চট্টগ্রাম শহরের ওপর চাপ কমাতে তিন উপজেলায় স্যাটেলাইট টাউন গড়ার পরিকল্পনা সিডিএর
চট্টগ্রাম মহানগরীর ওপর ক্রমবর্ধমান জনবসতির চাপ কমানো এবং পরিকল্পিত শিল্পায়নের লক্ষ্যে আনোয়ারা, পটিয়া ও হাটহাজারী উপজেলাকে কেন্দ্র করে তিনটি স্যাটেলাইট টাউন নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
'চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন মাস্টারপ্ল্যান (২০২৫-২০৫০)' শীর্ষক ২৫ বছর মেয়াদি এই পরিকল্পনায় উপজেলা তিনটিতে বিশেষায়িত শিল্প ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে। পরিকল্পনাটি প্রণয়ন করেছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)।
এর মাধ্যমে বন্দর নগরীকে একটি পূর্ণাঙ্গ ও আধুনিক বাণিজ্যিক রাজধানীতে রূপান্তরের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। দ্রুত নগরায়ণ, জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও অবকাঠামোগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তৈরি করা হয়েছে এই দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত রূপরেখা।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সিডিএর এই মাস্টারপ্ল্যানের সঙ্গে ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি ঘোষিত নির্বাচনী ইশতেহারের উন্নয়ন লক্ষ্য ও অঙ্গীকারের নীতিগত ও কৌশলগত মিল রয়েছে। বিশেষ করে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ এবং চট্টগ্রামকে দেশের প্রকৃত বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতির সঙ্গে স্যাটেলাইট টাউন ও বাণিজ্যিক জোনের প্রস্তাবগুলো সামঞ্জস্যপূর্ণ।
মাস্টারপ্ল্যানে দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা নিরসন ও আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে ২০৪০ সালের মধ্যে নতুন ড্রেনেজ চ্যানেল নির্মাণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি নগর এলাকার ১২৫ কিলোমিটার প্রাকৃতিক খাল এবং প্রায় ৫৯৪ কিলোমিটার আরআরসি ড্রেন পরিষ্কার ও পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
ড্রেনেজ ব্যবস্থায় আধুনিক প্রযুক্তি যুক্ত করতে আইওটি (IoT) ভিত্তিক সেন্সর ও স্বয়ংক্রিয় 'সিল্ট ট্র্যাপ' স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা দ্রুত ব্লকেজ শনাক্ত করতে সক্ষম হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে জলাবদ্ধতা কমার পাশাপাশি পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
পরিবেশ সুরক্ষা ও পাহাড় রক্ষায় মাস্টারপ্ল্যানে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে। মহানগরীর সব পাহাড়কে 'ইকোলজিক্যালি সেনসিটিভ জোন' হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। যেখানে ঢাল ৩০ শতাংশের বেশি, সেখানে সব ধরনের উন্নয়ন কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাখার সুপারিশ করা হয়েছে। পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে 'জিরো টলারেন্স' নীতি এবং ক্ষতিগ্রস্ত পাহাড়ে বনায়নের পরিকল্পনাও এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ পাড় থেকে পণ্য পরিবহন আরও গতিশীল করতে কালুরঘাট সেতুসহ নতুন আরও দুটি সেতু নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে। একটি সেতু পোর্ট লিংক রোডের সঙ্গে এবং অন্যটি এয়ারপোর্ট রোড হয়ে শেখ মুজিব রোডের সঙ্গে যুক্ত হবে। এতে কেইপিজেড, আনোয়ারার চীনা ইপিজেড এবং ভবিষ্যতের মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর থেকে পণ্য পরিবহন সহজ হবে।
এছাড়া আনোয়ারা উপজেলায় প্রস্তাবিত বাণিজ্যিক ইপিজেডকে ঘিরে পরিকল্পিত উন্নয়নের জন্য 'আনোয়ারা অ্যাকশন এরিয়া প্ল্যান' প্রণয়ন করা হয়েছে।
প্রশাসনিক সুবিধার জন্য চট্টগ্রাম মহানগর এলাকাকে ৬টি কৌশলগত জোনে ভাগ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি জোনে আলাদা প্রশাসনিক অফিস স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে নাগরিক সেবা সহজ হয়।
