১১ মাসের মধ্যে জানুয়ারিতে সর্বোচ্চ আমদানি এলসি খোলার রেকর্ড
দেশের আমদানিতে দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে নতুন বছরের শুরুতেই বড় ধরনের গতি লক্ষ্য করা গেছে। গত জানুয়ারি মাসে আমদানির জন্য ঋণপত্র বা এলসি (লেটার অব ক্রেডিট) খোলার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৬১ বিলিয়ন ডলার, যা গত ১১ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যানে এ চিত্র উঠে এসেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে জানিয়েছেন, গত জানুয়ারিতে ৬ দশমিক ৬১ বিলিয়ন ডলারের এলসি খোলা হলেও এলসি নিষ্পত্তির (সেটেলমেন্ট) পরিমাণ ছিল ৬ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ডলার। এর আগে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে এলসি খোলার পরিমাণ ছিল ৬ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলার।
ব্যাংকার ও খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, মূলত দুটি প্রধান কারণে জানুয়ারিতে এলসি খোলার হার বেড়েছে। প্রথমত, আসন্ন রমজান উপলক্ষে ভোগ্যপণ্যের চাহিদা মেটানো এবং দ্বিতীয়ত, ফেব্রুয়ারি মাসে জাতীয় নির্বাচন শেষ হওয়ার পর ব্যবসায়ীদের মধ্যে আস্থার সৃষ্টি হওয়া, যার ফলে অনেকে নতুন করে মূলধনী যন্ত্রপাতি (ক্যাপিটাল মেশিনারি) আমদানিতে আগ্রহী হয়েছেন।
পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মোহাম্মদ আলী বলেন, 'মূলত রমজানের কারণেই এলসি খোলার পরিমাণ বেড়েছে। চাল, ডাল, তেল, খেজুরসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য আমদানিতে ব্যবসায়ীরা তৎপর হয়েছেন। প্রতি বছরই রমজানের আগে এলসি খোলার এই প্রবণতা দেখা যায়।'
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের (এমটিবি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, 'ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের পর ব্যবসায়ীদের মধ্যে এক ধরনের স্বস্তি ও আশা তৈরি হয়েছে। ফলে তারা কিছু মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি করেছেন। এছাড়া রমজানের চাহিদাতো আছেই।'
ব্যাংকে ডলারের সরবরাহ প্রসঙ্গে তিনি আশ্বস্ত করে বলেন, 'বর্তমানে ব্যাংকগুলোতে ডলারের পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়েছে। ব্যবসায়ীদের এলসি খোলার ক্ষেত্রে ডলারের কোনো বড় ঘাটতি নেই। পরিবেশ অনুকূলে থাকলে সামনে বিনিয়োগ ও আমদানি আরও বাড়বে।'
তবে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবাহ নিয়ে কিছুটা উদ্বেগ রয়ে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বরে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৬ দশমিক ১০ শতাংশ। টানা সাত মাস ধরে এই প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের নিচেই অবস্থান করছে, যা বিনিয়োগে ধীরগতির ইঙ্গিত দেয়।
একটি বেসরকারি ব্যাংকের ট্রেজারি প্রধান জানান, নতুন ব্যবসা ও বিনিয়োগ কম হওয়ায় ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমছে। মূলত দেশে নতুন ব্যবসা-বাণিজ্য কমে যাওয়ার কারণে নতুন বিনিয়োগ কম। তাই এতদিন এলসি খোলাও কম ছিল। নতুন ব্যবসা না করলে মূলধন যন্ত্রপাতি আমদানিও কম থাকে।
রমজানের পণ্য আমদানির চিত্র:
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব মতে, রমজান মাসে দেশে সয়াবিন তেলের চাহিদা থাকে ৩ লাখ টন, চিনির চাহিদা ৩ লাখ টন, পেঁয়াজের চাহিদা ৫ লাখ টন, ছোলার চাহিদা ১.৫০ থেকে ২ লাখ টন এবং খেজুরের চাহিদা থাকে ৬০ থেকে ৮০ হাজার টন।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, গত চার মাসে ২ লাখ ২৫ হাজার টন পেঁয়াজ, ৩ লাখ ৭০ হাজার টন চিনি, ৪৭ হাজার টন খেজুর, ২ লাখ ৫ হাজার টন মসুর ডাল, ৪ লাখ টন অপরিশোধিত সয়াবিন তেল এবং ১৪ লাখ টন গম আমদানি হয়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এবার নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের আমদানি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এর মধ্যে সয়াবিন তেল ৩৬ শতাংশ, চিনি ১১ শতাংশ, মসুর ডাল ৮৭ শতাংশ, ছোলা ২৭ শতাংশ, মটর ডাল ২৯৪ শতাংশ এবং খেজুর আমদানিতে ২৩১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। সিটি গ্রুপ, মেঘনা গ্রুপ, স্কয়ার গ্রুপ, বসুন্ধরা ও টিকে গ্রুপের মতো বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলো রমজানের অধিকাংশ পণ্য ইতোমধ্যে আমদানি সম্পন্ন করেছে বলে জানা গেছে।
