ঢাকা বিমানবন্দরে চার বিস্ফোরক শনাক্তকরণ স্ক্যানারের ৩টিই অচল; কার্গো জটের আশঙ্কা
ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রপ্তানি পণ্য পরীক্ষার কাজে ব্যবহৃত চারটি এক্সপ্লোসিভ ডিটেকশন সিস্টেম (ইডিএস) স্ক্যানারের মধ্যে তিনটিই অচল হয়ে পড়েছে। এতে কার্গো-জট তৈরি হওয়া, ব্যয় বৃদ্ধি ও আকাশপথে পণ্য রপ্তানি ব্যাহত হওয়ার শঙ্কায় পড়েছে রপ্তানিকারক ও ফ্রেইট অপারেটররা।
খাত-সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, বর্তমানে রপ্তানির চাপ তুলনামূলক কম থাকায় পরিস্থিতি এখনও নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে তারা সতর্ক করে বলেন, আগামী পিক মৌসুমে কার্গোর পরিমাণ হঠাৎ বেড়ে গেলে বড় ধরনের পরিচালনা সংকটের সৃষ্টি হতে পারে।
ইন্টারন্যাশনাল এয়ার এক্সপ্রেস অ্যাসোসিয়েশন অভ বাংলাদেশের সভাপতি কবির আহমেদ বলেন, রপ্তানি কার্যক্রম নির্বিঘ্ন রাখতে সাধারণত অন্তত দুই থেকে তিনটি ইডিএস স্ক্যানার সচল থাকা প্রয়োজন।
'কিন্তু বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে পাঠানোর জন্য নির্ধারিত সব কার্গো কেবল একটি মেশিন দিয়ে পরীক্ষা করা হচ্ছে। ফলে পণ্য পরীক্ষার গতি অনেক ধীর হয়ে গেছে এবং পণ্যজট তৈরি হচ্ছে,' গত সপ্তাহে টিবিএসকে বলেন তিনি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে কেবল 'ইডিএস ১' স্ক্যানারটি সচল রয়েছে। 'ইডিএস ২' বহু বছর ধরে অচল পড়ে আছে, আর 'ইডিএস ৩' চলতি বছরের ১৫ মার্চ যান্ত্রিক ত্রুটির শিকার হয়। এছাড়া 'ইডিএস ৪' ২০২৪ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর থেকে অকার্যকর হয়ে পড়ে রয়েছে।
ডগ স্কোয়াডে ভরসা কর্তৃপক্ষের
এ খাতের স্টেকহোল্ডাররা ব্যবসায়ীরা জানান, ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে কার্গো রপ্তানির জন্য ইডিএস স্ক্রিনিং বাধ্যতামূলক, কারণ এই স্ক্যানারগুলোতে বিস্ফোরক শনাক্তকরণ প্রযুক্তি রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকাসহ ইউরোপের বাইরের গন্তব্যের কার্গোগুলো আলাদা 'নন-আরএ৩' স্ক্যানার দিয়ে স্ক্রিন করা হয়। বর্তমানে থাকা ছয়টি নন-আরএ৩ স্ক্যানারের মধ্যে তিনটি সচল, একটি অচল ও দুটি সাময়িকভাবে নিষ্ক্রিয় রাখা হয়েছে। খাত-সংশ্লিষ্টরা বলেন, নিষ্ক্রিয় মেশিনগুলো আসলে সচল; কার্গোর চাহিদা বাড়লে সেগুলোকে তাৎক্ষণিকভাবে চালু করা সম্ভব।
ফ্রেইট অপারেটরদের তথ্যমতে, ইউরোপের বাইরের গন্তব্যগুলোতে কার্গো পরিবহনে এখন বড় কোনো বিঘ্ন ঘটছে না।
এ সংকট মোকাবিলায় যান্ত্রিক পরীক্ষার জরুরি বিকল্প হিসেবে এক্সপ্লোসিভ ডিটেকশন ডগ (ইডিডি) স্কোয়াডের ওপর বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের নির্ভরতা ক্রমেই বাড়ছে।
কবির আহমেদ বলেন, 'ডগ স্কোয়াড মূলত জরুরি পরিস্থিতির জন্য তৈরি করা হয়েছে। যেহেতু মাত্র একটি স্ক্যানার দিয়ে সব কার্যক্রম পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে, তাই ফ্লাইটগুলো যেন ধারণক্ষমতার চেয়ে কম পণ্য নিয়ে ছেড়ে না যায়, তা নিশ্চিত করতে কর্তৃপক্ষ ডগ স্কোয়াড ব্যবহার করছে।'
ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার নাসির আহমেদ খান জানান, বর্তমানে সচল থাকা একমাত্র ইডিএস স্ক্যানারটি মূলত লন্ডনগামী কার্গোর জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, 'একটি মাত্র স্ক্যানার দিয়ে কোনোরকমে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে; আর বিকল্প হিসেবে ডগ স্কোয়াড ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে এটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়।'
নাসির আহমেদ সতর্ক করে বলেন, রপ্তানি চাহিদা বাড়লে এয়ারলাইনসগুলো ঢাকা রুটে তাদের কার্গো কার্যক্রম পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, 'একটি কার্গো বিমানের ধারণক্ষমতা যদি ১০০ থেকে ১১০ টন হয়, কিন্তু পণ্য পরীক্ষার সীমাবদ্ধতার কারণে সেটিকে ৪০-৫০ টন জায়গা খালি রেখে রওনা হতে হয়, তাহলে সেটি বাণিজ্যিকভাবে টেকসই হবে না।'
খাত-সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এখন ইউরোপে আকাশপথে কার্গো ভাড়া প্রতি কেজিতে প্রায় ৪.৫ ডলার। অন্যদিকে বিমান সংস্থার ওপর ভিত্তি করে কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে এই ভাড়া কেজিতে ৬.৫ থেকে ৭ ডলারের মধ্যে ওঠানামা করছে। কোনো কোনো চালানের ক্ষেত্রে এই খরচ ৮ থেকে ৯ ডলার পর্যন্তও পৌঁছে যাচ্ছে।
