বিশেষ ফ্লাইটে দেশে এলো ওমানে নিহত ৪ ভাইয়ের মরদেহ; রাঙ্গুনিয়ায় দাফন সম্পন্ন
মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ওমানে গাড়ির এসির বিষাক্ত গ্যাসে প্রাণ হারানো রাঙ্গুনিয়ার একই পরিবারের চার প্রবাসী ভাইকে একসঙ্গে দাফন করা হয়েছে। বুধবার (২০ মে) সকাল ১১টায় চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার লালানগর ইউনিয়নের হোসনাবাদ লালানগর উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে তাদের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে বন্দেরাজার পাড়া জামে মসজিদ সংলগ্ন কবরস্থানে পাশাপাশি চারটি কবরে তাদের দাফন করা হয়।
এর আগে মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায় চার ভাইয়ের মরদেহ। মাস্কাট থেকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি বিশেষ ফ্লাইটে (বিজি-৭২২) মরদেহগুলো দেশে আনা হয়। চট্টগ্রাম-৭ (রাঙ্গুনিয়া) আসনের সংসদ সদস্য হুমাম কাদের চৌধুরী বিমানবন্দরে মরদেহ গ্রহণ করেন। পরে সরকারের ব্যবস্থাপনায় ফ্রিজার অ্যাম্বুলেন্সে করে মরদেহগুলো গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে পাঠানো হয়। বুধবার ভোর ৫টার দিকে মরদেহগুলো বাড়িতে পৌঁছায়।
নিহতরা হলেন- রাশেদুল ইসলাম, শাহেদুল ইসলাম, সহিদুল ইসলাম ও সিরাজুল ইসলাম। তারা রাঙ্গুনিয়া উপজেলার লালানগর ইউনিয়নের বন্দেরাজার পাড়া গ্রামের মৃত জামাল উদ্দিনের ছেলে। তাদের মধ্যে রাশেদুল ও শাহেদুল বিবাহিত ছিলেন। দুই ছোটভাই ছিলেন অবিবাহিত। নিহতদের মধ্যে দুজনের গত ১৫ মে দেশে ফেরার কথা ছিল।
মরদেহ বাড়িতে পৌঁছানোর পর পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। বাড়ির সামনে সারি করে রাখা চারটি খাটিয়া ঘিরে স্বজন, প্রতিবেশী ও দূরদূরান্ত থেকে আসা মানুষের ভিড় দেখা যায়। কান্না আর শোকে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ।
পরিবার জানায়, চার ভাইয়ের মধ্যে সবচেয়ে ছোটজনের বয়স যখন মাত্র দুই বছর, তখন তাদের বাবা মারা যান। পরে মা কষ্ট করে সন্তানদের বড় করেন। প্রায় ১২ বছর আগে মেজভাই প্রথম ওমানে যান। পরে একে একে বাকি তিন ভাইকেও সেখানে নিয়ে যান। ওমানে তারা গাড়ি ওয়াশিংয়ের দুটি দোকান পরিচালনা করতেন। কয়েক বছরে আর্থিকভাবে স্বচ্ছল হয়ে চার বছর আগে ৩০ শতক জায়গা কিনে নতুন বাড়ি নির্মাণ শুরু করেন তারা। তবে বাড়িটির নিচতলার কাজ এখনো অসম্পূর্ণ রয়েছে।
পরিবারের সদস্যরা জানান, সম্প্রতি মেজভাই শাহেদুল ইসলাম বিয়ে করেছিলেন। মাত্র আট মাস আগে বিয়ের পর তিনি আবার ওমানে ফিরে যান। চার ভাইয়ের একসঙ্গে মৃত্যুর ঘটনায় তাদের মা ভেঙে পড়েছেন। একমাত্র জীবিত ভাই এনামুল হক, যিনি একটি মাদ্রাসার শিক্ষক, জানাজার আগে মাইকে ভাইদের জন্য সবার কাছে ক্ষমা চেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন।
স্থানীয় সূত্র জানায়, জানাজায় উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে হাজারো মানুষ অংশ নেন। মাঠ ছাড়িয়ে মূল সড়ক পর্যন্ত মানুষের দীর্ঘ সারি দেখা যায়।
মরিয়ম নগর ইউনিয়নের বাসিন্দা ও শিক্ষক জাকের হোসেন বলেন, 'একসঙ্গে চার ভাইয়ের মৃত্যুর ঘটনা আগে কখনো শুনিনি। মনটা মানছিল না। তাই দেখতে এসেছি। পরিবারটি কীভাবে এই শোক সামলাবে, সেটাই ভাবছি।'
গত ১২ মে রাতে ওমানের আল মিলাদ্দাহ এলাকায় একটি গাড়ি থেকে চার ভাইয়ের মরদেহ উদ্ধার করে ওমান রয়্যাল পুলিশ। ময়নাতদন্ত শেষে পুলিশ জানিয়েছে, গাড়ির এসি থেকে নির্গত বিষাক্ত গ্যাসে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে তাদের মৃত্যু হয়েছে।
চট্টগ্রাম সমিতি ওমানের সভাপতি মো. ইয়াসিন চৌধুরী জানান, ওমান সরকার ও বাংলাদেশ দূতাবাসের সহযোগিতায় দ্রুত সব আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার মরদেহ পরিবহনের সম্পূর্ণ কার্গো খরচ বহন করেছে। এছাড়া ওমান চট্টগ্রাম সমিতি হাসপাতালের হিমঘর বিল, কাফনের কাপড়, গোসলসহ আনুষঙ্গিক সব ব্যয় বহন করেছে এবং পরিবারের কাছ থেকে কোনো অর্থ নেওয়া হয়নি।