পাশাপাশি বিভিন্ন সেবা সংস্থার মধ্যে সমন্বয় জোরদার করতে 'আরবান ডেভেলপমেন্ট কো-অর্ডিনেশন কমিটি' (ইউডিসিসি) গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এই কমিটি উন্নয়ন কার্যক্রম তদারকি ও সমন্বয়ের মাধ্যমে টেকসই নগর উন্নয়ন নিশ্চিত করবে।
নগরীকে নিরাপদ ও দুর্যোগ সহনশীল হিসেবে গড়ে তুলতে মহাপরিকল্পনায় অগ্নি নিরাপত্তা ও ভূমিকম্প ঝুঁকি মোকাবিলায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ক্রমবর্ধমান নগরায়নের প্রেক্ষাপটে ভবনের অগ্নি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কঠোর নীতিমালার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এর অংশ হিসেবে নতুন মাঝারি ও উচ্চতল ভবন নির্মাণে বাধ্যতামূলকভাবে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ও পানির সংরক্ষণ ট্যাংক স্থাপনের কথা বলা হয়েছে, যা জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
ভূমিকম্পজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। নগরের ভূ-তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে 'লিকুইফ্যাকশন হ্যাজার্ড ম্যাপ' বা মাটির তরলীকরণ ঝুঁকি মানচিত্র প্রস্তুত করা হয়েছে। এর মাধ্যমে কোন এলাকাগুলো ভূমিকম্পে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ এবং কোথায় উঁচুতল ভবন বা শিল্প স্থাপনা নির্মাণ নিরাপদ, তা নির্ধারণ করা সম্ভব হবে। ভবিষ্যতে ভবন নির্মাণ ও ভূমি ব্যবহারের অনুমোদন এই মানচিত্রের ভিত্তিতেই দেওয়া হবে।
সিডিএর তথ্য অনুযায়ী, পরিকল্পিত নগরায়নের লক্ষ্যে ২০২০ সালের ৬ মে 'চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন মাস্টারপ্ল্যান' প্রকল্প অনুমোদন পায়। ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের পর একই বছরের ডিসেম্বর থেকে প্রকল্পের কাজ শুরু হয়।
বর্তমানে প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি প্রায় ৮৫ শতাংশ এবং আর্থিক অগ্রগতি প্রায় ৫৯.৬৫ শতাংশ। মোট ৩৫ কোটি ৮৭ লাখ টাকার মধ্যে এখন পর্যন্ত ২১ কোটি ৪০ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
চট্টগ্রাম মহানগর ও পার্শ্ববর্তী এলাকা নিয়ে সিডিএর আওতাধীন ১,২৫৫ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে এই মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
প্রকল্পটির অন্যতম বিশেষ দিক হলো তথ্য সংগ্রহে আধুনিক ড্রোন প্রযুক্তি ও মাঠ পর্যায়ের সমীক্ষার সমন্বিত ব্যবহার। ড্রোনের মাধ্যমে প্রতিটি এলাকার বিস্তারিত চিত্র ধারণ করে ভবনের উচ্চতা ও কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে, যা তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা বাড়িয়েছে।
এই তথ্যের ভিত্তিতে ভবিষ্যতে একটি ত্রিমাত্রিক (থ্রিডি) নগর মানচিত্র তৈরি করা হবে। এর মাধ্যমে ভবনের উচ্চতা, জমির ব্যবহার, অবকাঠামো এবং পরিকল্পনার সীমারেখা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হবে। এতে জোনিং নীতিমালা প্রণয়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন, জনঘনত্ব ব্যবস্থাপনা, দুর্যোগ মোকাবিলা এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর হবে।
সিডিএর মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন প্রকল্পের পরিচালক ও উপ-প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আবু ঈসা আনছারী বলেন, "আমাদের কাজের এলাকা অত্যন্ত বড় হওয়ায় প্রত্যন্ত অঞ্চলের উন্নয়ন কার্যক্রম তদারকি করা কঠিন। ফলে অনেক ক্ষেত্রে অনিয়মতান্ত্রিকভাবে পুকুর ভরাট ও যত্রতত্র ভবন নির্মাণ হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।"
তিনি জানান, এ সমস্যা সমাধানে মহানগরী ও আশপাশের এলাকাকে ছয়টি কৌশলগত জোনে ভাগ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এতে স্থানীয় পর্যায়ের জোনাল অফিস থেকেই সেবা পাওয়া যাবে এবং উন্নয়ন কার্যক্রমে তদারকি বাড়ানো সম্ভব হবে।
তার মতে, এই বিকেন্দ্রীকরণ ও পরিকল্পিত উন্নয়নের মাধ্যমে পরিবেশগত ক্ষতি কমবে, দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস পাবে এবং নাগরিকদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি অনেকটাই কমবে।
