দুই বছর না যেতেই ১১ কোটি টাকার টানেল চুইয়ে পড়ছে পানি, ঝুঁকি নিয়ে চলাচল যাত্রীদের

বান্দরবানের কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালের সঙ্গে সংযোগ সড়ক হিসেবে নির্মিত ১১ কোটি টাকার টানেলটি উদ্বোধনের মাত্র দুই বছরেই ভঙ্গুর ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পৌঁছেছে। এতে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে জনমনে।
৫২০ ফুট দীর্ঘ ও ২৫ ফুট প্রশস্ত এই টানেল উদ্বোধনের সময় যানজট নিরসন ও পর্যটন বৃদ্ধির প্রকল্প হিসেবে বেশ প্রশংসিত হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে টানেলটিতে কোনো বাতি নেই, ফলে ভেতরে ঘুটঘুটে অন্ধকার; দিন-দুপুরেই গাড়িগুলোকে হেডলাইট জ্বালিয়ে যেতে হয়। টানেলের দেওয়াল দিয়ে চুইয়ে বৃষ্টির পানি পড়ে। অথচ বাইরে ভারী বৃষ্টি নেই; কেবল গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি। টানেলের মাঝখানে চুইয়ে পড়া পানি জমে গাড়ি চলাচলের কারণে সৃষ্টি হয়েছে ছোট বড় গর্ত। ভেতরে রাস্তাজুড়ে কাদামাটি আর পানি।
বাধ্য হয়ে ঝুঁকি মাথায় নিয়ে এই কাদামাখা পথ মাড়িয়েই প্রতিদিন চলাচল করছেন শত শত শিক্ষার্থী ও সাধারণ যাত্রী।
মাহবুব নামে এক অটোরিকশা চালক বলেন, "ঝুঁকি নিয়ে গাড়ি চালাই। ভয় হয় কোনো সময় ভেঙ্গে পড়ে কিনা। টানেল নির্মাণ করেছে দুই বছরও হয়নি। পানি চুইয়ে পড়ে। মাটি ভেঙ্গে পড়ে। টানেল নির্মাণ করেও আমাদের দুর্দশার মধ্য দিয়েই চলতে হচ্ছে।"

পাভেল বড়ুয়া নামে বাস স্টেশনের এক দোকানি বলেন, "টানেলটি নির্মাণ করেছে আমাদের সুবিধার জন্য। কিন্তু তাতে আমাদের কোনো সুবিধাই হয়নি। শুধু আমাদের জনগণের টাকা অপচয় করা হয়েছে।"
"এই অর্থ তো কারও পকেট থেকে নিয়ে করেনি। জনগণের পকেট থেকে নিয়ে জনগণের জন্য করেছে। এত টাকা দিয়ে একটা টানেল নির্মাণ করেছে, উদ্বোধনের দুই বছরও হয়নি, পানি পড়ে। একটা লাইট জ্বলে না; মাটি ভেঙ্গে পড়ে আছে; টানেলের ভেতর অন্ধকার। এভাবে কি মানুষ যাতায়াত করতে পারে?," বলেন তিনি।
২০১৮–১৯ অর্থবছরে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের আওতায় টানেল নির্মাণ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। ২০২৩ সালের অক্টোবরে তৎকালীন মন্ত্রী বীর বাহাদুর উশৈসিং এটি উদ্বোধন করেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, টানেল নির্মাণের কাজ দেওয়া হয়েছিল এমএম ট্রেডার্স নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে। প্রতিষ্ঠানের চার মালিকের একজন মং আ মারমা দুই বছর আগে অসুস্থ হয়ে মারা যান।
প্রতিষ্ঠানের আরেক মালিক রাজু বড়ুয়া টিবিএসকে বলেন, "এটি মূলত একটি সংযোগ সড়ক ছিল। নির্মাণে কোনো অব্যবস্থাপনা হয়নি। তবে পাহাড়ধসে মাটি জমেছে এবং ড্রেন পাইপ চুরি হওয়ায় টানেলের ভেতরে কাদা তৈরি হয়েছে।"
তবে এই ব্যাখ্যা মানতে নারাজ স্থানীয় বাসিন্দা ও অধিকারকর্মীরা।
বিষয়টি নিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি অংচমং মারমা টিবিএসকে বলেন, "নির্মাণের দুই বছর না যেতেই দেওয়ালের ফাঁক দিয়ে পানি পড়ছে। এতে বোঝা যায়, টানেলটি অনেক টাকা ব্যয় করে নির্মাণ করা হলেও কোনোভাবেই মানসম্মতভাবে হয়নি। ভালো নির্মাণসামগ্রী দিয়ে যথাযথভাবে নির্মাণ করা হলে এভাবে পানি পড়ত না।"
স্থানীয়দের অভিযোগ, ১১ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এ অবকাঠামো যাতায়াত সহজ করা ও পর্যটন বাড়ানোর যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। বরং এটি এখন পরিণত হয়েছে দুর্বল পরিকল্পনা ও প্রশ্নবিদ্ধ নির্মাণ মানের প্রতীকে—যা প্রতিদিন ভোগান্তিতে ফেলছে যাত্রীদের।

যোগাযোগ করা হলে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের বান্দরবান ইউনিটের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু বিন ইয়াছির আরাফাত দ্য বিজনেস স্ট্যার্ন্ডাডকে বলেন, "এটা মূলত সংযাগ সড়ক। পরে স্থাপনাটি টানেলের মত রূপ নেয়। অনেকের কাছে টানেল হিসেবে পরিচিতি পায়। টানেলের কানেকশনে আরসিসি ঢালাইয়ে যে জয়েন্টগুলো আছে সেখান থেকে পানি পড়ছে। সেটিকে অনেকে না বুঝে টানেল ফেটে পানি পড়ছে বলে অভিযোগ করছে।"
তিনি বলেন, "আর বৃষ্টি হলে মাটি ভরাট হয়ে যাচ্ছে। নির্মাণকাজ চলাকালীন সময়েও পাহাড় ধসে পড়া মাটিগুলো বারবার সরিয়ে ফেলতে হয়েছে। এরপর মাটি ধস রোধে জিও ব্যাগ ব্যবহার করেছি। সেগেুলো রাতে চুরি হয়ে গেছে। উদ্বোধনের সময় যে লাটইটগুলো দেওয়া হয়েছিল সেগুলোও চুরি হয়ে গেছে।"
আবু বিন ইয়াছির আরাফাত আরও বলেন, "কাজ শেষ হয়েছে পাঁচ বছর আগে, তবে উদ্বোধন হয়েছে দুই বছর আগে। বান্দরবান সদর পৌরসভার কাছে টানেল হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে। টানেল থেকে টোল আদায়ের একটি অংশ পৌরসভা পাচ্ছে, আরেক অংশ আমাদের কাছেও আসছে। কে কত পাবে, তা নিয়ে আলোচনা চলছে। আশা করছি, খুব শিগগিরই হস্তান্তরের মাধ্যমে বিষয়টির সমাধান হবে।"