সরকারের মাধ্যমে ত্রাণের পোশাক আসতে শুরু করলে মানুষের কষ্ট কিছুটা লাঘব হয়।'
শুরুর দিকে এসব কাপড় মূলত যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, জাপান এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে আসত। তবে এখন প্রেক্ষাপট বদলেছে। বর্তমানে বাংলাদেশের পুরোনো কাপড়ের বাজারের মূল জোগানদাতা হচ্ছে এশীয় দেশগুলো—বিশেষ করে জাপান, তাইওয়ান, কোরিয়া ও চীন। মাঝেমধ্যে মালয়েশিয়া ও পাকিস্তান থেকেও কিছু কাপড় আসে।
আমদানি ও রপ্তানি প্রধান নিয়ন্ত্রকের দপ্তরের তথ্যমতে, বর্তমানে দেশে ৩ হাজার তালিকাভুক্ত ব্যবসায়ী পুরোনো কাপড় আমদানির অনুমতি পান। বছরে জনপ্রতি ৫০ হাজার টাকা হিসেবে মোট ১৫ কোটি টাকার কাপড় আমদানির কোটা বরাদ্দ রয়েছে।
এফবিসিসিআইয়ের সদস্য এস এম জলিল বলেন, 'সব ধরনের কাপড় আনা যায় না। আমরা মূলত ছয় ধরনের পোশাক আমদানির অনুমতি পাই—সোয়েটার, জিপার জ্যাকেট বা কোট, কার্ডিগান, ট্রাউজার, কম্বল ও শার্ট।'
ব্যবসায়ীরা জানান, প্রতি বছর এপ্রিল-মে মাস থেকে অক্টোবর পর্যন্ত আমদানির তোড়জোড় চলে। বছরে প্রায় ৫০০ থেকে ৭০০ কনটেইনার ভর্তি কাপড় আসে, যার প্রতিটিতে থাকে অন্তত ২৫০ থেকে ৩০০ বেল। আশির দশকে দেশে পোশাক শিল্প (আরএমজি) যখন ততটা বিকশিত হয়নি, তখন এই ব্যবসার পরিধি ছিল আরও বড়।
আমদানি ও রপ্তানি প্রধান নিয়ন্ত্রকের দপ্তরের সহকারী নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ গোলাম মোস্তফা জানান, আমদানিকারকরা নির্ধারিত এজেন্টের মাধ্যমে আইনি প্রক্রিয়া মেনেই এই ব্যবসা পরিচালনা করেন। চাইলেই যে কেউ এই পণ্য আনতে পারেন না।
তবে দীর্ঘদিনের এই ব্যবসায় এখন কিছুটা ভাটার টান। ব্যবসায়ীদের মতে, করোনা মহামারির পর থেকে আমদানিতে কড়াকড়ি এবং দেশি পোশাকের উৎপাদন বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসা কিছুটা সংকুচিত হয়েছে। তা সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের মধ্যে পুরোনো বিদেশি কাপড়ের চাহিদা কমেনি।
ব্যবসায়ী নেতা আবুল কালাম মনে করেন, বর্তমান বাজারের চাহিদা অনুযায়ী আমদানির সীমা বাড়ানো প্রয়োজন। তিনি বলেন, 'আমদানির সীমা ১৫ কোটি থেকে বাড়িয়ে ৩০ কোটি টাকা করা হলে সাধারণ মানুষ আরও সাশ্রয়ী দামে শীতের কাপড় কিনতে পারতেন। এতে ক্রেতা ও বিক্রেতা—উভয় পক্ষই লাভবান হতো।'
