এবারের জমজমাট ঈদ রাজনীতির কেন্দ্রে ছিল জাতীয় নির্বাচন

মুসলিমদের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতরের সময় এবার রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে স্থান করে নিয়েছিল চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রত্যাশিত আসন্ন সংসদ নির্বাচন।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও সদ্য আত্মপ্রকাশ করা নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতারাই মূলত এই ঈদ রাজনীতির মাঠ গরম করে রেখেছেন।
পাশাপাশি এই দলগুলোর সমমনা দলের নেতারাও মাঠে ছিলেন জোরালোভাবে।
তবে এবার মাঠে কোনো 'ক্ষমতাসীন দল' নেই। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের পাশাপাশি তৃণমুলের অনেক নেতাকর্মীও আত্মগোপনে কিংবা এলাকা থেকে দূরে রয়েছেন। ফলে অন্যান্য দলগুলোই এবারে ঈদ রাজনীতি জমিয়ে তুলেছে।
বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির বিভিন্ন সারির নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঈদের সময়টা কাজে লাগাতে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণার মতো করে প্রচেষ্টা চালিয়েছেন দলগুলোর নেতাকর্মীরা।
তৃণমূল পর্যায়ে ইফতার মাহফিলের আয়োজন, দলীয় নেতাকর্মী ও অসহায় মানুষদের বিভিন্ন সহযোগিতার কর্মসূচির মাধ্যমে এই রাজনীতি শুরু হয়েছিল রোজার শুরু থেকে। ঈদের আগে ঈদ উপহার সামগ্রী প্রদান, ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় ও ব্যাপক জনসংযোগের মাধ্যমে সেই কর্মসূচি পেয়েছে নির্বাচনকেন্দ্রিক নতুন হাওয়া।
আগামী ডিসেম্বর জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান নিশ্চিত করতে এবং ভোটারদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে বিএনপির বিভিন্ন আসনের সম্ভাব্য প্রার্থীরা দখলে রেখেছিলেন মাঠ।
ঈদকে কেন্দ্র করে সেই মাঠে ভোটের রাজনীতির নতুন আবহ তৈরি করেছে দলটি। সম্ভাব্য এমপি প্রার্থীরা ছাড়াও দলটির গুরুত্বপূর্ণ নেতারা নিজ এলাকায় ঈদ করেছেন, করেছেন ব্যাপক হারে জনসংযোগ।
এদিকে জামায়াত ও এনসিপি যদিও সরাসরি ভোটকেন্দ্রিক ঈদ রাজনীতির প্রচার করেনি, তারপরও তাদের কর্মসূচিগুলো ছিল ভোটারদের কাছে টানার। ঈদের সময় এই দুই দলের সম্ভাব্য এমপি প্রার্থী, তৃণমূল নেতা ও কেন্দ্রীয় নেতারাও বিএনপির মতো মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন এখনও।
বিএনপির কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে জানান, খুব শিগগিরই আগামী ডিসেম্বরে নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণার দাবিতে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বসবেন দলটির নীতিনির্ধারকরা।
এই দাবি বাস্তবায়নে ঈদকে কেন্দ্র করে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মন চাঙা করতে কাজ করেছেন দলটির নেতাকর্মীরা।
সম্প্রতি স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ড. ইউনূস বলেন, 'নির্বাচনের ব্যাপারে আমি আগেও বলেছি, আবারও বলছি, এ বছর ডিসেম্বর থেকে আগামী বছরের জুনের মধ্যে নির্বাচন হবে।'