জরুরি মেরামতের দাবি রপ্তানিকারকদের
দীর্ঘদিন ধরে স্ক্যানারগুলো অচল হয়ে থাকায় উদ্বেগ প্রকাশ করে দ্রুত এগুলো মেরামতের দাবি জানিয়েছেন রপ্তানিকারকরা।
বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, 'এই একমাত্র মেশিনটিও যদি নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে বিমানবন্দর দিয়ে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম কার্যত পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।'
তিনি আরও জানান, ক্ষতিগ্রস্ত স্ক্যানারগুলো জরুরি ভিত্তিতে মেরামত করতে বিজিএমইএ ইতিমধ্যে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে আলোচনার জন্য চলতি সপ্তাহে মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।খাত-সংশ্লিষ্টরা বলেন, বিমানবন্দরটিতে এখন দৈনিক ৪০০ থেকে ৬০০ টন কার্গো হ্যান্ডলিং করা হচ্ছে। পণ্য রপ্তানির পরিমাণ কম থাকায় সাময়িকভাবে সংকটটি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হচ্ছে। তবে তারা সতর্ক করে বলেন, রপ্তানি আদেশ বাড়লে পণ্য স্ক্রিনিংয়ের বর্তমান সীমিত সক্ষমতা বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
কবির আহমেদ বলেন, 'এই মুহূর্তে চাপ তুলনামূলক কম। তবে বিমানবন্দর যখন প্রতিদিন ৬০০ থেকে ৮০০ টন কার্গো হ্যান্ডলিং করে, তখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক ও সন্তোষজনক থাকে। কিন্তু স্ক্যানার সংকটের কারণে অতিরিক্ত চাপ সামাল দিতে কর্তৃপক্ষকে এখনই ডগ স্কোয়াডের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।'তিনি বলেন, এই খাতের স্টেকহোল্ডাররা সমাধানের দাবি জানিয়ে বারবার কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়েছেন; শিগগিরই আরেকটি চিঠি পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এছাড়া বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও আলোচনা চলছে বলে জানান তিনি।
খুচরা যন্ত্রাংশের সংকটের কথা জানাল বেবিচক
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট, ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড স্টোর ইউনিটের নির্বাহী পরিচালক (যুগ্ম সচিব) মো. আহসান হাবীব জানান, এই বিশেষায়িত স্ক্যানারগুলোর জন্য আমদানিকৃত খুচরা যন্ত্রাংশ লাগে, যা বাংলাদেশে সহজে পাওয়া যায় না।
তিনি বলেন, 'কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিলে প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ বিদেশ থেকে আনতে হয়; এতে কিছুটা সময় লাগে। তবে কর্তৃপক্ষ হাত গুটিয়ে বসে নেই; সমস্যাটি দ্রুত সমাধানের চেষ্টা চলছে।'
আহসান হাবীব আরও বলেন, স্ক্যানারগুলো অত্যন্ত বিশেষায়িত এবং বিদেশে তৈরি। এসব মেশিন মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণে সুনির্দিষ্ট প্রযুক্তিগত প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হয়। তবে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর সঙ্গে বেবিচকের রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তি রয়েছে।অনানুষ্ঠানিক খরচ বৃদ্ধির অভিযোগ
একজন ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার অভিযোগ করেন, পণ্য স্ক্রিনিংয়ের এই সংকটের কারণে ব্যবসায়ীদের অনানুষ্ঠানিক খরচও বাড়ছে।
তিনি বলেন, 'যদিও সরকার-অনুমোদিত একটি স্ক্যানিং চার্জ রয়েছে, তা সত্ত্বেও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে এখন প্রতি কনসাইনমেন্টের জন্য বাড়তি ২-৩ হাজার টাকা দাবি করা হচ্ছে।'
তিনি আরও বলেন, সরকারি স্ক্যানিং চার্জ প্রতি কেজিতে প্রায় ৮ সেন্ট। কিন্তু সময়মতো পণ্য পরীক্ষার স্লট নিশ্চিত করতে ব্যবসায়ীদের প্রায়ই বাড়তি টাকা গুনতে হয়।
ওই ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার অভিযোগ করেন, 'বাড়তি টাকা না দিলে সময়মতো সিরিয়াল পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।' তিনি আরও বলেন, এই অর্থ ক্রিনিং প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত ব্যক্তিদের পকেটে যাচ্ছে।
তবে বিরূপ প্রতিক্রিয়া ও নানা জটিলতার ভয়ে তিনি এই বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করেননি।
বেবিচকের আহসান হাবীব টিবিএসকে বলেন, 'আমরা এরকম কোনো অভিযোগ পাইনি। যদি কোনো অভিযোগ আসে, তাহলে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'