রাজনৈতিক দলগুলো 'নির্বাচনের জন্য তৈরি হতে শুরু করবে' বলেও আশা প্রকাশ করেন প্রধান উপদেষ্টা।
কিন্তু তার এ বক্তব্যে অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি হতাশা প্রকাশ করে। গত ডিসেম্বর থেকেই বিভিন্ন সময়ে নির্বাচনের তারিখ নিয়ে 'ধোঁয়াশা' ও 'অস্পষ্টতার' অভিযোগ তুলে সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণার দাবি জানিয়ে আসছে দলটি। এবারের ঈদে দলটি এ দাবিতে আরও সক্রিয় হয়েছে।
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী টিবিএসকে, 'স্বৈরাচার পতনে পর এটি ছিল দেশের প্রথম ঈদ। সেই ঈদে বিগত ১৬ বছর বিএনপির নির্যাতিত নেতাকর্মীরা বুক ভরে শ্বাস নিয়ে ঈদ করেছে।
'একইসাথে একটি গণতান্ত্রিক ও নির্বাচিত সরকার যাতে দ্রুত দেশ পরিচালনার দায়িত্বে আসতে পারে, ঈদ কেন্দ্র করে সেই কর্মসূচি পালন করেছেন নেতাকর্মীরা।'
তিনি বলেন, 'ঈদ মানেই আনন্দ। আর সেই আনন্দকে শক্তিতে রূপান্তরিত করেই বিএনপি মাঠে আছে, জনগণের সাথে আছে এবং আগামীতেও থাকবে।'
ঈদকে কেন্দ্র করে রাজধানীসহ দেশজুড়ে বিএনপির সম্ভাব্য এমপি প্রার্থীরা ছিলেন বেশ ব্যস্ত।
ঢাকা-৪ আসনের ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সদস্য সচিব তানভীর আহমেদ রবিন, ঢাকা-১১ (বাড্ডা-ভাটারা-রামপুরা) আসনে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির ক্ষুদ্র ঋণবিষয়ক সম্পাদক ও ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এমএ কাইয়ুম, ঢাকা -১২ আসনে জাতীয়তাবাদী যুবদল কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সভাপতি ও ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক সাইফুল ইসলাম নিরব, ঢাকা-১৩ আসনে (মোহাম্মদপুর-আদাবর ও শেরেবাংলা নগর থানার একাংশ) বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সাবেক ছাত্রনেতা আতাউর রহমান ঢালীসহ সবাই রাজধানীর সব নির্বাচনী এলাকায় ব্যাপক হারে জনসংযোগ, ঈদ উপহার সামগ্রী বিতরণ, নির্বাচনকেন্দ্রিক ব্যানার, ফেস্টুন বিলবোর্ড প্রচারের কাজে ব্যস্ত ছিলেন।
এদিকে ৩০০ আসনে সম্ভাব্য প্রার্থী ঘোষণা করেছে জামায়াত। সম্ভাব্য প্রার্থীরা ঈদ উপহার সমগ্রী প্রদান, জনসংযোগ, বিভিন্ন পোস্টার, ব্যানার প্রচারের কাজ করেছেন।
জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক মতিউর রহমান আকন্দ টিবিএসকে বলেন, 'জামায়াত সবসময় জনমুখী রাজনৈতিক দল। গত ১৬ বছর সাধারণ মানুষের পাশে ছিল। পরিবর্তিত পরিস্থিতে এবার একটা ভিন্ন আবহে মাঠে ছিল।
'নেতাকর্মীরা সংস্কার কর্মসূচি ও নির্বাচনের পক্ষে কাজ করেছেন। মূলত সাধারণ মানূষের মুখে হাসি ফোটানো জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হয়েছে।'
এনসিপির কেন্দ্রীয় নির্দেশনা অনুযায়ী দলটির গুরুত্বপূর্ন নোতারা তাদের নিজ নিজ আসনে শুভেচ্ছা বিনিময় ও ব্যাপক জনসংযোগ কর্মসূচি পালন করেছেন ঈদকে কেন্দ্র করে।
দলটির অন্যতম নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ, সারজিস আলম, আবদুল হান্নান মাসুদ, জয়নাল আবেদীন, সামান্তা শারমীনসহ অন্যরা নিজ নিজ এলাকায় ঈদ উদযাপন এবং ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময়সহ জনসংযোগ কর্মসূচি পালন করেছেন।